খেলা ও ধুলা

বিশ্বকাপ এবং আরো দুটি গল্পের জন্ম

Hasnain Md Akif:

প্রতিটা বিশ্বকাপ কিছু না কিছু গল্পের জন্ম দেয়, সব দেশের জন্যেই। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, ‘৯৯ বিশ্বকাপের পাকিস্তান বধের গল্প, ‘০৩ বিশ্বকাপে কানাডার কাছে পরাজিত হবার গল্প, ‘০৭ বিশ্বকাপে প্রথমবার সুপার এইটে খেলার গল্প আবার ‘১১ বিশ্বকাপের ৫৮ এবং ৭৮ রানের গল্প আর ‘১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার গল্প।

এই বিশ্বকাপের ছোট ছোট বেশ কিছু গল্পকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বড় গল্প দুটি হচ্ছে সাকিব আল হাসানের অবিশ্বাস্য পারফর্মেন্সের মাধ্যমে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার গল্প এবং মাশরাফির অধিনায়ক থেকে “খলনায়ক” বনে যাওয়ার গল্প।

অনেক অনেক বছর পরেও এই দুটি গল্প ক্রিকেট ফ্যানদের আড্ডার বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে নিশ্চিত। সাকিবকে নিয়ে লিখেছি আগেই, মাশরাফিকে নিয়ে একটু লিখি। যদিও লেখার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু না লিখেও থাকতে পারছিনা।

(১)

আসলে মানুষের জীবন কিন্তু রূপকথা না, তাই সবসময় সব অধ্যায় সুন্দর হয়না। মাশরাফির জীবন একরকম রূপকথাই ছিলো বিশ্বকাপের আগ পর্যন্ত। নড়াইলের টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলা এক কিশোরের এন্ডি রবার্টের ক্যাম্পের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণ এবং রাতারাতি দেশের প্রথম সুপারস্টার হয়ে যাওয়া একরকম রূপকথাই!

মাশরাফির তারুণ্য বাংলাদেশ দলে নিয়ে এসেছিলো নতুন প্রাণ, টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার পরের সময়টা যাদের মনে আছে তারা সবাই হয়তো মনে করতে পারবেন ব্যাপারটা। দুরন্ত গতির সাথে বলগা হরিণের মতো মাঠ দালিয়ে বেড়ানো, বল হাতে বড় বড় ব্যাটসম্যানদের খাবি খাওয়ানো ডেভ হোয়াটমোরের সেই “পাগলা” মাশরাফি প্রথম জানান দিয়েছিলেন- ফাস্ট বোলিং করেও এই দেশে সুপারস্টার হওয়া যায়। একের পর এক হারের বৃত্তে বন্দী বাংলাদেশের সেই সময়টাতে হুট করে আসা প্রায় সব জয়ে মাশরাফির অবদান থাকতো, হয় ব্যাট হাতে নতুবা বল হাতে অথবা দুটোতেই।

ক্যারিয়ার জুড়ে একের পর এক ভয়াবহ ইনজুরিকে বুড়ো আঙুল দেখানোর গল্পগুলো রূপকথাকে হার মানাবে। ছোট বেলার অন্যতম পছন্দের বোলার শেন বন্ড যেমন পরাজয় মেনে নিয়েছিলেন এইরকম ইনজুরির কাছে।

না তখন অধিনায়ক ছিলেননা, এমপিও ছিলেননা, সাধারণ ক্রিকেটার ছিলেন আর খেলাটার উপর তীব্র ভালোবাসাই তাকে ফিরে আসার সাহস দিয়েছে।

মানেন আর না মানেন, মাশরাফি ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বড় এক অনুপ্রেরণা। এবারও নাসের হুসেইন বলেছিলেন, যে কোনো ইনজুরড ক্রিকেটার মাশরাফিকে দেখে সাহস সঞ্চয় করতে পারে। অতীত নিয়ে কথা বলা আবার বিপদ। কে কী করেছে সেটা দিয়ে কী আসে যায়!

