মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

কন্টেন্টের মান ঠিক না করে ‘বন্ধ বন্ধ খেলা’ খেললেই হবে?

ধরুন পাশাপাশি দুটো মাঠে মেলা আয়োজন করা হয়ছে। একটাতে এসেছে দেশবিখ্যাত সার্কাস পার্টি, বসেছে তকতকে সব দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোঁরা, নামকরা কারিগররা এসেছেন তাঁদের সেরা সব পণ্য নিয়ে, ঝকঝকে লাইটিং, আয়োজন। আরেকটাতে এসেছে ধুঁকতে থাকা এক ম্যাড়ম্যাড়ে সার্কাস তাদের প্রায় মরতে বসা কিছু পশুপাখি। সেটাতে না আছে ভাল কোনো খাবার জায়গা, না আছে ভাল কোন কারিগর কিংবা পণ্য। সবকিছুতেই কেমন যেন একটা মরাটে মরাটে ভাব। বলুনতো কোন মেলাতে বেশী লোক যাবে? অবশ্যই প্রথমটাতে, তাই না?

এখন যদি এক ঝালমুড়িওয়ালা আসে তার পসরা বিক্রি করতে, সে কোন মেলাতে যাবে? অবশ্যই সে যাবে সেটাতেই, যেখানে লোকজনের ভিড় বেশী। কারণ তার উদ্দেশ্য লোকের মাঝে ঝালমুড়ি বিক্রি করা, লোকসমাগম যেটিতে বেশী সেটিতেই হবে তার স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক গন্তব্য।

ভাবছেন সকাল সকাল মেলা কিংবা ঝালমুড়িওয়ালার গল্প ফেদে বসলাম কেন? সম্পর্কটা দেশীয় টিভি নেটওয়ার্কে এ্যাড দেয়া-না দেয়ার বিতর্ক নিয়ে। গেল কয়েক বছরধরেই দেশের বেসরকারী টিভি সংশ্লিষ্ট লোকজনেরা অভিযোগ-অনুযোগ করে চলছেন যে, কোম্পানীগুলো দেশী টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন না দিয়ে অন্যদেশের চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, এতে করে দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

সোজাভাবে চিন্তা করলে আমিও তাঁদের সাথে একমত; আমিও তাঁদের মতই দেশের টাকা দেশে রাখারই পক্ষে – তাতে সার্বিকভাবে দেশেরই উপকার। কিন্তু একটু চিন্তা করে বলুন তো কেন কোম্পানীগুলো বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে? কেন আমার দেশে প্রায় ৩০ টির মত চ্যানেল থাকার পরেও কোম্পানীগুলো বিদেশের চ্যানেল বেছে নিচ্ছে তাদের বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য? বিদেশী চ্যানেলের জন্য কোম্পানীগুলোর এই দূর্বলতা কেন?

কারণটা কোনও পক্ষপাতিত্ত্ব কিংবা দুর্বলতা নয়; বরং একদম সোজা-সরল আর যৌক্তিক। বিদেশী চ্যানেল দর্শকদের আকর্ষণ করে বেশী, দর্শক দেখে বেশী তাই, আর কিছুই না। অর্থাৎ, শুরুতে বলা সেই প্রথম মেলার মাঠের মত, যেখানে লোকের ভীড় বেশী। বিজ্ঞাপন দাতা হিসেবে কোম্পানীগুলোর উদ্দেশ্য একটাই- তাঁদের পণ্যের কথা মানুষকে জানানো। যত বেশী, যত এফেক্টিভলী এবং যত এফিসিয়েন্টলি সম্ভব। স্বাভাবিকভাবেই তারা সেখানেই যাবে, যেখানে দর্শকের ভীড় বেশী। অনেকটা সেই ঝালমুড়িওয়ালার মতই- ভীড় যেখানে, ঝালমুড়িওয়ালাও সেখানে।

এখন ঝালমুড়িওয়ালাকে নিজের মাঠে নিয়ে আসার দায়িত্বটা কিন্তু মেলায় আয়োজকদের, তবে সেটি জোর-জবরদস্তি করে না, বরং যার যার মেলায় ভাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বেশী লোক টেনে আনার মাধ্যমে। লোক আসলে ঝালমুড়িওয়ালাও একা একাই, নিজের গরজেই আসবে। তাকে জোর কিংবা অনুরোধ-আদেশ করতে হবে না। সে আসবে তার নিজের স্বার্থেই। ঠিক সেভাবেই বিজ্ঞাপন দাতাকে নিজের চ্যানেলে নিয়ে আসার দায়িত্ব চ্যানেল কর্তৃপক্ষেরই, তবে সেটি জোর করে বা আইন করে হবে না; সেটি হবে শুধুমাত্র যদি চ্যানেলের প্রোগ্রাম বা কন্টেন্টগুলো এমন হয় যেটি দেখতে দর্শকদের ভীড় তৈরী হয়। সেটি না করে আইনকানুন কিংবা নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে কি বিজ্ঞাপন আনা যায়? বা কিছু দিনের জন্য আসলেও সেটি কি আদৌ টেকসই কিছু?

