ইনসাইড বাংলাদেশরক্তাক্ত একাত্তর

জহির রায়হানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত প্রোপাগান্ডা ও তার জবাব!

”জহির রায়হান তো এক বিখ্যাত সাংবাদিক আছিল, বুঝলা? ফিল্মও ভি বানাইত। একাত্তর সালে গণ্ডগোলের সময় আওয়ামিলিগ নেতারা যখন পলায়া গিয়া কলকাতায় খারাপ পাড়ায় আকামকুকাম করতেছিল, তখন এই ব্যাটা হেইডি ভিডু কইরা একটা ফিল্মই বানায়া ফেললো। হের কাছে আরও তথ্য আছিল, ফাঁস কইরা দিতে চাইছিল। হ্যাঁর লাইগাই তো শেখ মুজিবে দেশে ফিরাই তারে গুম কইরা ফেললো। আহারে, বড় ভালো লোক আছিল!”

”এই যে আজ কিছু লোক গোলাম আজম সাহেব, নিজামী সাহেবদের বিরুদ্ধে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো জঘন্যতম অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালায়, আসল সত্যটা জানলে তো এদের পেট খারাপ হয়ে যাবে। আসল সত্যটা হচ্ছে, একাত্তরের গণ্ডগোলের সময় আসলে ভারতীয় সেনারা মুক্তিযোদ্ধার ছদ্মবেশে খুন, ধর্ষন করে পাকিস্তানী সেনাদের উপর দোষ চাপিয়েছিল। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের পর দেশে ফিরে যাবার সময় তারা সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। জহির রায়হান এসব জানতেন। তার কাছে সব প্রমান ছিল। আর সেগুলো ফাঁস করে দিতে চেয়েছিলেন বলেই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” এর এজেন্টরা তাকে গুম করে ফেলে। নইলে স্বাধীন দেশে একটা জলজ্যান্ত মানুষ কিভাবে গুম হয়ে যাবেন?”

*

প্রথম প্যারাটা ক্লাস নাইনে পড়ার সময় হামিদ স্যার “সময়ের প্রয়োজনে” পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন। আর দ্বিতীয় প্যারাটা ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় “কিশোর কণ্ঠ” পাঠচক্রে শিবিরের এক সফেদসৌম্য চেহারার এক আদিম বর্বর পাষণ্ডের মুখে শোনা। অনেক দিন পর্যন্ত কথাগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল। তারপর একদিন “সময়ের প্রয়োজনে” গল্পটা পড়লাম। অনেকক্ষন চুপচাপ বইটা জড়িয়ে ধরে বসেছিলাম সেদিন। চোখের পানিতে পাতাগুলো ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে যে কত অসংখ্যবার গল্পটা পড়েছি, ইয়ত্তা নেই। মুসলিম বাজার বধ্যভূমিটার উপর বিশালকায় মসজিদটা কিংবা পাশেই ওই শাদা পানির পাম্পটা- কত দিন গিয়ে পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেছি, নিজেও জানি না। জহিরের কথা মনে পড়তো- ওই যে হালকা গড়নের সদা হাস্যোজ্জল মানুষটা, পকেটে মাত্র ছয় আনা নিয়ে একটা রঙিন সিনেমা বানিয়ে ফেলার সাহস করতো যেই বিস্ময়কর জাদুকর… সেই জহির রায়হানের কথা…