(২)

ভয়াবহ এক বিশ্বকাপ গিয়েছে মাশরাফির। পেয়েছেন মাত্র এক উইকেট। ব্যাটসম্যানদের উপর বিন্দুমাত্র প্রেসার ফেলতে ব্যর্থ হয়েছেন, বরং তাকেই টার্গেট করেছে বেশিরভাগ ব্যাটসম্যান। সমালোচনা প্রাপ্য, সমালোচনা শিরোধার্য। মাথা পেতে নিতে হবে মাশরাফিকে। অধিনায়ক এমন বাজে খেললে দলের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অবশ্যই। কিন্তু সমালোচনা আর অসম্মান কিন্তু এক কথা না, কখনোই না।

ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে সমালোচনা প্রাপ্য হলেও অসম্মান কিন্তু প্রাপ্য ছিলনা মাশরাফির। কেউ হতাশ হতে পারে, কিন্তু অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে পারেনা অবশ্যই।

এই বিশ্বকাপে এসে জানলাম মাশরাফি “ক্যাপ্টেন কোটায়” খেলছেন। অথচ সত্যি কথা হচ্ছে বিশ্বকাপের আগপর্যন্ত প্লেয়ার হিসেবে একাদশে মাশরাফির জায়গা পাওয়া পুরোপুরি পারফর্মেন্স দিয়েই বিচার করা যায়। পরিসংখ্যান দিয়েই সেটা প্রমাণ করা যায়। বিশ্বকাপের আগে মাশরাফি কখনো এতো লম্বা সময় ফর্মহীন ছিলেন না। কখনোই না। এমনকি বিশ্বকাপের আগের দুই সিরিজেও না।

আমি বুঝতে পারি, হয়তো ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে বা অন্য কাউকে ক্যাপ্টেন দেখতে চায় এমন মানুষেরাই এই “ক্যাপ্টেন কোটা” থিওরির জন্ম দিয়েছে।

হ্যাঁ, মাশরাফি আনফিট, কিন্তু আগে বলেন মাশরাফি ফিট ছিলো কবে? হয়তো কাছ দিয়ে যাওয়া বল ধরতে ডাইভ দিয়েছেন, দুর্দান্ত ক্যাচ নিয়েছেন সার্কেলের ভেতর (এশিয়া কাপে শোয়েব মালিকের ক্যাচের মতো), কিন্তু মাশরাফি কবে দৌড় দিয়ে বলের পেছনে ছুটে ফিফটি-ফিফটি বাউন্ডারি ঠেকিয়েছেন? কবে ছুটে এসে দুই রানকে এক রানে পরিণত করেছেন? কবে? বিগত দশ বছরে তো করেননি? সবসময় মাশরাফির আশপাশ দিয়ে রান লিক হয়েছে বলের গতি বেশি হলে।

অথচ বিশ্বকাপের আগে কারো মনে এই প্রশ্ন আসেনি যে কেন “আনফিট” মাশরাফি দলে থাকবে? সম্পূরক প্রশ্ন, আমাদের প্লেয়িং একাদশের ফিট প্লেয়াররা কতটুকু ভালো ফিল্ডিং করেছেন? আর আনফিট মাশরাফি তাদের তুলনায় কতটা বাজে ফিল্ডিং করেছেন?

সত্যিই অবাক লাগে যখন দেখি ওই সার্জারিগুলোকে তাচ্ছিল্য করে মাশরাফিকে “পঙ্গু” বলে অসম্মান করা হয়। আমার মনে হয় তিন নাম্বার সার্জারির পরেই অস্ট্রেলিয়ান সার্জন ডেভিড ইয়ং মাশরাফিকে খেলা ছাড়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন- অবসর না নিলে হুইল চেয়ারে কাটাতে হতে পারে শেষ বয়স। হ্যাঁ, পঙ্গুই তো! হুইল চেয়ারে যদি বসাই লাগে তাহলে তো পঙ্গুই হয়ে যাবেন, তখন না হয় বলবেন? এখনই বলার কী দরকার?

তবে এমন যেন না হয়- কোনো দূর্ঘটনায় আপনার পরিবারের কেউ পঙ্গু না হয়, আর মানুষ ব্যঙ্গ করে।

(৩)

মাশরাফির ভূমিকা নাকি এখন দলে শুধু “তুই পারবি” বলা। এই “তুই পারবি” কথাটা বলার জন্যে তো আর একাদশে থাকা লাগেনা, বাসায় বসে বা ড্রেসিংরুম থেকেই বলা যায়! কিন্তু এই কথাটাই তো কত কী বদলে দিয়েছিলো!

