সিনেমা হলের গলি

জুবেইদা: হৃদয় দিয়ে অনুভব করা এক ভালবাসার গল্প

নামিরা সারাহ টুইন্কল:

ফিল্মফেয়ার এর সাংবাদিক খালিদ মুহম্মদ যখন তার মা জুবেইদা বেগম এর জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে চাইলেন, পরিচালক হিসেবে বেছে নিলেন অভিজ্ঞ পরিচালক শ্যাম বেনেগালকে। কারণ তিনি জানতেন এই মুভি আর অন্য কোনো মুভির মতো বানিজ্যিক মুভি হবে না। তাই শিল্পগুণ ধরে রাখার জন্য শ্যামের চেয়ে অন্য কারো উপর ভরসা করতে পারেননি। কিন্তু শ্যাম বেনেগাল যাদের সাথে কাজ করতেন, তাদের কেউই এ চরিত্র করার জন্য উপযুক্ত নয়-কী বয়সে, কী লুকে। তাই শ্যামের প্রথমেই মনে ধরল সেই সময়ের সেনসিটিভ অভিনেত্রী মনীষাকে। আর তার বিপরীতে সময়ের ক্রেজ শাহরুখ। সেটা ১৯৯৫/৯৬ সালের কথা।

কিন্তু চিত্রনাট্য রেডি করা, সেইরকম হাত খোলা প্রযোজক তো পেতে হবে, যিনি ছবির ব্যবসার দিকে চেয়ে থাকবেন না।ছবির জন্য পয়সা ঢালতে কার্পণ্য করবেন না। তত দিনে মনীষার জায়গায় বলিউডে এসে গেছে নতুন অভিনেত্রী, খালিদের নিজের প্রথম পরিচালনায় “ফিজা “মুভিতে অভিনয় করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বানিজ্যিক ছবির লক্ষী এই অভিনেত্রী আর কেউ নন, কারিশমা কাপুর। আর তার বিপরীতে মনোজ বাজপেয়ী। আর কোন মুভিতে এর আগে দেখা যায়নি এই জুটিকে।

কিন্তু “মন্দিরা দেবী”র চরিত্র কে করবেন? এমন রাজকীয় লুকের জন্য কাকে পাওয়া যাবে? শ্যাম এই চরিত্রে রেখার বিকল্প আর কাউকে দেখলেন না। অন্যদিকে অনেকদিন ধরে বানিজ্যিক মুভি করতে করতে ক্লান্ত কারিশমা তখন অন্য ধরনের ছবি খুঁজছেন। আর “জুবেইদা ” যেন তার সেই তেষ্টা মেটানোর জল।

ছবির প্রথমেই দেখা যায় ছোট রিয়াজ কবরে ফুল দিয়ে আসে।কিন্তু এটা তার মা জুবেইদার (কারিশমা কাপুর) কবর, তা সে বুঝতে পারে না। বড় হয়ে ফিল্মমেকার হয় রিয়াজ (রজিত বেদি)। তার মায়ের একমাত্র অভিনীত মুভির ফুটেজ খুঁজতে বিভিন্ন স্টুডিওতে ঘুরে। একসময় পেয়েও যায়। সেখানে পরিচয় হয় ড্যান্স মাস্টার হীরালাল (শক্তি কাপুর) এর সাথে।ছোটবেলায় জুবেইদা তার কাছেই নাচের তালিম নিয়েছিল। হীরালাল এর স্বপ্ন জুবেইদা একদিন অনেক বড় নায়িকা হবে। ছবির শুটিং শুরু করেন তারা জুবেইদাকে নিয়ে। কিন্তু বাধা দেন জুবেইদার বাবা সুলেমান শেঠ (অমরেশ পুরী)। এ যেন কারিশমার বাস্তব জীবনের চিত্র। কারিশমা চলচ্চিত্রে আসুক, তা চাননি তার বাবা রনধির কাপুর। কারণ কাপুররা জানতেন হিন্দি মুভিতে নায়িকাদের কীভাবে ব্যবহার করা হয়। বাস্তবে মা ববিতার সাপোর্ট পেয়ে কারিশমা চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে পারলেও, মুভিতে জুবেইদার মুভিতে আর অভিনয় করা হয় না।

বাবা জুবেইদার বিয়ে ঠিক করেন। এ যেন জুবেইদার জন্য বিনা মেঘে বজ্রপাত। মেহেদী অনুষ্ঠানের দিন আত্মহত্যা করতে চায় সে। কিন্তু বাবার জেদের কারণে বিয়ে করতে হয় তাকে। এদিকে বছর না ঘুরতেই মা হলে, আরেক বিপদ আসে তার। শ্বশুর বাড়ির সবাই পাকিস্তান চলে যেতে চাইলে জুবেইদাকে যেতে দেন না তার বাবা। ফলে তালাক হয়ে যায়। সন্তান নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন জুবেইদার। এই ব্যাপারটা কারিশমার ব্যক্তিজীবনের সাথে মিলে যায়। বচ্চন পরিবারের বউ হবার সব কিছু যখন ঠিকঠাক কারিশমার, ঠিক তখনই কারিশমার মা ববিতার কিছু অযৌক্তিক শর্তের কারণে ভেঙে যায় কারিশমা-অভিষেকের বিয়ে।