হাতের কাছে যা আছে, তাই দিয়েই সিনেমা বানাবো- এই ছিল মানুষটার মন্ত্র। অসম্ভব প্রতিভাধর ছিল, যা চাইতেন, নিখুঁত দক্ষতায় সেটা নামিয়েও আনতেন তিনি। ১৯৫৭ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে “জাগো হুয়া সাভেরা” দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখা সেই ছেলেটা তার পরের ১৩ বছর উপহার দিয়ে যান ‘সোনার কাজল’ (১৯৬২), ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩), ‘সঙ্গম’ (উর্দু : ১৯৬৪), ‘বাহানা’ (১৯৬৫), ‘বেহুলা’ (১৯৬৬), ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) আর ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)’র মতো অসামান্য সব চলচ্চিত্র। অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর হয়ে এই সময়টাতেই একে একে প্রকাশিত হয় শেষ বিকেলের মেয়ে, আরেক ফাগুন, বরফ গলা নদী, আর কত দিন-এর মতো কালজয়ী সব উপন্যাস আর সূর্যগ্রহন (১৩৬২ বাংলা), তৃষ্ণা (১৯৬২), একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৭০) কয়েকটি মৃত্য এর মত অভূতপূর্ব সব গল্পগ্রন্থ। ৭০’রের শেষদিকে তার উপন্যাস “আর কত দিন” এর ইংরেজি ভাষান্তরিত চলচ্চিত্র “লেট দেয়ার বি লাইট”-এর কাজে হাত দেন জহির। কিন্তু একাত্তরের সেই অভূতপূর্ব বিভীষিকা থামিয়ে দেয় সব!

একাত্তর জহিরের জীবনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এক বিচিত্র সমীকরণের সামনে। ৫২’র ভাষা আন্দোলনের ১৪৪ ধারা ভাঙ্গা প্রথম ১০ জনের একজন ক্র্যাক জহির রায়হান একাত্তরের পুরো সময়টা প্রাণ হাতে করে ছুটে বেড়িয়েছেন রক্তাক্ত বাঙলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি আর আদ্দিকালের একটা ক্যামেরা সম্বল করে বানিয়েছেন গণহত্যার উপর নির্মিত পৃথিবীর ইতিহাসের অবিসংবাদী সেরা পাঁচটি ডকুমেন্টরির একটি “স্টপ জেনসাইড” (নিজস্ব মতামত)। তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানীদের বর্বরতা আর নৃশংসতার এক অনবদ্য উপাখ্যান। “বার্থ অফ আ নেশন” ছিল তার সৃষ্টি, বাবুল চৌধুরীর ‘ইনোসেন্ট মিলিয়ন’ আর আলমগীর কবীরের ‘লিবারেশন ফাইটারস’ এর পেছনের কুশীলবও ছিলেন তিনি। একাত্তরের রক্তাক্ত জন্মইতিহাসের অসংখ্য অধ্যায়ের খবর জানা ছিল তার, তাই দেশে ফেরার পর যখন বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করলেন, তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে একটুও দেরি করেনি আলবদরের ঘাতকবাহিনী।

এ বি এম খালেক মজুমদার ছিল ৭১-এর কুখ্যাত আল বদর কমান্ডার। জহির রায়হানের বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে কালো কাপড়ে চোখ বেধে তুলে নিয়ে যাবার সময় তাকে চিনে ফেলেছিলেন শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার। সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে পান্না বলেছিলেন,

যখন ওকে (শহীদুল্লাহ কায়সার) অন্ধকার ঘর থেকে টান দিয়ে আমার সঙ্গে বারান্দায় নিয়ে এলো, পেছন থেকে ওর হাতটা ধরে আমিও বারান্দায় গেলাম। গিয়ে তাড়াতাড়ি সুইচটা অন করে দিলাম। সব আলো হয়ে গেল। সবার মুখে মুখোশ। আমার ননদ পাশ থেকে দৌড়ে এলো। ও তখন সন্তানসম্ভবা। উপায়ান্তর না পেয়ে একজনের মুখের কাপড়টা টান দিয়ে খুলে ফেলল। সে-ই ছিল খালেক মজুমদার (এ বি এম খালেক মজুমদার)