না, ভারতীয় চ্যানেলের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র দূর্বলতা নেই। বরং জি-বাংলা, স্টার প্লাসের সারবত্ত্বাহীন কিম্ভুত ফ্যান্টাসীপূর্ণ কাহিনীর রবারের মত অসীম দৈর্ঘ্যের সিরিয়াল আর এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমিও সবার মতই ত্যাক্ত-বিরক্ত! গতকাল জি-বাংলা বন্ধের খবরে অন্য অনেকের মতই আমিও মনে মনে বলেছি ‘আলহামদুলিল্লাহ্’। তবে যে কারণে এটি বন্ধ হয়েছে সেই কারণটি যৌক্তিক কিংবা টেকসই নয়।

দেশীয় চ্যানেল কর্তৃপক্ষ গত কয়েকবছর ধরে সরকারী মহলে দৌড়-ঝাঁপ করে চলেছেন আইন করে বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন বন্ধ করার জন্য। যদিও তাঁরা একটিবারের জন্যেও বিজ্ঞাপনদাতাদের সাথে বসেননি এটি জানার জন্য যে কেন বিজ্ঞাপনদাতারা তাঁদেরকে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন না।

সমস্যাটা কি? এরকম কোন খোলামেলা আলোচনা হয়েছে বলে অন্ত:ত আমার জানা নেই। দেশীয় চ্যানেলের সন্মানিত কর্তৃপক্ষের কাছে কাছে আমার একটিই প্রশ্ন- “আইন করে বন্ধ না করে আপনারা কেন আপনাদের চ্যানেলের প্রোগ্রাম তথা কন্টেন্টগুলো মান উন্নয়নের জন্য নজর দিচ্ছেন না?” সেটি করলে তো বিজ্ঞাপনদাতারা এমনিতেই আপনাদের চ্যানেলে টাকার ঝুড়ি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরত, আপনারা তখন বরং উল্টো শিডিউল দিতেই হিমসিম খেতেন! এই সোজা সমাধানটি না করে আপনারা আইন করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে এত সময়, অর্থ এবং শ্রম ব্যয় করছেন কেন?!?

আমার ঘরেও একখানা টিভি সেট আছে। তবে সেটিতে শেষ কবে টুকটাক খবর-টবর ছাড়া বাংলাদেশী চ্যানেল দেখেছি আমার মনে নেই। আমি মূলত NatGeo, History, Fox Life, TLC আর Youtube এবং Netflix এর দর্শক। যতবার বাংলাদেশী চ্যানেলের প্রোগ্রাম দেখার চেষ্টা করেছি, ভাঁড়ামী কিংবা গদগদ প্রেমপূর্ণ নাটক (যার ভেতর বেশীরভাব অংশজুড়েই থাকে মোবাইলে আলাপন কিংবা উচ্চস্বরে ঝগড়া) ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়েনি।

আর দশটা বাজলেই শুরু হয়ে যায় টক-শো। কিছু চেনা চেহারার লোক আছেন যাঁরা মোটামুটি ফুটপাতে বিক্রি হওয়া সর্বরোগের বটিকার মত সর্বজ্ঞানী। বাংলাদেশের ক্রিকেটের পারর্ফমেন্স থেকে শুরু করে সড়ক নিরাপত্তা-নদী দখল-ক্রস ফায়ার-অবাধ নির্বাচন-দূর্নীতি-অগ্নি নিরাপত্তা-মেসির খেলা-ট্রাম্পের পলিসি কিংবা ব্রেক্সিটের জন্য টেরেসা মে’র করণীয় সকল বিষয়েই কথা বলেন, উপদেশ দেন। তাঁরা গণ্যমান্য এবং জ্ঞানী আমার তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে একেকজন মানুষ কি করে দুনিয়ার সব বিষয়েই এত জ্ঞানী হন সেটি আমার মোটা মাথায় ঢোকে না।

