খেলা ও ধুলা

সারপ্রাইজ, সারপ্রাইজ!

গ্রামগঞ্জে একটা কথা প্রচলিত আছে, গাধা জল খায় ঠিকই, তবে সেটা ঘোলা করে, পরিস্কার জল খাওয়ার অভ্যাস গাধার নেই। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের অবস্থাটা হয়েছে সেই গাধার মতোই! অনেক ঘাটের জল খেয়ে অবশেষে দলকে উদ্ধারের দায়িত্বটা সেই জিনেদিন জিদানের হাতেই সঁপে দিতে হলো আবার, কোচের দায়িত্ব ছাড়ার নয় মাসের মাথায় আবারও টালমাটাল রিয়ালের হাল ধরলেন মাদ্রিদে টানা তিনটা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপা নিয়ে আসা ফরাসী জাদুকর। জিদান এখন রিয়াল মাদ্রিদের কোচ, ব্যতিক্রমী কিছু না ঘটলে ২০২২ সাল পর্যন্ত তার এই পদে থাকার কথা, চুক্তিটা সে সেভাবেই হয়েছে।

নয়মাস আগে জিনেদিন জিদান যখন রিয়াল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখনও বোঝা যায়নি ক্লাবটার সামনে কি কঠিণ সময় অপেক্ষা করছে! জিদানের অভাব পূরণের জন্যে অনেক নাটক করে লোপেতেগুইকে নিয়ে আসা হলো, কিন্ত অগ্নিপরীক্ষায় ডাহা ফেল করলেন এই স্প্যানিশ। পাঁচ মাসের মাথায় তাকে বরখাস্ত করলো বিশ্বসেরা ক্লাবটি, ভারপ্রাপ্ত কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হলো সোলারিকে। তিনি ভালোই করছিলেন, রিয়ালও ২০২১ সাল পর্যন্ত চুক্তি বর্ধিত করেছিল তার সঙ্গে। কিন্ত টানা দুটো এল ক্ল্যাসিকো হার, সেই সঙ্গে আয়াক্সের কাছে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ থেকে বিদায়টা সোলারির ভবিষ্যত নির্ধারণ করে দিলো, এই মৌসুমেই দ্বিতীয়বারের মতো কোচ ছাটাই করতে তাই খুব বেশি ভাবতে হয়নি রিয়ালকে।

মাদ্রিদের ডাগআউটে যে পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিতই ছিল। কিন্ত এভাবে মৌসুমের মাঝপথে সেটা হতে পারে, এমন ধারণা ছিল না কারোই। আর সোলারিকে বরখাস্ত করা হলে রিয়ালের দায়িত্ব কে নিতে পারেন, সেটা নিয়েও ছিল জল্পনা কল্পনা। হোসে মোরিনহোর নামটাই শোনা যাচ্ছিল জোরেশোরে, কারণ হাইপ্রোফাইল কোচদের মধ্যে আপাতত তিনিই বেকার আছেন। কিন্ত ক্লাব ছাড়ার নয় মাসের মাথায় জিদানকে যে আবারও রিয়ালে ফেরার ব্যাপারে রাজী করানো যাবে, সেটা মাদ্রিদিস্তাদেরও ধারণায় ছিল না!

রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে জিনেদিন জিদান নিঃসন্দেহে একটা রূপকথার নাম। খেলোয়াড় হিসেবে রিয়ালেএম্র জার্সি গায়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতেছেন, তবে আসল কীর্তিটা গড়েছেন কোচ হিসেবে। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটা সময়ে হুট করেই কোচের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এরপরে যেটা গড়েছেন, সেটা ইতিহাস হয়ে আছে! টানা তিন মৌসুমে দলকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের শিরোপা জিতিয়েছিলেন, একবার জিতেছিলেন স্প্যানিশ লীগও! ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সাথে তার জুটিটাও জমেছিল দুর্দান্তভাবে, আর তাতেই ইতিহাস গড়া হয়ে গেছে।

লিভারপুলকে হারিয়ে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন্স লীগটা জেতার পরেই কোচের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন জিদান, শোনা গিয়েছিল, দল নির্বাচন ও খেলোয়াড় কেনাবেচায় আরও বেশি স্বাধীনতা চেয়েছিলেন জিদান, টানা তিনটা চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জেতানো একজন কোচ সেটা চাইতেই পারেন। কিন্ত সেই চাহিদাটা মনোপুত হয়নি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের, আর তাই রিয়ালকে বিদায় জানিয়ে দিয়েছিলেন জিদান।

সেটার ফলাফল, গত নয় মাস জুড়েই ভুগেছে বিশ্বসেরা এই ক্লাবটা। স্প্যানিশ লীগ শিরোপার দৌড় থেকে রিয়াল ছিটকে পড়েছে, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, এমনকি কোপা দেল রে- থেকেও বেজে গেছে বিদায়ঘন্টা। শোচনীয় এই অবস্থা থেকে দলকে যদি কেউ উদ্ধার করতে পারেন, জিদানই পারবেন- এই বিশ্বাসটা মাদ্রিদ সমর্থকদের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল।

গুঞ্জনের ডালপালা মেলা শুরু করেছিল কয়েকদিন আগে থেকেই, শোনা গিয়েছিল, ডুবন্ত রিয়াল মাদ্রিদকে উদ্ধারের জন্যে জিদানের শরণাপন্ন হয়েছেন রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। তবে জিদানেরও তো বেশকিছু দাবীদাওয়া ছিল ফেরার ব্যাপারে, সেগুলোও যে এত জলদি মিটে যাবে, সেটা ভাবা যায়নি। দলের দুরবস্থা কাটানোর ব্যাপারে রিয়াল মাদ্রিদের কর্তারা বেশ সিরিয়াস, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। শুরুতে ভাবা হয়েছিল নতুন মৌসুমের শুরু থেকে দায়িত্ব নেবেন জিদান, তার নিজেরও সেটাই ইচ্ছে ছিল। বেশকিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছিলেন তিনি ফেরার জন্যে, মঞ্জুর হয়েছে সবই। জিদানকে ফেরানোর জন্যে পেরেজের তর সইলো না, আর তাই মৌসুমের শেষপ্রান্তে কোচের চাকরিটা ছাড়তে হচ্ছে সোলারিকে।

ভঙ্গুর একটা মৌসুম কাটানোর পরে জিদানের ক্যারিশমায় আরও একবার জ্বলে ওঠার স্বপ্ন বুনছেন রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকেরা। আগেরবার জিদান যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, দলে রোনালদো নামে একজন গোলমেশিন ছিলেন, মার্সেলো-মড্রিচ-র‍্যামোসেরাও ছিলেন সেরা ফর্মে। এখন রোনালদো নেই, বাকীরাও ক্যারিয়ারের গোধুলী লগ্নে দাঁড়িয়ে। এই দল নিয়ে খুব বেশিকিছু করা হয়তো সম্ভব না, তবে ট্রান্সফার উইন্ডোটা ঠিকঠাকমতো ব্যবহার করতে পারলে জিদানের ঝুলি থেকে ম্যাজিক বেরুতে সময় লাগবে না। সেই ম্যাজিকের অপেক্ষাতেই আছেন এখন মাদ্রিদের সমর্থকেরা!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button