ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

‘পরকীয়া’ অবশ্যই ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় কাজ!

উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, ‘পরকীয়া (Adultery বা Extramarital affair বা Extramarital sex) হলো বিবাহিত কোন ব্যক্তির (নারী বা পুরুষ) স্বামী বা স্ত্রী ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির সাথে বিবাহোত্তর বা বিবাহবহির্ভূত প্রেম, যৌন সম্পর্ক ও যৌন কর্মকান্ড। মানবসমাজে এটি লঘু বা গুরুভাবে নেতিবাচক হিসেবে গণ্য।’ 

সম্প্রতি “পরকীয়া করা দোষের কিছু ন​য় , প্রতিটা প্রেম, প্রতিটা সম্পর্কই তো বাস্তবতা!”- এই শিরোনামে উইম্যানচ্যাপ্টার নামক একটি পোর্টালে সাদিয়া নাসরিন নামের একজন লেখিকার একটি লিখা প্রকাশিত হয়। উইম্যানচ্যাপ্টারের সাথে এখনই যারা পরিচিত হলেন, তাদের জানিয়ে রাখি, এটি হচ্ছে নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন লেখা প্রকাশের একটা প্লাটফর্ম। সমাজের নানা ক্ষেত্রে নারীরা এখনো যেখানে বাধাবিপত্তির মুখোমুখি হচ্ছেন, সেখানে নিজেদের ভাবনা প্রকাশের জন্য দারুণ একটি মাধ্যম এই পোর্টালটি। 

পরকীয়ার স্বপক্ষে লেখা সেই প্রবন্ধে লেখিকা লিখেছেন-

“পরকিয়া” মানে কি? পরের সাথে যে কিয়া? আরে! আমি যদি কারো সাথে ‘কিয়া’ করি, সে কি আর ‘পর’ থাকে? তাহলে পরকিয়া হয় কেমনে? সে তো ‘স্বকিয়া’। প্রতিটা প্রেম, প্রতিটা সম্পর্কই তো বাস্তবতা। সম্পর্কে অতীত বলে তো কিছু নেই। যদি কোন সম্পর্কে জড়িয়ে যাও জীবনের যে কোন প্রান্তে, সে সম্পর্ক স্বীকার করে নেয়ার সাহস অর্জন করো, মেয়ে।”

যদিও লিখাটি তিনি শুরু করেন পরকীয়ার অজুহাতে স্বামী কর্তৃক নির্যাতিতা একজন নারী ঘটনা দিয়ে। এবং তিনি এমন আরও একটি ঘটনাসহ পরকীয়ার অজুহাত দেখিয়ে নারীর নির্যাতিত হওয়ার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু এরপরই তিনি লিখেন, “ঘুরে দাঁড়াও। চিৎকার করে বলো, আমি ‘স্বকিয়া’ করি। কোন সমস্যা?” তার লেখায় মনে হলো, পরকীয়া যেনো একটি ভীষণ গর্বের শব্দ। যেন এটির বহুল প্রচার দরকার!  

অথচ লেখিকা যেটিকে ‘স্বকীয়া’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন, সেটির পিছনে যে একটি কমিটেড সম্পর্কের মৃত্যু হচ্ছে প্রচন্ড ঘৃণা এবং অসম্মানের মাধ্যমে সেটি তিনি এড়িয়ে গিয়েছেন তার ‘অত্যাধুনিক নারীবাদ’ দেখাতে গিয়ে। না, এর মানে আমি বলছি না একটা সম্পর্কে থাকা অবস্থায় একজনের অন্য কাউকে ভাল লাগতে পারবেনা। এমন কি আমি এটাও বলছি না সম্পর্কে কমিটেড বলেই কেউ কারো অন্যায় অত্যাচার মেনে নিয়ে একসাথে ‘সার্ভাইভ’ করে যাবে। একটা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়া ক্ষমতা নারী-পুরুষ দুজনেরই থাকে, থাকা উচিত, থাকা প্রয়োজন। কেউ যদি তার চলমান সম্পর্কে ‘সুখী’ বা ‘ভালো’ না থাকে, তাহলে সম্পর্ক ভাঙ্গার সিদ্ধান্তের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিশ্চয়ই আছে। সে সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া কি? সে প্রক্রিয়া হচ্ছে, মিউচুয়াল ‘ব্রেকাপ’ বা ‘ডিভোর্স’। দুইজন আলোচনা করবে, সমাধান অযোগ্য সমস্যাগুলো দেখিয়ে দুজনই একমত হয়ে আলাদা হয়ে যাবে। এবং তাদের অন্য কাউকে ভাল লেগে থাকলে তার সাথে নতুন সম্পর্কে জড়াবে। সম্প্রতি তাহসান-মিথিলার আলাদা হয়ে যাওয়া সেরকমই একটি উদাহরণ। কিন্তু লেখিকার মতো করে পরকীয়াকে ‘স্বকীয়া’ ভাবা নিশ্চয়ই সেই প্রক্রিয়া না?