২০০৭ বিশ্বকাপের পর হাবিবুল বাশার পরবর্তী অধিনায়ক হলেন আশরাফুল, কিন্তু তিনি নিজের ফর্ম নিয়েই সবসময় আলোচিত থাকতেন। নিজের ফর্মের ঠিকানাই তিনি কখনো সঠিকভাবে খুঁজে পাননি, সেখানে দল সামলানো আরেক চাপ তার জন্য। আশরাফুলের পর মাশরাফি অধিনায়ক হলেন, কিন্তু আবার ইনজুরি! দায়িত্ব পেলেন সাকিব।

২০১১ বিশ্বকাপের পর নানান খবর বাতাসে। দলে সিনিয়র পাঁচজনের সাথে জুনিয়রদের গ্রুপিং। অধিনায়ক “ম্যান ম্যানেজমেন্ট” ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারেননা, যেখানে ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে সেখানে তিনি টেম্পার হারিয়ে ফেলছেন এবং আরো কত কী! ফলাফল- মুশফিকের হাতে অধিনায়কত্ব। সেটার ফলাফল কী তা সবাই জানেন। ২০১৪ সালে কোথায় ছিলো বাংলাদেশ! তখন এই “তুই পারবি” বলার জন্যে ডেকে আনা হয় মাশরাফিকে।

লিটন দাস, মেহেদি হাসান মিরাজ, মাশরাফি বিন মুর্তজা, উদ্বোধনী জুটি, এশিয়া কাপ

বাংলাদেশের কি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলার কথা ছিল? অথবা সরাসরি বিশ্বকাপে? বাছাইপর্ব খেলার বিষয়টা অনিবার্য ধরে নিয়ে ভেন্যুও বাংলাদেশকে নির্বাচন করা হয়েছিলো, পরে সেটা জিম্বাবুয়েতে স্থানান্তর করা হয়।

এই যে বাংলাদেশ সরাসরি বিশ্বকাপ খেললো, এতে যদি মাশরাফির ১০% অবদানও থাকে তবু তার শেষ বেলায় অসম্মান প্রাপ্য নয়। মুখ ভেটকিয়ে বলতে পারেন ‘১৫ বিশ্বকাপের পর তামিম অনেক রান করেছে, সৌম্য, মুস্তাফিজ এসেছে বা অনেক কিছু, কিন্তু বুঝমান মানুষ হলে জানার কথা এই সময়ে বাংলাদেশের খেলার ধরণ পাল্টে গিয়েছে মাশরাফির ক্যাপ্টেন্সির ধরণের কারণেই।

(৪)

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২০ সালে, সেটা মাথায় রেখেই ‘১৭ সালে টি-টুয়েন্টি থেকে অবসর নিয়েছিলেন, যাতে নতুন অধিনায়ক পর্যাপ্ত সময় পায় দল গোছাতে।

কিন্তু ২০১৯ বিশ্বকাপের জন্য যৌক্তিক কারনেই মাশরাফি বেস্ট অপশন ছিলেন। বেশি দূর যেতে হবেনা, এশিয়া কাপেও তার অধিনায়কত্ব ব্যাপক প্রশংসিত হয়। অধিনায়কত্ব নিয়ে কখনো প্রশ্ন উঠেওনি। এখন যারা গালাগালি দিচ্ছে, তারাও জানতো অধিনায়ক হিসেবে অন্য কাউকে নির্বাচন করার কোন কারণ ছিল না, অধিনায়কত্ব নিয়েও প্রশ্ন ছিল না, পারফর্মার হিসেবেও না।

বরং এই বিশ্বকাপে তামিম, সাকিব, রিয়াদ কারো উপর অধিনায়কত্ব করার চাপ ছিল না, সবার সুযোগ ছিলো নির্ভার ক্রিকেট খেলে সেরাটা উপহার দেয়ার। কিন্তু আফসোস! সাকিব ছাড়া অন্যরা সুযোগ নিতে পারলেন কই? আমার প্রচন্ড সংশয় আছে- অধিনায়কত্ব করতে হলে সাকিবের এই সেরা ফর্ম আমরা পেতাম না হয়তো।

তিনটা মানুষ জানতো বিশ্বকাপের পর মাশরাফি অবসর নিবেন। এমনিতেও খুব বেশি ওয়ানডে নেই পরের দেড় বছর, তার উপর হোম ওয়ানডে সিরিজ সেই ডিসেম্বর ২০২০ সালে। ফলে বুদ্ধিমান মানুষ যারা, তারা ঠিকই বুঝে ফেলেছিলেন যে এত দিন মাশরাফি অপেক্ষা করবেন না। তবু কিছু মানুষ এমন আচরণ করলো যেন বিশ্বকাপের মাঝপথেই অবসর নিতে হবে। দেশের মাটিতে অবসর নেয়ার কোন সুযোগ দিতে রাজি নন তারা।

