খেলা ও ধুলা

বাবার স্বপ্ন ও একজন ইয়াসির আলী!

অ্যালেক্স হেলস আর রাইলি রুশোর জোড়া শতকেই ম্যাচ প্রায় শেষ। চিটাগাং ভাইকিংস এই রান তাড়া করে জিতবে, এমন বিশ্বাস তাদের নিজেদেরও ছিল না বোধহয়। হারের ব্যবধানটা কত হয়, সেটাই ছিল দেখার বিষয়। তবে ইয়াসির আলী নামের ‘প্রায় অচেনা’ এক তরুণ ভাবলেন, আরও কিছু করে দেখানো যাক। খেলে ফেললেন ৭৭ রানের এক মনোমুগ্ধকর ইনিংস! ইয়াসিরকে প্রায় অচেনা বলছি একারণেই যে, ঘরোয়া ক্রিকেটের খোঁজখবর না রাখলে ইয়াসিরকে ভালোভাবে চিনবেন না অনেকেই। এবারের বিপিএল দিয়েই পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছেন চট্টগ্রামের এই তরুণ, যদিও বিসিএল, জাতীয় লীগ কিংবা ইমার্জিং এশিয়া কাপে ধারাবাহিকভাবেই রানের ফুলঝুরি বইয়ে দিয়ে এসেছেন ইয়াসির।

বিপিএলে এটা ইয়াসিরের চতুর্থ আসর, তবে আগের তিন মৌসুমে সেভাবে সুযোগ পাননি, নজরও কাড়তে পারেননি। এবারও প্রথম দুই ম্যাচে জায়গা হয়নি দলে। আশরাফুলের বদলী হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন, এবারের আসরে নিজের প্রথম ম্যাচেই করলেন বাজীমাত! ৩৪ বলে ৪১ রানের ইনিংসটা হয়তো বিধ্বংসী নয়, কিন্ত দারুণ কিছু করার প্রতিশ্রুতি তো দিতে পারলেন! পরের ম্যাচে মাত্র চার রান, আর তৃতীয় ম্যাচেই পেয়ে গেলেন ফিফটিও! ৩৬ বলে ৫৪ রানের ইনিংসটায় ইয়াসির জানান দিলেন নিজের সামর্থ্য। আর গতকাল তো ওয়ান ম্যান আর্মি হয়ে লড়ে গেলেন শেষ অবদি। তার হার না মানা জেদের কারণেই রানপাহাড়ে চাপা পড়ে বিদ্ধ্বস্ত হতে হয়নি ভাইকিংসদের।

ইয়াসির ব্যাটিংটা করেন মাথা খাটিয়ে। ক্যারিয়ারের পিক টাইমে আছেন এখন, বিপিএলের আগে শেষ হওয়া বিসিএলেও রান পেয়েছেন, ইমার্জিং এশিয়া কাপেও পারফরম্যান্স ছিল ভালো। সেই ধারাবাহিকতাটা বিশ ওভারের ক্রিকেটেও ধরে রেখেছেন, ব্যাট হাসছে তার। ক্ল্যাসিক্যাল ধাঁচে বলকে আলতো স্পর্শে যেমন সীমানাছাড়া করছেন, ঠিক তেমনই আবার আন-অর্থোডক্স শটে উইকেটের পেছন দিয়েও ছক্কা হাঁকাচ্ছেন।

আর সবচেয়ে যেটা ভালো লেগেছে ইয়াসিরের মধ্যে, সেটা অবশ্যই সিঙ্গেল বের করার তাড়নাটা। ডট বলের মূল্যটা ইয়াসির বোঝেন, আর তাই চার-ছক্কার ক্রিকেটে এসেও সিঙ্গেল-ডাবলসের প্রতি ইয়াসিরের আগ্রহটা দেখার মতো! প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে তিন হাজারের ওপরে রান তার, গড় পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই- এই পরিসংখ্যানটুকুও তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভক্তদের জন্যে আশা জাগানিয়া! ব্যাটিং টেকনিক বয়সের বিবেচনায় বেশ ভালো, ক্রিকেটীয় মস্তিস্কও যথেষ্ট পরিণত। জাতীয় দলের সিনিয়র ক্রিকেটার আর কোচের সংস্পর্শ নিয়মিত পেলে কুঁড়ি থেকে ফুল হয়ে ফুটতে সময় লাগবে না ইয়াসিরের।

