সিনেমা হলের গলি

ওয়াটার- ধর্মীয় গোঁড়ামির উপর চপেটাঘাত স্বরূপ যে সিনেমা

ইমরান

“তোমার স্বামী মারা গেছে, তুমি এখন থেকে বিধবা”- আট বছর বাচ্চা একটি মেয়ে চুইয়্যা, যাকে বলা হচ্ছে কথাগুলো, যে জানেও না বিয়ে মানে কী, তাকে বিধবা কেন বলা হচ্ছে। সাদা কাপড় পড়ানো হচ্ছে, দিয়ে আসা হচ্ছে বিধবা আশ্রমে। এসবই যেন তার খেলার কোনো অংশ, স্বামী বিয়োগের শোক তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করছেনা। একটু পরই খেলা শেষ হবে আর মা নিয়ে যাবে বাড়িতে, এই ঘোরের মাঝে যেন আটকে আছে মেয়েটি। বিধবা আশ্রম, এক অভিশপ্ত জীবনের শুরু হচ্ছে যেখানে, সেখানে আনা হয়েছে চুইয়্যাকে। যে আচ কর‍তে পারছে না এখানে প্রবেশের সাথে সাথে সে জীবনের সবকিছুকে বিসর্জন দিয়ে এমন এক জীবন শুরু করতে যাচ্ছে যেখানে স্বাভাবিক জীবনের কোনো ছোঁয়া নেই, হাজারো নিয়মে বাঁধা এক জালে আবদ্ধ হচ্ছে তার বাকি জীবনটুকু। ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে তার মা তাকে নিতে আসবে না, মানিয়ে নিতে হবে বাকিদের সাথে, কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর তার যেন এখনো অজানা, কেন সে এখানে থাকবে, কতদিন থাকবে, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই জীবনের মানেই বা কী?

সবচেয়ে প্রাচীন রোগগুলোর একটা হচ্ছে ধর্মীয় গোঁড়ামি। আর এই বিভিন্ন ধর্মীয় গোঁড়ামি ধীরে ধীরে রূপ নেয় নানান সংস্কার আর কুসংস্কারে। কোনো প্রকারের বিবেক বুদ্ধির প্রয়োগ ছাড়াই এসব কুসংস্কার পরিনত হয় অন্ধ বিশ্বাসে। বাপ-দাদা করে আসছে, আমাদেরও কর‍তে হবে- এটিই অন্যতম মূলমন্ত্র এই গোঁড়ামিকে আঁকড়ে ধরে রাখার। আর এই রোগে সংক্রমিত হয়ে আসছে যারা, তাদের নিয়ে পরিচালক দিপা মেহতার এই সিনেমা, যেখানে আট বছরের মেয়ে চুইয়্যার মাধ্যমে দেখিয়েছেন কীভাবে হিন্দুধর্মের অযৌক্তিক বিধিনিষেধ আর নিয়মকানুন হিন্দুধর্মাবলম্বী বিধবা নারীদের জীবিত লাশে পরিনত করেছে। গান্ধী ব্রিটিশদের হাত থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করতে পারলেও পারেননি একজন ভারতীয়র হাত থেকে আরেকজন ভারতীয়কে বাঁচাতে। যেখানে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করে গেছেন, সেখানে পদদলিত হয়েছে বিধবা।

১৯৩৮সাল। একদিকে মহাত্মা গান্ধী মাত্রই আফ্রিকা থেকে নিজ দেশে ফিরে এসে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ করছেন আর অন্যদিকে বিধবা আশ্রমের নামে কারাগারে বন্দি হচ্ছে আট বছরের বাচ্চা একটি মেয়ে চুইয়্যা। ভিক্ষাবৃত্তি আর পতিতাবৃত্তি ছিল একমাত্র অর্থোপার্জনের মাধ্যম। এই আশ্রমে তার আগে আরো বহু চুইয়্যার জীবনাবসান হয়েছে, কেউ আট বছর, কেউ বারো, কেউবা বিশ বছর বয়স থেকে এখানে বন্দি, যারা এখন জীবনের প্রায় অন্তিম মুহূর্তে। তারা চুইয়্যার মতন ভিক্ষাবৃত্তি দিয়ে আশ্রম জীবন শুরু করেছেন, আর ধীরে ধীরে হয়ে উঠে কল্যায়ানীর (লিসা রে) মতন পতিতা।

কল্যায়ানী হচ্ছে আশ্রমের অলংকার, আশ্রমের সবচেয়ে সুন্দরী বিধবা। সেও নয় বছর বয়সে এই আশ্রমে আসে, এখন তার বয়স পচিশ কি ছাব্বিশ হবে। আশ্রমের কঠোর নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে সম্পর্ক গড়ে উঠে নারায়ণের (জন আব্রাহাম) সাথে। একদিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজ, আর অন্যদিকে বিধবা কল্যায়ানীর অন্য কারো হয়ে উঠার গল্পের মাধ্যমে ফুটে উঠে তৎকালীন সময়ে বিধবাদের প্রতি সমাজ ব্যবস্থার ক্রুর আচরণ।