দেশে ফিরে দাদার নিখোঁজ হবার খবর পেয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়েন পাথরকঠিন মানুষ। দাদাই যে ছিল তার সবচেয়ে বড় আপনজন! দাদা আর নেই এটা তাকে কোনভাবেই বিশ্বাস করানো যায়নি। উদ্ভ্রান্তের মত খুঁজতে শুরু করেন দাদাকে। কয়েক দিনের মাথায় বুদ্ধিজীবি হত্যা ও গণহত্যার তথ্য অনুসন্ধান এবং ঘাতকদের ধরার জন্য একটি কমিশন গঠন করেন তিনি। জহির ছিলেন এই কমিটির চেয়ারম্যান, সদস্য সচিব ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের বাশারত আলী। প্রতিদিন শত শত স্বজনহারা মানুষ আসতেন এই কমিটির অফিসে। জহিরের এই ঘাতক-দালাল নির্মুল কমিশন প্রথমেই খালেককে গ্রেফতার করাতে সক্ষম হয়। খালেককে গ্রেফতার করাবার পর প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদ শক্তির ব্যাপারে প্রায় সব তথ্যগুলো তিনি গুছিয়ে এনেছেন। এখন শুধু জাতির সামনে উন্মোচনের অপেক্ষা। এরপর আর জহিরকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুকি নিয়ে চায়নি নিজামি-মুজাহিদের আলবদর কিলিং স্কোয়াড…

হঠাৎ একদিন সকালে একটা ফোন পেলেন জহির রায়হান। সেদিন ছিল ৩০ জানুয়ারী। এর কয়েকদিন আগ থেকেই রফিক নামের এক ব্যক্তি জহিরকে আশ্বাস দিয়ে আসছিল যে, শহিদুল্লাহ কায়সার বেঁচে আছেন। তাকে জীবিত পাওয়া যাবে। জহিরের চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবির বহু বার এই রফিককে ফ্রড এবং ধাপ্পাবাজ বলে জহিরকে বোঝাতে চাইলেও দাদার শোকে পাগল প্রায় জহির তাতে কর্ণপাত করেননি। এটাই তার কাল হয়েছিল। দাদাকে শুধু একটাবারের জন্য ফিরে পেতে পৃথিবীর সবকিছু দিতে রাজি ছিলেন জহির। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল ঘাতকেরা! রফিককে ৩০শে জানুয়ারির পর আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি।

সেদিন সকালে ‘মাস্তানা’ নামে এক বিহারী নৃত্যপরিচালক তাকে ফোন দিয়ে জানায়, তার বড় ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারসহ আরও কিছু বুদ্ধিজীবীকে মিরপুরে বিহারীরা আটকে রেখেছে। যদি সেই দিনের মধ্যে তিনি নিজে উপস্থিত না হন, তবে তার ভাইকে আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু মিরপুর তো বিহারীদের দখলে। কীভাবে তিনি সেই মৃত্যুপুরীতে যাবেন? কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেইদিনই বঙ্গবন্ধুর সামরিক সচিব মইনুল হোসেন চৌধুরী সশরীরে এসে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন মিরপুরের বিহারীদের কাছে থাকা অস্ত্র উদ্ধার করে মিরপুর স্বাধীন করতে। সে উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্ট অভিযান চালাবার সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী পুরো মিরপুর ঘিরে রেখেছিল। জহির ফোনটা রেখে বেরিয়ে গেলেন। সকালের নাস্তাটা ওভাবেই পড়ে রইল, ওই তার বেরিয়ে যাওয়া…