অথচ ইয়াসির হয়তো এবারের বিপিএলে দর্শক হয়েই থাকতেন! মাথা ঠাণ্ডা রেখে সপাটে চার-ছক্কা হাঁকানো ইয়াসিরের ক্রিকেট খেলাটাই বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল কিছুদিন আগে। মাস ছয়েক আগে মিরপুরে তাকে বহনকারী রিক্সাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়েছিল একটা সিএনজি, রাস্তায় পড়ে গিয়ে পায়ে গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন ইয়াসির। প্রায় চারমাস একদম শয্যাশায়ী হয়েই থাকতে হলো।

এরকম একটা ধাক্কা যে কোন ক্রিকেটারের জন্যেই সামলানোটা কষ্টকর, অনেকে তো ভেঙেও পড়তেন হয়তো। তবে ইয়াসির প্রমাণ করেছেন, তিনি অন্য ধাতুতে গড়া। ইয়াসিরের জন্ম আর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে। এই চট্টলা থেকেই জাতীয় দলে খেলেছেন আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নুরা, সেই লিগ্যাসিটা বয়ে নিয়ে গিয়েছেন আফতাব, নাফীস-তামিমেরা। এরপরে পাইপলাইনটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কেন যেন, বন্দরনগরী থেকে উঠে আসছিল না তরুণ প্রতিভা।

১৯৯৭ সালে আকরাম খানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন আইসিসি ট্রফি জিতলো, ইয়াসিরের বাবা তখনই ঠিক করে রেখেছিলেন, ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন। বাবার স্বপ্নটা সত্যি করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন ইয়াসির, সেই দূর্ঘটনার পরেও মনোবল হারাননি বাবার কথা ভেবেই। পরিবার পাশে ছিল, লড়াইটাতে হেরে যেতে চাননি ইয়াসির নিজেও। আর তাই চোটের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয়েই তিনি আবার ফিরেছেন ক্রিকেট মাঠে, সৌরভ ছড়াচ্ছেন ব্যাট হাতে।

প্রত্যেক ক্রিকেটারের মূল লক্ষ্য থাকে জাতীয় দলের হয়ে খেলা। মনের কোণে সেই ইচ্ছেটা নিশ্চয়ই ইয়াসিরেরও আছে। তবে সেটাকে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে চাপ বানিয়ে ফেলতে চান না। তার কথা হচ্ছে- “আমি যখন যেখানে খেলি, নিজের সেরাটা দিয়ে খেলি। মনের মধ্যে তাগিদ থাকে, সেটা যেখানেই হোক। হোক সেটা বিসিএল, এনসিএল, কিংবা পাড়ার লিগ, সব সময় চাই ভালোটাই খেলি। নিজের সেরাটা দেওয়ারই চেষ্টা থাকে। জাতীয় দলের জন্য আমি তৈরি কিনা সেটা আমার পারফরম্যান্সই বলবে। আমার ব্যাটিং বলবে। যখন আমার ব্যাট ভালো করবে, তখন নির্বাচকরা যদি মনে করেন, অবশ্যই হবে সুযোগ।”

সেই সময়টা হয়তো খুব বেশি দূরে নেই, ইয়াসিরের বাবা দুই দশক আগে যে স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে ক্রিকেটার বানাতে চেয়েছিলেন, সেটা তো এখন চূড়া ছোঁয়ার অপেক্ষায়! ইয়াসিরের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স যে তেমন ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এই ফর্ম আর টেম্পারমেন্টটা ধরে রাখতে পারলে চট্টগ্রামের তরুণের জন্যে জাতীয় দলের দরজাটা খুলতে সময় লাগবে না খুব বেশি।

ছবি কৃতজ্ঞতা- বিডিনিউজ২৪ ডটকম

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button