তারুণ্যপিংক এন্ড ব্লু

মাথার ভেতর গাঁজা ঘুরে?

“গাঁজা”, “ম্যারিওয়ানা (marijuana)”, “পট”- যে নামেই ডাকেন, তাকে নিয়ে আমাদের জেনারেশনে বেশ হইচই চলে। গাঁজা বলতে ক্যানাবিস স্যাটিভা (Cannabis sativa) প্রজাতির শুকানো পাতা, ফুল, শেকড়, এবং বীজকে বোঝায়। এই উদ্ভিদে ডেল্টা ৯ টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC) নামক নেশাজাত দ্রব্য সহ অন্যান্য যৌগ উপস্থিত  থাকে।

আগে এটা কেবলই মাদকদ্রব্য বা নেশার বস্তু ছিল। আমরা যখন স্কুলে পড়তাম, আমার স্পষ্ট মনে আছে ম্যারিওয়ানা নিয়ে মাদকদ্রব্য বিষয়ক রচনায় পড়েছি। তবে কয়েকবছর যাবত একে নিয়ে বেশ ভাল কথা শুনে (!) এবং আমার পরিচিত, বন্ধুদের এর প্রতি আগ্রহ দেখে আমি হতবাক!

সায়েন্টিফিকলি এর কিছু উপকারিতাকে সেবনকারীরা এমনভাবে উপস্থাপন করেন আজকাল যে কিছু বলার যো নেই। তবে তারা সায়েন্সের যে অংশটুকু তাদের সাথে মেলে সেই অর্ধেকটুকু বলেন আর বাকি অর্ধেকটুকু চেপে যান। আমি বাকি অর্ধেকের গল্পটা লিখছি। গাজা সাধারণত সিগারেটের মতো এর পোড়া ধোঁয়ার নিঃশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। আরও অন্যান্য উপায় আছে। (কিন্তু এটা গাঁজা টিউটরিয়াল না, তাই আর গভীরে না যাই।)

“ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান” ১০৮ জন ব্যক্তির উপর তাদের এক গবেষণার পর জানায়, অনেকে গাঁজাকে কম নেশার দ্রব্য বললেও এটি অন্যান্য নেশা থেকেও তীব্র এবং কঠিন হয়। হেটজেগ বলেন, ‘এই পরীক্ষা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, গাঁজা মস্তিষ্ককে এমনভাবে প্রভাবিত করে যে একে সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করা কঠিন হয়ে যায় এবং মানুষের ব্যবহারের উপর প্রভাব বিস্তার করে এবং মানুষকে কিভাবে মূল্যায়ন করতে হবে সেই বোধ থেকে দূরে সরিয়ে আনে।’

এই ধোঁয়া সবসময় খারাপ মনে নাও হতে পারে, কিন্তু এটি আপনার রক্তনালীর উপর প্রভাব বিস্তার করে। “আমেরিকান হার্ট ফেডারেশন” থেকে বলা হয় এটি ক্যানসার রোগের কারণ, তবে ভাববেন না আমি ক্যানসার রোগের দোহাই দিয়ে কাউকে গাঁজা থেকে দূরে আসতে বলছি। আমি এর আগের ঘটনাগুলো নিয়ে কথা বলব যা হয়তো অনেকেই জেনেও যা জানার ভান করে আসছেন।

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সায়েন্টিস্টরা এক গবেষণা করে বলেছেন, যারা সময়ই গাঁজা সেবন করে থাকে তারা “শর্ট টাইম মেমরি লস” রোগে আক্রান্ত। এই মেমরি লস হিন্দি সিনেমার আমিরের মত শর্ট টাইমের নাও হলে স্বাভাবিক মানুষের থেকে বেশ অনেকখানিই শর্ট! এরা যখন গাঁজা সেবন করে, সে সময় থেকে বেশখানিকটা সময় পর্যন্ত এদের মেমোরি প্রচণ্ড তুখাড় থাকে। কিন্তু সেই সাময়িক সময়টা কেটে যাওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে তারা তাদের মস্তিকের অনেককিছু ভুলতে শুরু করে। এবং এমন এক অবস্থা আসে যখন কোন পড়া কিংবা গুরুত্বপূর্ন জিনিষ মনে রাখার জন্য তাদের গাঁজা সেবন করাটা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, যার ব্যতীত তাদের মস্তিষ্ক ঠিকমত কাজ করেনা।

বৈজ্ঞানিক ভাষায় বলতে গেলে,

শর্ট টার্ম ইফেক্টঃ

গাঁজার ধুঁয়া পান করার সাথে সাথে THC আমাদের ফুসফুসের মাধ্যমে দ্রুত রক্তে মিশ্রিত হতে শুরু করে। রক্ত প্রবাহ একে বহন করে ব্রেইনের এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়ে যায়। আমাদের শরীর THC দ্রুত গ্রহণ করতে পারে না বলে মোটামুটি ৩০ মিনিট পর এর প্রভাব অনুভব করা যায়।