মিরপুর বিহারী এবং পাকিস্তানী সেনাদের দখলে থাকায় সেখানে সিভিলিয়ানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। তাই চাচাত ভাই শাহরিয়ার কবিরসহ বাকিরা আর জহিরের সাথে মিরপুরে ঢুকতে পারেননি, সেনাদের কন্টিনজেন্টে একমাত্র সিভিলিয়ান ছিলেন জহির। সেনারা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো মিরপুর। এর মধ্যে মিরপুর সাড়ে এগারো নম্বর ধরে ১২ নম্বর সেকশনের দিকে যে দলটি গিয়েছিল তাতে ছিলেন জহির। দলটিতে ছিল প্রায় ৪৫-৫০ জন সেনা। গাড়িগুলো মিরপুর সাড়ে এগারো হতে ধীরে ধীরে মিরপুর ১২-এর দিকে অগ্রসর হতে হতে শাদা পানির ট্যাংকটার সামনে এসে থামে। হঠাৎই সকাল এগারোটার দিকে আচমকা কয়েকশো বিহারী এবং সাদা পোশাকের ছদ্মবেশে থাকা পাকিস্তান সেনারা ভারী অস্ত্র এবং ড্যাগার কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এই দলটির উপর হামলা করে। প্রথমে ব্রাশফায়ারেই লুটিয়ে পড়েন জহির, একটু পর বিহারিগুলো প্রচণ্ড আক্রোশে জানোয়ারের হিংস্রতায় কুপিয়ে, খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করে প্রায় সবাইকে। তারপর কোপাতে কোপাতে লাশগুলো টেনে নিয়ে যায় মুসলিম বাজারের নুরী মসজিদের পেছনের ডোবার দিকে। বাঙলা ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারের খন্ডবিখন্ড দেহ পড়ে থাকে এক কচুরিপানা ভরা ডোবায়…

*

২৮ টা বছর ওরা জহিরের মৃত্যু নিয়ে মিথ্যাচার করেছে। একটা মিথ্যা একশবার বললে ধ্রুব সত্যের মতো শোনায়। ২৮টা বছর ধরে ওরা সত্যপুত্র যুধিষ্ঠির হয়ে শুনিয়েছে,

”একাত্তরে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর রাজাকার, আল-বদরেরা কোন গণহত্যা চালায়নি, সব করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা নাম ধারন করে। আওয়ামীলীগ নেতারা কলকাতার বেশ্যালয়ে ফুর্তি করেছে একাত্তরের নয়মাস, এই সকল তথ্য আর প্রমান জহির রায়হানের কাছে ছিল, তাই শেখ মুজিবের নির্দেশে “র” তাকে গুম করে ফেলে…”; ২৮টা বছর নিজামি-মুজাহিদ আর গোলাম আজমের মতো নিকৃষ্ট কীট এই জঘন্যতম মিথ্যাচার করে গেছে বিরামহীন, একটা দেশের জন্মপরিচয়কে মুছে ফেলতে চেয়েছে নিকৃষ্টতম ষড়যন্ত্রে…

তারপরই ১৯৯৯ সাল এলো…

১৯৯৯ সালে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের মুসলিম বাজারে আবিষ্কৃত নূরী মসজিদ সম্প্রসারণ কাজ চলবার সময় শ্রমিকেরা মাটির সামান্য নিচে কংক্রিটের স্লাব দিয়ে মুড়ে দেওয়া একটা কুয়োর সন্ধান পায়। নির্মাণশ্রমিকরা কৌতূহলবশত স্লাবটা ভেঙ্গে ফেলার সাথে সাথে বেরিয়ে আসে ২৮ বছরের পুরনো নির্মম ইতিহাস। তিনটি মাথার খুলি এবং বেশকিছু হাড়সহ কাপড়চোপড় বেরিয়ে এলে শ্রমিকেরা ভয় পেয়ে যায়। আবিষ্কৃত হয় ৭১-এর এক অকল্পনীয় নির্মমতার ইতিহাস, কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫০০০ শহীদের শেষ ঠিকানা, মুসলিম বাজার নূরী মসজিদ বধ্যভূমি…

পরের দিন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপারটা হাইলাইট হলে সাড়া পড়ে যায় শহীদদের স্বজনদের মাঝে। খবরটা পৌঁছে যায় বাবার খোঁজে পাগলপ্রায় পুত্র অনল রায়হানের কাছেও। তৎকালীন ভোরের কাগজের রিপোর্টার জুলফিকার আলি মানিক এই খবরটি কাভার করছিলেন। অনলের সাথে কথা বলবার পর তিনি জোরে সোরে অনুসন্ধান শুরু করলেন। সম্মিলিত অনুসন্ধানে পাওয়া গেল ৩০ শে জানুয়ারির সেই যুদ্ধে উপস্থিত থাকা এক সেনাসদস্যের। আমির হোসেন নামের এই সৈন্য সেইদিনের সেই দুঃস্বপ্নের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন…