কেন? আমার প্রশ্ন- কেন? দেশের মাটিতে অবসর নিবেন সেই অধিকার কি মাশরাফির নেই? মাশরাফি কি আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে এমপি কোটায় এবারই প্রথম বাংলাদেশ দলে খেলেছেন? বিগত ১৯ বছরের কোনো মূল্যই নেই যে দেশের মাটি থেকে অবসর নেয়ার সুযোগ দেয়া যাবেনা?

আচ্ছা টুর্নামেন্টের মাঝপথে অধিনায়ক বদল করলে কে হতেন অধিনায়ক? সাকিব? যাতে তার ব্যক্তিগত সুন্দর সময়টার উপর বাড়তি চাপ যোগ করা যায়? নাকি মুশফিক? না রিয়াদ?

সবচেয়ে বড় কথা এটা কোন প্রসেস না, এমন হয়না।

(৫)

কেন এই ভয়াবহ বাজে পারফর্মেন্স মাশরাফির?

সত্যি বলতে এটার কোন ব্যাখ্যা নেই। ক্যারিয়ারে এতদিন বাজে সময় যায়নি তার। দেশের মাটিতে উইন্ডিজ সিরিজ বা আয়ারল্যান্ড ট্রাই-সিরিজ কোথাও কিন্তু তিনি আন্ডার-পারফর্ম ছিলেন না। তবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে অবশ্যই ছিলেন। আয়ারল্যান্ডেই হ্যামস্ট্রিং এর ইনজুরি হয়েছিল, তার প্রভাব হতে পারে হয়তো। কিন্তু আসল সত্যি হচ্ছে মাশরাফি আসলে যেভাবে বোলিং করেন সেভাবেই করেছেন, কিন্তু ইংল্যান্ডের পিচে এই বোলিং নির্বিষ একেবারে। এই বোলিং এশিয়ান কন্ডিশনে হলে হয়তো এত বাজে অবস্থা হবে না।

আসলে মাশরাফির যে পেস, সাধারণত ১২৮-১৩২ কি. মি ঘন্টায়, এই পেস ইংল্যান্ডের এই ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি পিচে খুব সাবলীলভাবে খেলেছে ব্যাটসম্যানরা। এটা যদি টিপিক্যাল স্লো, লো এশিয়ান পিচ হতো, তাহলে অন্যকথা। ইংল্যান্ডে উইকেট কখনো কখনো স্লো হলেও লো বাউন্সের ছিল না। ফলে মাশরাফির বল খেলার পর্যাপ্ত সময় পেয়েছে সব ব্যাটসম্যান।

এর চেয়ে বেশি পেস মাশরাফির নেই আর এই গতিতে বল করলে কোন বোলারের “স্লোয়ার ডেলিভারি” আর কাজে আসেনা। যাদের পেস ১৪০+, তারা যদি স্লোয়ার দেয় তাহলে সেটা ব্যাটসম্যানের জন্য “সারপ্রাইজ” হয়ে যায়, মাশরাফির মতো মিডিয়াম পেসারদের স্লোয়ার তাই অকার্যকর ইংল্যান্ডের পিচে।

একটা সুবিধা পেতে পারতেন যদি ন্যাচারাল ইংলিশ সুইং থাকতো, এবার বিশ্বকাপে সেই চিরায়ত “ইংলিশ সিমিং কন্ডিশন” কমই দেখলাম। মেঘলা আকাশ, বাতাসে প্রচুর সুইং এসব কই! হয় বৃষ্টিতে ম্যাচ ভেসে যায়, আর না হয় সুন্দর রোদ। সেদিন তো দেখলাম ৪১° সেলসিয়াস উঠে গিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মাশরাফি একপ্রকার নিরুপায় ছিলেন।