THC কয়েকটি নির্দিষ্ট কোষের উপর কাজ করে। আমাদের কয়েকটি ইন্দ্রিয়কে মাত্রাতিরিক্ত সক্রিয় করে দেয়। যার ফলে আমরা

  • গাঢ় রঙ দেখতে পাই
  • সময়জ্ঞান ঠিকভাবে কাজ করে না
  • মুড পালটে যায়
  • শরীরের উপর নিয়ন্ত্রন হারাই
  • কোনকিছু ভাবা বা মনে করা কঠিন হয়ে যায়

লং টার্ম ইফেক্টঃ

অল্প বয়সে গাঁজা সেবন শুরু করলে মস্তিষ্কের বিকাশের উপর প্রভাব পড়ে। গাঁজা সেবনের ফলে মস্তিষ্কে নিউরনের প্রয়োজনীয় সংযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়, ফলে এটি ভাবনা, মেমরি, এবং কোনকিছু শিখার ক্ষমতা ইত্যাদি কমিয়ে দেয়। গাঁজার এই ক্ষতিগুলো অনেক দিন পর্যন্ত- এমন কি সারা জীবন স্থায়ী হতে পারে।

শরীরের উপর গাঁজার প্রভাব-

  • নিঃশ্বাসে সমস্যাঃ যে কোন ধরনের ধুঁয়া পান করার ফলাফল খুবই মারাত্মক। শুধুমাত্র ফুসফুসের কথা বিবেচনা করলে সিগারেট এবং গাঁজা সমান ক্ষতিকর। ধূমপানের ক্ষতিকর দিক নতুন করে বলার কিছু নেই।
  • হৃদস্পন্দনের হার বৃদ্ধিঃ গাঁজা সেবনের ৩ ঘন্টা পর মানুষের হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। এর ফলে হার্ট-এটাক হবার সম্ভাবনা থাকে, আর যাদের আগে থেকে হৃদরোগ আছে, তাদের তো কথাই নেই।
  • গর্ভাবস্থায় গাজা সেবনঃ গর্ভাবস্থায় গাঁজা সেবনের ফলে বাচ্চার মানসিক এবং শারীরিক দিক থেকে মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।

মানসিক এবং জীবনের উপর প্রভাব-

গাঁজা সেবন কিছু লং টার্ম মানসিক সমস্যা সৃষ্টির পেছনে দায়ী। যেমন- ক্ষণস্থায়ী হ্যালুসিনেশন হওয়া, আশেপাশের মানুষের উপর অত্যধিক এবং অযৌক্তিক অবিশ্বাস জন্মানো। তাছাড়া আরও অনেক ধরনের মানসিক সমস্যা একজন গাঁজা সেবকের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। যেমন- বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মঘাতী ভাবনা ইত্যাদি। এই নিয়ে গবেষণা চলছে এখনো।

সকলের জন্যে সমান না হলেও, অল্প বয়েসিদের জন্য গাজা অত্যধিক আসক্তি সৃষ্টি করে। (বাস্তবতা পালাতে পালাতে একটা সময় মানুষের এটা ছাড়া থাকতে কষ্ট হয়। )

গাঁজা ত্যাগ করার পর কি কি সমস্যা দেখা দিতে পারে?

আপনি যত সময় ব্যাপী গাঁজা সেবন করবেন এটা ত্যাগ করা তত কঠিন হয়ে পরবে। এর ফলে নিম্নোক্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

  • খিটখিটে মেজাজ
  • অনিদ্রা
  • খাবারে অরুচি
  • উদ্বেগ
  • গাঁজার প্রতি তীব্র ক্ষুধা

গাঁজা সেবনের পর আপনি হালকা, চিন্তামুক্ত অনুভব করবেন ঠিকই, তবে এই চিন্তামুক্তির সাথে সাথে পরবর্তি জীবনের জন্য আপনি একগাদা চিন্তা কিনে আনবেন! কিভাবে ? খুব সহজ কথায় বলি, আপনি যখন নিজেকে হালকা করার জন্য, চিন্তা থেকে দূরে রাখার জন্য গাঁজা নিচ্ছেন ঠিক সেই সময় আপনার স্বাভাবিক ব্রেন তার চিন্তা করার ক্ষমতা একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছে এবং আপনি যখন গাঁজাতে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন আপনার ব্রেন তখন পুরোপুরি কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন। আপনার নিজের তখন চিন্তা করার, নিজের চিন্তাশক্তি কাজে লাগিয়ে কাজ করার ক্ষমতা একেবারে কমে যাবে এবং আপনি নেশা করে পরে থাকবেন নিজের ভালো বোঝার মতো বুদ্ধিও তখন কাজ করবে না। এটা কি চিন্তামুক্তি করতে গিয়ে বিশাল চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে না?

যারা গাঁজা খাওয়াকে স্টাইল ভাবছেন, খাচ্ছেন, তারা একবার নিজেদের পরিবর্তন গুলো নিয়ে ভাবুন, দেখুন ঠিকভাবে ভাবতে পারেন কিনা আদৌ তারপর কি করবেন, কি খাবেন, কি করবেন না সেটা আপনাদের উপর। একটু ভাবুন প্লিজ!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button