আমাদের সাথে যে সাংবাদিক ছিলেন, তিনি কালো মতো একটা প্যান্ট পরেছিলেন। সাদা জামা এবং তার ওপর হলুদ রঙের সোয়েটার ছিল তার গায়ে। আমাদের উপর যখন হামলা হয়, তখন দেখলাম বুকে হাত চেপে ধরে-ওখানে একটা দেয়াল ছিল, তার গায়ে পড়ে গেলেন। দেখলাম, ওনার কাপড় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। তারপর আমি কিছুদূরে একটা গাছের পেছনে আশ্রয় নিয়ে দেখি কয়েকশো বিহারী ড্যাগার আর কিরিচ নিয়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসল। তারপর তারা মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলো কোপাতে কোপাতে টেনে পানির ট্যাংকের পশ্চিম দিকে টেনে নিয়ে গেল। তারপর আর আমি সেই লাশগুলোকে খুঁজে পাইনি।

১৯৯৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জুলফিকার আলি মানিকের প্রতিবেদন ‘নিখোঁজ নন, গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন জহির রায়হান’’ হইচই ফেলে দেয় সর্বত্র। এদিকে একই বছরের ১৩ আগস্ট সাপ্তাহিক ২০০০ এ (বর্ষ ২ সংখ্যা ১৪) বাবার নিখোঁজরহস্য উন্মোচন করে প্রকাশিত হয় জহির রায়হানের পুত্র অনল রায়হানের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন পিতার অস্থি’র সন্ধানে

*

অস্কার পুরস্কার বিতরণী মঞ্চ। উপস্থাপকের দিকে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ, টানটান উত্তেজনায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। উপস্থাপকের ঠোঁটে রহস্যের হাসি। শেষ পর্যন্ত সেরা চলচ্চিত্রের নাম ঘোষিত হল, মনোনয়ন পাওয়া গুণী পরিচালকদের বিশ্বসেরা সব চলচ্চিত্রকে পেছনে ফেলে সকলের বিস্ফোরিত দৃষ্টির সামনে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে ঘোষিত হল Mirpur-The Last Battlefield এর নাম। সেরা স্ক্রিপ্ট, সেরা সিনেমাটোগ্রাফি,সেরা সঙ্গীত সহ আরো ছয়টি বিভাগে অস্কার জিতলো মুভিটা, এর মধ্যে সেরা পরিচালকও ছিল। সেরা স্ক্রিপ্টরাইটারের অস্কারে ঘোষিত হল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম, সেরা সঙ্গীত পরিচালকের ক্যাটাগরিতে অস্কার পেলেন প্রথিতজশা সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ আলতাফ মাহমুদ, আর সেরা পরিচালকের নামটা উচ্চারন করতে গিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেলেন উপস্থাপক… তারপর হঠাৎ গমগমে গলায় উচ্চারন করলেন, অ্যান্ড দ্যা অস্কার গোজ টু দ্যা ওয়ান অ্যান্ড অনলি, জহির রায়হান…

অপেক্ষায় হাস্যোজ্জ্বল উপস্থাপক, অপেক্ষায় অস্কারের ঝলমলে মঞ্চ, অপেক্ষায় পৃথিবী। শহীদুল্লাহ কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হানদের অপেক্ষায় মহাকাল। কোথায় ওঁরা? কোথায়?

তথ্যসুত্র-

  1. ডেথ অফ আ জিনিয়াস
  2. জামাতে মওদুদীর খালেক মজুমদারঃ এ ঘাতককে চিনে রাখুন
  3. জহির রায়হানঃ হারিয়ে যাওয়া এক সুর্যসন্তান
  4. জহির রায়হান : অন্তর্ধান বিষয়ে ১৯৭২ সালের একটি লেখা
  5. লেট দেয়ার বি লাইট
  6. জহির রায়হানের ছেলে অনিল রায়হানের প্রতিবেদন- পিতার অস্থি’র সন্ধানে 
Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button