এছাড়া প্রথম তিন ম্যাচে বড় প্রতিপক্ষ ছিল। সেখানে খারাপ করার সাথে সাথে যেমন সমালোচিত হয়েছেন, তাতে হয়তো অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ফেলেছেন। পরে এশিয়ার দলগুলোর বিপক্ষেও আর আত্মবিশ্বাস ফিরে আসেনি। সমালোচনা, অসম্মান, অবসরের রব উঠে যাওয়া- সব মিলিয়ে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলেন খুব সম্ভবত। যাইহোক, ৮ ম্যাচে মাত্র ১ উইকেট নিলে সমালোচিত হতে হবে এটা খুব স্বাভাবিক।

হ্যাঁ, মাশরাফি বোলিং কোটা পূরণ করেননি অধিকাংশ ম্যাচে। এতে অবাক হবার কী আছে? উনি যখন বুঝেছেন তার বোলিং দিয়ে কাজ হচ্ছেনা, বরং বল করলে আরো রান দিবেন, দলের উপর আরো চাপ বাড়বে- তখন তিনি বল করেননি। এটা হয়তো ট্রলের বিষয়, বোলার হিসেবে লজ্জার কিন্তু এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত। উপায় তো নাই!

(৬)

আমাদের পেস বিভাগ নতুন বলে টোটালি ব্যর্থ। ৮ ম্যাচ মিলে প্রথম ২০ ওভারের ভেতর পেসাররা মাত্র ৩ উইকেট নিতে পেরেছে। হয়তো মুস্তাফিজ ২০ উইকেট নিয়েছে, সাইফ ভালো বল করেছে কিন্তু সব পুরাণ বলে, ডেথ ওভারে। সেখানেও গড়ে তারা ৮.৭৫ রান করে দিয়েছে। এমনকি রুবেল যে কয় ম্যাচ খেলেছে তাতে প্রথম স্পেলে উইকেট পায়নি। অর্থাৎ নতুন বলে মাশরাফিকে কাভার করবে এমন কোন ব্যাকআপ ছিলোনা, যার কারনে এই সামগ্রিক ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে নতুন বলে মাশরাফির ব্যর্থতা আরো প্রকট আকারে ধরা পড়েছে।

এই যে কয়দিন পর মাশরাফি থাকবেনা, বা যদি বিশ্বকাপে তাকে ড্রপ করা যেতো তাহলে নতুন বলের জন্য কাকে নেয়া হতো? রিজার্ভ বেঞ্চে কে এমন ছিলো যার উপর ভরসা করা যাবে?

(৭)

ক্রিকইনফোর সাব-এডিটর, এন্ড্রু মিলার, উনি কাউন্টি খেলেছেন অনেকদিন আবার স্পোর্টস সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। দুই বছর আগে তিনি লিখেছিলেন ভারত বিশ্বকাপে ধোনী এবং যুবরাজের ভেতর একজনকে নিবে, দুইজনকে নিয়ে রিস্ক নিবেনা।

কারণ ৩৫ বছর বয়স খুব খারাপ। এইসময় প্লেয়াররা হুট করে ফর্ম হারায়, আর একবার হারালে ফিরে পাওয়া কঠিন। একজন বোলার হয়তো পারফেক্ট ইয়র্কার দেয়, হুট করে কয়েকদিনের ব্যবধানে দেখা যাবে ইয়র্কার দিলে লো ফুলটস পড়ে যাচ্ছে। একজন ব্যাটসম্যান হয়তো চমৎকার পুল করে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেখা যাবে পুল করতে গেলে মিস টাইমিং হচ্ছে! এইসময় দশ দিনের ভেতর চোখের পাওয়ার কমে যায়, ফলে হ্যান্ড-আই-কো-অর্ডিনেশন নষ্ট হতে থাকে, হুট করেই শরীরের জোর কমে যায়, গতি কমে যায় বোলারের, পাওয়ার হিটিং এবিলিটি কমে যায়, মস্তিষ্ক কাজ করে ধীরে ধীরে।

হুট করে কখন যে এমন হয়, একটা প্লেয়ার নিজেও টের পায়না। দেখেন ভারত ঠিকই একজনকে নিয়েছে আর ধোনীও তার সেরা সময়ে নেই। বছরের শুরুতে বিধ্বংসী এক সিরিজ খেলেছিলেন গেইল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, অথচ বিশ্বকাপে নিজের ছায়া হয়ে ছিলেন। টের পাননি সনাৎ জয়াসুরিয়াও, বাদ পড়েছিলেন। গাঙ্গুলিও বাদ পড়েছিলেন দল থেকে।