আর আমাদের বাতাবী লেবুর টিভির কথা আর নাই বা বললাম । সুতরাং, আমি অন্তত: টিভির দেশীয় চ্যানলগুলোতে দেখার মত কিছুই খুঁজে পাই না। তাই, শেষ ভরসা NatGeo, History, Fox Life, TLC, Youtube এবং Netflix. মজার ব্যপার হচ্ছে বিদেশী কন্টেন্ট দেখতে দেখতে ক্লান্ত লাগলে Youtube এ খুঁজে খুঁজে বিটিভির সেই নব্বই দশকের অসাধারণ নাটকগুলো বের করে দেখি- অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, বারো রকম মানুষ, আজ রবিবার, এই সব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, সংসপ্তক, মৃত্যুক্ষুধা… … … আহ্ কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব।

একেকটা ধারাবাহিক নাটক আমার অন্তত ৪-৫ বার করে দেখা হয়ে গিয়েছে, তারপরও সময় পেলেই আবার ছেড়ে বসি দেখতে। মজার ব্যপার হলো আমার ১২ বছরের মেয়ে যে কিনা বিদেশী কন্টেন্ট দেখেই অভ্যস্ত, যার কাছে কি না দেশীয় নাটক মানেই ম্যাড়ম্যাড়ে-বিরক্তিকর কিছু অংগ-ভংগী, তাকে জোর করে নিয়ে প্রথম একদিন বহুব্রীহি দেখতে বসলাম। দেখি মেয়ে আমার সুপার গ্লুর মত আটকে গেল স্ক্রীনে। তারপর প্রতি সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরলেই আব্দার- এর পরের এপিসোড দেখব। এভাবে একে একে ওকে নিয়ে আবারও শেষ করলাম সেই সময়ের নাটকগুলো।

ভেবে দেখুন সেই নব্বই দশকের কন্টেন্টগুলোর ক্ষমতা ! ত্রিশ-পয়ত্রিশ বছর পরেও দর্শককে আটকে রাখতে পারে! এমনকি এযুগের Full HD, 3D কন্টেন্ট দেখে বড় হওয়া, নতুন-নবীন দর্শককেও! আপনারা কেনো এখন এমন কন্টেন্ট তৈরী করতে পারেন না? অথচ, লাইটিং, ক্যামেরা, এডিটিং, ব্রডকাস্টিং ইত্যাদি টেকনলজিতে আপনারা তো এখন সেই সময়ের চাইতে যোজন যোজন এগিয়ে ! তারপরও কেন পারছেন না? একবারের জন্যেও সেটি ভেবে দেখেছেন কি?

জি-নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়েছে, ভাল হয়েছে। তবে সেটি এর সংষ্কৃতি-ধ্বংস করা কন্টেন্টের জন্য নয়। বরং এটি বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশী পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য। বিজ্ঞাপন তো স্টার নেটওয়ার্কেও দেখায়। সেটিও বন্ধ করে দেবেন? এর পর? Sony? HBO? NatGeo? History? Discovery? TLC? Euro TV? সব? বাহ্ বাহ্! আমিতো Youtube দেখব । তখন কি করবেন? Youtube-ও বন্ধ করবেন? তারপর? Netflix? Amazone Prime?!?

ব্যপারটা তো তবে সেই ডাক্তারের মত । রোগ হয়েছে খালেকের, আর অষুধ খাওয়াচ্ছেন মালেককে! কিন্তু ডাক্তারসাহেব, তাতে কি খালেকের অসুখ সারবে? আমার তো মনে হয় এতে করে বরং খালেক বেচারা মারা যাবে! আপনার কি মনে হয়?

এইসব উল্টা চিকিৎসা না করে, বরং ঠিক চিকিৎসা করুন। লবিং-আইন করে জোর-জবদস্তি না করে নিজেরা ভাল কন্টেন্ট তৈরী করুন। দেখবেন দর্শকরা ছুটে আসবে। আর দর্শকরা আসলে বিজ্ঞাপনদাতাদের লাইন পড়ে যাবে আপনার চ্যানেলের সামনে। সেটি না করে বাকী যাই করুন, লং-টার্মে লাভ নেই। আপনার মাঠের মেলাকে ঠিকঠাকমত সাজান, ঝালমুড়ীওয়ালা এমনিতেই আসবে। তাকে বেঁধে-ধরে আনতে হবে না। কোন দিন আনতে হয়ও নি, আনা যায়ও নি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button