তবে একেবারে লিখার শেষ অংশে লেখিকা লিখেছিলেন, “জাগো, মেয়ে, বাঁচো। যেমন খুশি তেমন বাঁচো। তুমুল বাঁচো।” এই লাইনে আমার পূর্ণ সমর্থন। মেয়ে সকল ট্যাবুর শিকল ভেঙ্গে বাঁচবে, শত বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাবে। এটা যে কোন সুচিন্তিত বিবেকই স্বীকার করে নেবে। কিন্তু গোটা লেখায় পরীকায়াকে জাস্টিফাই করে যাওয়া লেখিকার শেষ লাইন যদি উপরেরটুকু হয়। তাহলে উনার ‘যেমন খুশী তেমন বাঁচো’ কথায় একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে, এই ফাঁকি এখানকার মেয়েরা দিতে চায় না বলে আমার ধারণা। আমি আমার পরিচিত মহলের অন্তত কোন ছেলে/মেয়ে কাউকে দেখিনি ‘পরকীয়া’-কে যেমন খুশী তেমন বাঁচো হিসেবে নিয়েছে। এমন কি পুরুষ কর্তৃক তুমুলভাবে নিগৃহীত নারীও পরকীয়া করে বাঁচাকে ‘তুমুল বাঁচা’ হিসেবে দেখেনি বলেই আমার বিশ্বাস।

লেখিকা শুধু এখানেই থেমে থাকেননি! সোশ্যাল মিডিয়ায় চূড়ান্ত রকমের প্রতিবাদের মুখেও তিনি নিজেকে জাস্টিফাই করে ফেসবুকে লিখেছেন,

“গনতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সেই সাংবিধানিকভাবে আমি আমার মত প্রকাশ করেছি মাত্র, এতে এত মানুষের চুলকানি কেন? আমার যার যখন ভাল লাগে তার সাথে যৌনক্রিয়া করি, আপনার পছন্দ হলে আপনি করুণ, নইলে নাই। আমার সন্তানদের বায়োলজিক্যাল বাবা আমার বিবাহিত স্বামীকেই হতে হবে এমন কোন কথা সংবিধানে লিখা আছে? এই হীনমন্য বাঙালদের জীবনে পরনিন্দা, পরচর্চা ছাড়া আর কী আছে?”

এখানে সাবরিনা নাসরিন তার লিখায় যে স্বাধীন মত প্রকাশের ‘অসৎ’ ব্যবহার করেছেন সেটি বোধহয় তিনি বুঝতেই পারেননি! তাছাড়া ‘স্বাধীনতা’র মানে নিশ্চয়ই এই না যে, আপনার যা খুশী, যা মনে আসবে বলে দিবেন। কাল কেউ যদি বলে বসে, স্বাধীন দেশে ধর্ষকের যা খুশী করার স্বাধীনতা আছে। তাহলে? আমরা সবাই নিশ্চয়ই তার প্রতিবাদ করবো, এমনি সে প্রতিবাদে সাবরিনা নাসরিনও থাকবেন বলেই বিশ্বাস। “আমার যার যখন ভাল লাগে তার সাথে যৌনক্রিয়া করি, আপনার পছন্দ হলে আপনি করুন, নইলে নাই।” এটা আপনি করতেই পারেন, আপনার স্বামী তাতে বাধা দেয়া বা না দেয়া আপনাদের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু আপনি যদি এটা সামাজিকভাবে স্ট্যাবলিশ করতে চান, তাহলে অবশ্যই প্রতিবাদের মুখে পড়বেন। কারণ আপনি কাউকে এই দীক্ষা দিতে পারেন না, এটা এখানকার সমাজ ব্যবস্থা অস্বীকার করে। আপনি বলেছেন, “আমার সন্তানদের বায়োলজিক্যাল বাবা আমার বিবাহিত স্বামীকেই হতে হবে এমন কোন কথা সংবিধানে লিখা আছে?” আমি নিশ্চিত নই সংবিধানে লিখা আছে কিনা, তবে এটুকু নিশ্চিত যে একটা দেশের সংবিধান তৈরি হয় সেখানকার সামাজিক ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে।

‘বায়োলজিক্যাল বাবা’ বলতে তিনি বোধহয় বুঝিয়েছেন আমাদের প্রচলিত শব্দ যাকে ‘জন্মদাতা বাবা’ বলে প্রকাশ করে। জন্মদানের এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদ্ধতিই ‘সেক্স’। প্রযুক্তির কথা সংগত কারণেই আসছে না, যেহেতু উনি অবাধ ‘যৌনক্রিয়া’কে স্বীকার করেই এটুকু বলেছেন। তাহলে তিনি কি বলতে চাইছেন, স্বামীর অজান্তে অন্য কারো স্পার্মে জন্ম নেয়া বাচ্চাকে সন্তান হিসেবে কারো স্বামী মেনে নিবেন? আমাদের এখানকার বা গোটা বিশ্বেরই কোন সামাজিক অবস্থা উনার মতো ‘উন্নত’? যেখানে সামান্য ‘প্রেম ছিলো’ এমন অজুহাতে মেয়ের বিয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে, যেখানে যৌতুক এখনো বিয়ে না হবার অন্যতম কারণ; সে দেশে সাদিয়া নাসরিনের মত এত ‘অত্যাধুনিক নারীবাদী’ দিয়ে দেশের পিছিয়ে পড়া নির্যাতিতা নারীর কোন লাভ আছে কি?

