খেলা ও ধুলা

আইসিসি কি নিজ হাতে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দিচ্ছে?

‘আমরা কি এখন ব্যাট-প্যাড সবকিছু পুড়ে ফেলে, কিটব্যাগে আগুন দিয়ে নয়টা-পাঁচটার চাকরির পেছনে ছুটবো?’ – প্রশ্নটা সিকান্দার রাজার। জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দলের এই অধিনায়কের কথাতেই পরিস্কার, জিম্বাবুয়েকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত আইসিসি নিয়েছে, সেটা কতটা বিধ্বস্ত করেছে তাকে।

ক্রিকেট বোর্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট বোর্ডের সদস্যপদ স্থগিত করেছে আইসিসি- এটা এখন পুরনো খবর। এই নিষেধাজ্ঞা বাতিল হবার আগে আইসিসির কোন ইভেন্টে অংশ নিতে পারবে না জিম্বাবুয়ে। এমনটা যে ঘটতে পারে, সেরকম একটা শঙ্কা ছিল। বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে লণ্ডনে বসেছে আইসিসির বার্ষিক সম্মেলন, সেখান থেকেই এসেছে সিদ্ধান্তটা। মূলত বোর্ড পরিচালনায় সরকারের হস্তক্ষেপ না থাকা নিশ্চিত করতে না পারাটাই টেস্ট খেলুড়ে দেশ জিম্বাবুয়ের সদস্য পদ স্থগিত হবার কারণ।

তবে এই সিদ্ধান্তটাই কালবৈশাখী ঝড় বয়ে এনেছে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটার আর সেদেশের ক্রিকেটের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনে। ক্রিকেটারেরা এখনও নিশ্চিত নন, জিম্বাবুয়ের জার্সি গায়ে আর কখনও তারা মাঠে নামতে পারবেন কিনা। আয়ের জন্যে যে মানুষগুলো ক্রিকেটের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল, যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি ক্রিকেটের সাথে জড়িত, সেসব মানুষ আর পরিবারের জীবনে নেমে এসেছেন অদ্ভুত এক স্থবিরতা। তারা জানেন না ভবিষ্যত তাদের জন্যে কি কঠিণ বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে, কোন পরিণতির দিকে ভাগ্য তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। স্রোতে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতোই ভেসে যাচ্ছেন তারাও।

জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ বাতিলের কথা শুনেই মনটা বিষণ্ণ হলো। এই জিম্বাবুয়ে একটা সময় ক্রিকেট পরাশক্তদের নাকের জল চোখের জল এক করে ছেড়েছে। বলেকয়ে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া-ভারত-পাকিস্তানের মতো দলগুলোকে। এই দলে খেলেছেন হিথ স্ট্রিক, ফ্লাওয়ার ব্রাদার্স, অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেলের মতো দুর্দান্ত ক্রিকেটারেরা। সেসময়ের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নক্ষত্রের মতোই বিরাজমান ছিল দলটা।

সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটে আমাদের আদি ও অকৃত্রিম বন্ধু ছিল জিম্বাবুয়ে। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর পরে আমরা যখন টানা জয়বঞ্চিত ছিলাম, ক্রিকেটবিশ্বের কোন দলই যখন আমাদের সাথে খেলতে চাইতো না, তখন জিম্বাবুয়ে আমাদের পাশে ছিল। তারকাখচিত দল থাকা স্বত্বেও তারা বারবার আমাদের সঙ্গে খেলেছে, বাংলাদেশে এসেছে, আমাদেরকে আতিথ্য দিয়েছে নিজেদের দেশে। পাঁচ বছরের বিরতি দিয়ে জেতা ওয়ানডেটাও তাই তাদের বিপক্ষে জেতা। ২০০৫ সালে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম টাটেন্ডা টাইবুর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

বর্ণবাদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে ধ্বংস করে দিয়েছে ধীরে ধীরে। হিথ স্ট্রিক, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার বা গ্র‍্যান্ট ফ্লাওয়ারের মতো ক্রিকেটারেরা ক্যারিয়ারের শেষটা সম্মানজনকভাবে করতে পারেননি, কিংবা বলা ভালো, তাদেরকে সম্মানের সাথে বিদায় নেয়ার সুযোগই দেয়নি বোর্ডের কিছু কর্তাব্যক্তি।

এরপরেও জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটে প্রতিভা এসেছে, টাটেন্ডা টাইবু থেকে ব্র‍্যান্ডন টেলর, কিংবা আজকের সিকান্দার রাজা- পরিমাণে অল্প হলেও, মানসম্মত ক্রিকেটারের জন্ম হয়েছে জিম্বাবুয়েতে। কিন্ত এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিষেধাজ্ঞা আসায় জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের ভবিষ্যতটাই অন্ধকার হয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞাটা সহসা না উঠলে জিম্বাবুয়েতে আর কোন কিশোর হিথ স্ট্রিক হতে চাইবে না, কেউ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের মতো ব্যাটিং করতে চাইবে না।

জিম্বাবুয়ের জার্সি গায়ে ১২টা টেস্ট আর ৯৭টা ওয়ানডে ম্যাচ খেলে ফেলেছেন সিকান্দার রাজা, দলকে নেতৃত্বও দিচ্ছিলেন। শততম ওয়ানডে মাইলফলকের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যত ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না রাজা’র। আর কোনদিন জিম্বাবুয়েতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ফিরবে কিনা সেটা যেমন রাজা জানে না, তেমনই জানেন না, ইতিমধ্যেই ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডেটা তিনি খেলে ফেলেছেন কিনা!

মজার ব্যাপার হচ্ছে, বোর্ডে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বা সরকারের হস্তক্ষেপের যে অজুহাতে আইসিসি জিম্বাবুয়ের সদস্যপদ স্থগিত করেছে, সেই একই দোষে দুষ্ট ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা এমনকি বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডও। এসব জায়গায় সভাপতি থেকে শুরু করে বোর্ড পরিচালক, সবাই নিয়োগ পান রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। উপমহেদেশীয় সংস্কৃতিতে এটা খুব একটা বেমানানও নয় অবশ্য, এমনটাই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই দেশগুলোতে। অথচ কোপটা পড়েছে কেবল জিম্বাবুয়ের ওপরেই। ভারত-পাকিস্তানকে কিছু বলার সাহস সম্ভবত আইসিসির নেই।

আইসিসি নজর না দেয়ায় ক্রিকেটের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে কেনিয়া, যারা জায়ান্ট কিলার হিসেবে নিজেদের মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলা কেনিয়ার এখন ওয়ানডে স্ট্যাটাসও নেই! ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে থাকা জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটটাও ধ্বংসের পথে আরেকধাপ এগিয়ে গেল আইসিসির এই সিদ্ধান্তে, কিংবা বলা যায়, কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিলো আইসিসি নিজেই। অক্টোবরে আইসিসির সভায় আবারও জিম্বাবুয়ে প্রসঙ্গ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবার কথা, সেই সভায় যদি সদস্যপদ ফিরিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটকে অফিসিয়ালি মৃত ঘোষণা করা ছাড়া আর কোন উপায়ই থাকবে না।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button