জুবেইদা তার বিয়ের সব স্মৃতি মুছে ফেলতে বিয়ের এলবাম পুড়িয়ে ফেলে। এই সময় তার একঘেয়ে জীবন থেকে তাকে মুক্তি দিতে এগিয়ে আসে রোজ (লিলেট দুবে)। একদিন এক পার্টিতে পরিচয় হয় রাজা বিজেন্দ্র (মনোজ বাজপেয়ী)র সাথে। কিছুদিন পর যাবার পর মন দেয়া-নেয়া,তারপর বিয়ে। বিজেন্দ্র,জুবেইদাকে নিয়ে যায় তার রাজ্যে,যেখানে সে রাজা। তার রয়েছে আরেক রানী, মন্দিরা দেবী (রেখা)। ধীরে ধীরে জুবেইদা পরিচিত হয় রাজবাড়ির নিয়ম কানুন এর সাথে, যা তার কাছে শেকলের মতো মনে হয়। বুঝতে পারে সে রাজাকে তার সবটা দিয়ে ভালবাসলেও, রাজার সর্বস্ব সে নয়।

এর মধ্যে সন্তানকে দেখে আসে জুবেইদা। নিজেকে পাষাণী মা বলে। আর এই দিকটা পরিচালক শ্যাম এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। একমাত্র সন্তানকে মায়ের কাছে ফেলে অন্য লোকের হাত ধরে চলে যাওয়াকে জুবেইদার চরিত্রের স্বার্থপরতাকে তুলে ধরে। তবে শ্যাম বলতে চেয়েছেন, এই মুভি জুবেইদার ভালবাসার গল্প, যে গল্পে পদে পদে তার আবেগপ্রবণ আচরণের বিপরীতে ঠকে যাবার চিত্র আঁকা হয়েছে। নির্বাচন এগিয়ে এলে রাজা বিজেন্দ্র যখন মন্দিরাকে নিয়ে প্রচারণায় যেতে চায়, তখন জুবেইদা বুঝতে পারে বিজেন্দ্রর জীবনে তার অস্তিত্ব সংকটপূর্ণ। আর তাই সে নিজেই যাবার জন্য জেদ করে। আর তার এই জেদের কারণেই বিমান দুর্ঘটনায় মারা যায় জুবেইদা-বিজেন্দ্র দুজনেই।

পুরো মুভিতে রিয়াজ বিভিন্ন জনের কাছে গিয়ে তার মায়ের জীবনের বিভিন্ন অংশ আবিষ্কার করে। এর মধ্য দিয়ে হয়ত সে তার মায়ের জীবনের একটি কল্পিত চিত্র অংকন করে। ছবির শিল্প নির্দেশনায় ছিলেন শ্যাম বেনেগালের মেয়ে পিয়া, যা দর্শক হিসেবে যে কাউকে মুগ্ধ করবে। মুভির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তো সেই সময়ের সাথে মিলে যায়। এ আর রহমান তার এই মিউজিক এলবামে যুক্ত করেছিলেন সেরা সব গায়িকাদের। লতা, আশা, অলকা, কবিতা- কে ছিলেন না জুবেইদা মুভির সুমধুর সংগীত এ প্রাণ দেবার জন্য! আর কারিশমার জন্য তো এই মুভি তার ক্যারিয়ারের মাইলফলক। প্রত্যেক অভিনেত্রীর ফিল্ম ক্যারিয়ারে এমন মুভি থাকা উচিত, যার কারণে দর্শক তাকে বহু বছর পরেও মনে রাখবে। বিক্রমের লুকে সেই সময়ের হেয়ার স্টাইলে কারিশমার চেহারায় আলাদা আভিজাত্য এনেছিল, যা তার অন্য মুভিগুলো থেকে তাকে আলাদা করে। আর এখানেই কারিশমা তার সমসাময়িক অন্য নায়িকাদের চেয়ে এগিয়ে, এমনকি বোন কারিনার চেয়েও।

ছবিতে অভিনয়ের জন্য ফিল্মফেয়ার এ সেই বছর সেরা অভিনেত্রীর সমালোচক পুরস্কার পান কারিশমা। তাছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও ভূষিত হয় এই মুভি। তবে বানিজ্যিকভাবে হয়ত খুব একটা সফল হয়নি সেই মুভি। এই মুভিতে মনোজ বাজপেয়ীকে রাজার চরিত্রে মানায়নি বলে মন্তব্য করেন অনেকে। অন্যদিকে রেখা-কারিশমা যে অলংকারগুলো ব্যবহার করেছিলেন মুভিতে, সেগুলো জয়পুরের রাজ পরিবারের। আর তাই তাদের বলে দেয়া হয় অলংকারগুলো সাবধানে ব্যবহার করবার জন্য। প্রতিদিন তো অনেক মুভিই দেখি আমরা বিনোদিত হবার জন্য, তবে সেই সব ছবির মধ্যে জুবেইদা একটু আলাদা। কারণ এই মুভি বিনোদন দেবার জন্য শুধু নির্মিত হয়নি, বরং হৃদয় দিয়ে অনুভব করার মুভি জুবেইদা।

কৃতজ্ঞতা- ‘জাস্ট বলিউড’ ফেসবুক গ্রুপ

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button