সাদিয়া নাসরিনকে এটুকু বুঝতে হবে যে, স্বাধীন মত প্রকাশ মানে যা খুশী বলে ফেলা না। আমার কাছে মত প্রকাশের স্বধীনতার সহজ সংজ্ঞা হচ্ছে, স্বাধীনতার মানে সুচিন্তিত চিন্তা-ভাবনা, বিজ্ঞ মতামত। সুতরাং নারীবাদ, মুক্তমত প্রকাশ বা মুক্তচিন্তার নামে উদ্ভট কিছু বলে বসলে মানুষ কথা বলবে, সমালোচিত হতে হবে খুব স্বাভাবিকভাবেই!

তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, যে পোর্টালে লিখাটি প্রকাশিত হয়েছে তাদের নির্লিপ্ততা। অপ-এড এরকম মুক্ত গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। একটি জাতীয় পত্রিকাতেও আওয়ামী লীগ বিডের লেখা যায়, বিএনপি বিডের লেখা যায়, সেখানের এরকম পোর্টাল কমিউনিটি ব্লগের ভূমিকা পালন করবে, সেটা দারুণ ব্যাপার। তবু মডারেশন বলে তো একটা ব্যাপার আছে, তাই না? এরকম বিতর্কিত লেখা কীভাবে প্রকাশিত হয় এখানে? গুগলে সার্চ করলে বড় হরফে দেখায়, “Women Chapter — বাংলাদেশের প্রথম নারী বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল”। নারী বিষয়ক ‘পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল’- এর অবস্থা যদি এই হয়, ভিক্টিমকে ব্লেইম দিয়ে শিশু নির্যাতনকারী অপরাধীর অপরাধকে জাস্টিফাই করে লেখা লিখেন স্বয়ং এডিটর, এবং সে লিখায় ইনিয়েবিনিয়ে অপরাধীর অপরাধকে স্বীকৃতি দেয়া হয় শুধুমাত্র নারী হবার কারণে, তাহলে এর সম্পাদকীয় নীতিকে প্রশ্ন রাখাই যায়, আপনারা ভিক্টিম নাকি অপরাধীর পক্ষে? আর সর্বশেষ প্রকাশিত নারীকে পরকীয়ায় উদ্ভুদ্ধ করা লেখার শেষ লাইন যদি হয়, ‘যেমন খুশি তেমন বাঁচো। তুমুল বাঁচো।”, তাহলে এমন সম্পাদকীয় নীতি প্রশ্নের মুখে পড়বেই।

এমনিতেই এদেশে এখনো নারী ব্যাপক হারে নির্যাতিত, অধিকাংশ পুরুষ ব্যস্ত তাদের পৌরষত্ব দেখাতে। এমন অবস্থায় উইম্যানচ্যাপ্টার যদি তাদের প্রকাশিত এসব লিখাকে ‘নারীবাদ’-এর সংজ্ঞা হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেয়, তাহলে এই নারীবাদ রাষ্ট্রে নারী-পুরুষের যেটুকু সহাবস্থান ছিলো, সেটুকুও আরো শংকায় ফেলে দিতে পারে। এবং ‘উইম্যানচ্যাপ্টার’ যদি নারীবাদের উদাহরণ হয়, তাহলে তাদের এমন চিন্তা-ভাবনার কারণে নারীদের প্রতি পুরুষকে আরও সহিংস করে তোলার আশংকাও তৈরি হচ্ছে ব্যাপকভাবে। এমন কি এই উগ্র নারীবাদ পুরুষের নারীর প্রতি আক্রোশ কমার বদলে বাড়াবে নিশ্চিত! আর অবস্থাদৃষ্টিতে আঁচ করাই যাচ্ছে, সাদিয়া নাসরিনদের বর্তমান অবস্থান ও চিন্তা-ভাবনাই বরং নারীদের জন্য এখন বড় শঙ্কার কারণ। যা চলতে থাকলে সমাজ নারীবাদকে ব্যাপারটাকে জানবে প্রচন্ড পুরুষ বিদ্বেষী ও ‘বিকৃত রুচি’র চিন্তা হিসেবে। যার ভয়ানক প্রভাব পড়বে নারী-পুরুষের সামাজিক সহাবস্থানে।

এই সাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। egiye-cholo.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে egiye-cholo.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Facebook Comments

Tags

Tanvir Hossain Jony

“আমি পথ কিংবা গন্তব্যহীন, ভীষণ বেখেয়ালিপনা আমার সব নিউরন জুড়েই। তবুও এমন কিছু করে মরতে চাই, যেন আমার মৃত্যুর খবর পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় হরফে লিখা হয়, শোক নেমে আসে গোটা দেশ জুড়ে!”

Related Articles

Back to top button