বাস্তবতা এটাই, মাশরাফিও টের পায়নি হুট করে এভাবে খারাপ সময় চলে আসবে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে এই সময়টা বিশ্বকাপের ভেতর চলে এসেছে।

(৮)

মাশরাফিকে ডিফেন্ড করার কোন উদ্দেশ্য আমার নেই। ওজন বেড়েছে, ফিটনেস কমেছে, হয়তো ইনজুরি নিয়ে খেলেছেন, কিন্তু বিশ্বকাপের এক সপ্তাহ আগে কি সরে গেলে ভালো হতো? তখনো সমালোচনা, গালাগালি, ট্রল চলতো।

কেউ যখন ক্রিকেটের ভেতর থেকে সমালোচনা করে তখন খারাপ লাগেনা।

কিন্তু মাশরাফির বেলায় কি হয়েছে? কেউ হয়তো অন্য প্লেয়ারের ফ্যান, তার মাশরাফিকে পছন্দ না, কারো হয়তো রাজনৈতিক কারনে পছন্দ না, তারা সবাই তক্কে তক্কে ছিলো। সুযোগ পাওয়ার সাথে সাথে যেভাবে পেরেছে সেভাবে আক্রমণ চালিয়েছে মাশরাফিকে।

আপনারা তাকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ট্রল করেন, বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মাশরাফি মোর্তুজা বলে ট্রল করেন, পীরবাবা বলে ট্রল করেন- আরো কত কি! কিন্তু অন্তত এসব তো মাশরাফির প্রাপ্য না!

মাশরাফি বিন মুর্তজা, টাইমলাইন, এশিয়া কাপ, শিরোপা, ফাইনাল, মাশরাফি ক্যারিয়ার

আপনি যতই রাজনৈতিক কারণে তাকে গালমন্দ করেন, বা অন্য কারনে, এটা মনে রাখবেন- মাঠ এবং মাঠের বাইরে এই দেশে সবচেয়ে সম্মানিত ক্রিকেটার এই মাশরাফিই। প্রায় সব দেশের সব ক্রিকেটার, ক্রিকেট ফ্যানরা তাকে যথেষ্ট সম্মান করে। আর এটা সে অর্জন করেছে, কেউ ফ্রি দেয়নি বা আপনার সম্মানের খাতা থেকে আপনি দয়া করে দেননি।

আর এটাও মনে রাখবেন- কী নমুনা বানাচ্ছি আমরা? সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ এরাও একদিন ৩৫ বছরের হবে, অপ্রত্যাশিত অফ-ফর্ম তাদের যে কারো চলে আসতে পারে, তখন তাদের সাথেও কি এমন হবে? এভাবে চললে কেউ সম্মানের সাথে অবসর নিতে পারবেনা কিন্তু।

যাইহোক, মূল কথা হচ্ছে- সমালোচনা করেন, বলতে পারেন এখনই মাশরাফির বিদায় নেয়া উচিৎ। একমত, এটাই সময় অবসর নেয়ার তার। কিন্তু লিমিট ক্রস করবেন না দয়া করে।

(৯)

শুরুতে বলেছিলাম, এটা রূপকথা না। হলে মুশফিক স্ট্যাম্পিং মিস করেন না, সাব্বির বা তামিম ক্যাচ ফেলেন না, তখন হয়তো বাংলাদেশ সেমি-ফাইনাল খেলতো আর এমন বাজে পারফর্ম করার পরেও মাশরাফি সেমি-ফাইনাল খেলতেন অধিনায়ক হিসেবে। বিদায়বেলায় আরেকটা অর্জন তাকে উপহার দিতে পারতো দল।

এটা রূপকথা না, তাই সম্মান যেটুকু পাওয়ার সেটুকু তো পেলেনই না বরং অসম্মানিত হতে হচ্ছে শেষবেলায়। অবশ্য তাতে মাশরাফির অবদান মিথ্যা হয়ে যাবেনা। কিঞ্চিৎ অবদান হয়তো তার আছে আর সেজন্যই খুব খুশি হবো যদি দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচ খেলে অবসর নেন তিনি।

এই ট্রেডিশনটা চালু করা উচিৎ- দেশের সেরা ক্রিকেটাররা যেন দেশের মাটিতে, গ্যালারি ভরা দর্শকের সামনে বিদায় নিতে পারে। মানুষ না হয় গ্যালারিতে বসে সরাসরি গালাগালি দিলো!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button