চুইয়্যা চরিত্রে অভিনয় করা শ্রীলঙ্কান মেয়েটির নাম সারলা। অভিনয় দেখে বোঝার কোনো সুযোগ নেই মেয়েটি এই প্রথম কোনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছে। সংলাপ বলার ধরণেও বোঝার কোনো উপায় নেই হিন্দি ভাষায় তার দক্ষতা হিমাঙ্কে। সিনেমার অন্যতম মূল চরিত্রে আরেক অভিনেত্রী লিসা রেও দেখিয়েছেন অভিনয়ে পারদর্শীতা, শুধু গায়ের রঙে ভিনদেশী মনে হলেও বিধবার বেশভূষায় নিজেকে উপস্থাপন কর‍ছেন একজন পরিপূর্ণ ভারতীয় হিসেবে। প্রথম দিকে একটু দৃষ্টিকটু মনে হলেও অভিনয় দিয়ে তা ছাপিয়ে গেছেন।

শুরু থেকেই এই সিনেমার বিতর্কের শেষ নেই, এই বিতর্কের কারণে অক্ষয় কুমার নারায়ণ চরিত্রটি ফিরিয়ে দেন যা পরবর্তীতে জন আব্রাহাম পান। ধুতি কুর্তায় এমন সাধাসিধে নারায়ণ চরিত্রে জন আব্রাহামকে ভালো মানিয়েছে, নারী কেন্দ্রিক সিনেমা হওয়ায় খুব বেশি স্ক্রিন টাইম পাননি, খুব বেশি কিছু করারও ছিল না এই সিনেমাতে। আলাদাভাবে অভিনয়ে নজর কেড়েছেন গুরুভির যাদব, নপুসংক চরিত্রে দারুন অভিনয় করেছেন।

দিপা মেহতার “এলিমেন্টস ট্রিলজীর” এটি ছিল শেষ সিনেমা। শেষ সিনেমা হলেও এই সিনেমা নির্মাণের পথ মোটেও সহজ ছিল না। ফায়ারের মতন বিতর্কিত সিনেমার পর আবারো এমন একটি বিষয়কে বেছে নিয়েছেন সিনেমার জন্য যেটি নিজ দেশে নির্মাণে ব্যর্থ হয়ে পাড়ি জমান শ্রীলঙ্কায়। বেনারসে সিনেমার শুটিং শুরু হলেও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে কিছু ধর্মান্ধ বিক্ষোভকারীদের জন্য তা বন্ধ করতে হয়। কাজ বন্ধ হওয়ার প্রায় চার বছর পর আবার সিনেমার শুটিং শুরু করেন শ্রীলঙ্কায়। সেখানে ভিন্ন নাম দিয়ে পুরো সিনেমা শেষ করেন। দিপা মেহতা তার নির্মাণশৈলী দিয়েই শ্রীলংকাকে দেখিয়েছেন এক টুকরো বেনারস হিসেবে।

সিনেমাটি শেষ করে মনে হয়েছে- আসলেই কোনো মানে কি আছে এমন সব রীতিনীতির যার কোনো ভিত্তি নেই? কোনো যৌক্তিক কারণ নেই স্বামী মারা যাওয়ার পর কোনো নারীর বিধবা হয়ে এমন অসামাজিক জীবনযাপনের। কেন তাদের একঘরে থাকা লাগবে, কেন বিধবা স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে না, কেন একবেলা খেয়ে থাকা লাগবে, স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে হয় স্বামীর সাথে একই চিতায় জ্বলতে হবে, নতুবা স্বামীর আপন ভাই যদি থাকে শুধু তাকে বিয়ে করা যাবে, যদি ভাই না থাকে তাহলে বিধবা আশ্রম। এ কেমন গোঁড়ামি?

বিনাদোষে আজীবন কারাবাস করার গল্পের সাথে উঠে এসেছে কেমন হতে পারতো একজন বিধবার বাকি জীবন, যদি না এত নির্মম হতো তাদের স্বামীর মৃত্যুর পরবর্তী জীবনটুকু। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে একজন হিন্দু নারীর বাকি শখ আহ্লাদেরও মৃত্যু হয়ে যায় না, এটিই ছিলো দিপা মেহতার ওয়াটার সিনেমা গল্প।

বিশেষ দ্রষ্টব্য- অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যুকে ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে ছোট্ট একটি ভুল দিপা মেহতা করছেন, সিনেমার একটি ডায়ালগে বলা হয় রাজা রামমোহন রায় বিধবাদের বহু বিবাহের আইন প্রনয়ণ করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল। রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদ করেন, বিধবাদের জন্য বহু বিবাহের আইন প্রনয়ণ করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

কৃতজ্ঞতা- ‘জাস্ট বলিউড’ ফেসবুক গ্রুপ

Facebook Comments

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button