অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

মুদি দোকানের চাকরি থেকে বিজনেস ম্যাগনেট- ওয়ারেন বাফেটের অবিশ্বাস্য গল্প

ওয়ারেন বাফেট তার জীবনের সমস্ত উপার্জনের ৮৫ ভাগই চ্যারিটিতে দান করে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০০৬ সালেই। কেন ছেলেমেয়েদের না দিয়ে চ্যারিটিতে দিচ্ছেন এ ব্যাপারে তার যুক্তি কি জানেন?

তার কথা হলো, ‘আমার উত্তরাধিকারীরা কেন শুধু সমাজকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে শুধুমাত্র তারা আমার সন্তান বলে? এটা কি অবিচার না সমাজের প্রতি?

ভাবতে পারেন তার চিন্তার লেভেল!

সুন্দর ব্যাপার হলো, ওয়ারেন বাফেটের সন্তানও তার সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন করেন। তার ছেলে সুসান বাফেট বলেন, ‘সত্যি কথা হলো আমাদেরকে এতো অর্থের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া পাগলামিই হতো’। বাফেট তার আদর্শ যে সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন এর চেয়ে বড় সাফল্য কি হতে পারে একজন বাবার জন্য!

তিনি নিজে বেশ কষ্ট করে আজকের ওয়ারেন বাফেট হয়েছেন। কি করেননি জীবনের শুরুর বছরগুলোতে? একদম ছোট বেলায় যখন তিনি তার দাদার মুদি দোকানে কাজ করতেন। হয়ত তিনি তখন থেকেই ব্যবসায়ের প্রতি গভীর তাগিদ বোধ করতে শুরু করেন। অর্থ উপার্জনের যে সু্যোগটাই তিনি চোখের সামনে পেয়েছিলেন সেটাই লুফে নিয়েছেন। কোকের বোতল রিসাইকেলের জন্য জমা নিয়ে রিফান্ডের অর্থ নিতেন। লেবুর শরবত বিক্রি করতেন, নিউজপেপার বিলি করে বেড়াতেন। এমনকি গাড়ি ওয়াশের কাজও বাদ দেননি।

পরিসংখ্যান ছিল তার প্রিয় বিষয়। হাইস্কুলের বন্ধুরাও খেয়াল করেছে ব্যাপারটা। হাইস্কুলের বন্ধুরা বার্ষিক ম্যাগাজিনে তার ছবির ক্যাপশনে লিখেছিল, ‘গণিত ভালবাসে, ভবিষ্যতের স্টকব্রোকার’।

বাফেট তার জীবনে যখন প্রথমবারের শেয়ার কিনেন তখন তার বয়স এগারো। ৩৮ ডলারের তিনটি শেয়ার কিনার পর যখন দাম নেমে গেল ২৭ ডলারে তখন তিনি কিছুটা হতাশ হলেও দাম আবার বেড়ে ৪০ ডলারে উঠতেই শেয়ারগুলো বিক্রি করে দেন। যদিও আর কিছুদিন অপেক্ষা করলে শেয়ারগুলো ২০০ ডলারে বিক্রি করতে পারতেন। এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি বিনিয়োগের একটা ব্যাপার বুঝতে পারেন, কোনো কিছু ক্রয়ের পর ধরে রাখলে আরো বেশি ফল পাওয়া যায়৷

সময়ের চেয়ে তিনি আসলেই বেশ এগিয়ে থেকে শুরু করেছেন বলে ভুল থেকে আগেভাগেই শিক্ষা নিতে পেরেছেন। একটুও সময় নষ্ট না করে তিনি বিনিয়োগ করতে থাকেন সম্ভাব্য সকল জায়গায়৷ তেরো বছর বয়সেই তিনি প্রথমবারের মতো নিজের উপার্জনের আয়কর রিটার্ন জমা দেন, সেখানে তার পরিচয় দিয়েছিলেন সংবাদপত্র বিতরক হিসেবে।

যখন বয়স ১৫ তখন তিনি পুরানো একটি পিনবল মেশিন কিনেন ২৫ ডলার দিয়ে। ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে তার বন্ধু ড্যানলি তার সাথে ছিল। এই মেশিন রাখার জায়গা ছিল না তার। এক নাপিতের দোকানের একটুখানি খালি জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করলেন। নাপিতও রাখতে রাজি হয়েছিলেন কারণ এটি দোকানের কাস্টমারদের আকর্ষণ করছিল। অল্প দিনে এই ব্যবসায় থেকে মুনাফা আসতে শুরু করল। বাফেট টাকাগুলো নষ্ট না করে আবার বিনিয়োগ করলেন নতুন মেশিনের পেছনে। আরো কয়েকটি মেশিন কিনে শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করেন ওগুলো।

টিনএজ বয়সেই তিনি এতো অর্থ উপার্জন করলেন যে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ পেনসেলভেনিয়াতে ভর্তির প্রস্তাব মেনে নেয়ার মতো কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না। কারণ, তিনি মাসে যা উপার্জন করতেন তখন সেটা তার শিক্ষকের উপার্জনের চাইতেও বেশি ছিল! যদিও বাবার ইচ্ছেকে সম্মান দেখিয়ে পরে কলেজে ঠিকই ভর্তি হয়েছিলেন।

সেসময় কলম্বিয়ার বিজন্যাস স্কুলে ছিলেন স্বনামধন্য এক অধ্যাপক বেঞ্জামিন গ্রাহাম। তিনি ছিলেন তখনকার সময়কার বিনিয়োগের গুরু। তার লেখা বই ‘দ্যা ইন্টিলিজেন্ট ইনভেস্টর’ পুরোটা মুখস্থ করে ফেলেছিলেন বাফেট শুধু অধ্যাপককে মুগ্ধ করে তার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। বাফেটের পরবর্তী জীবনেও এই বইটির গুরুত্ব অনেক। তার মতে এটি ছিল তার জন্যে জীবন বদলে দেয়া বই।

বাফেট গ্রাহামের সাথে কাজ করতে চেয়েছিলেন। এমনকি তিনি গ্রাহামের ক্লাসের একমাত্র এ+ পাওয়া ছাত্র হওয়া স্বত্তেও গ্রাহাম তাকে তার ফার্মে রিক্রুইট করতে চায়নি। বই পড়ার যে অভ্যাস দিয়ে তিনি তখনকার বিনিয়োগ গুরুকে মুগ্ধ করেছিলেন এখন সেই অভ্যাসই তাকে আজকের বিশ্বের বিনিয়োগ গুরু হবার পথে সবচাইতে বেশি সাহায্য করেছে। তার বিস্ময়কর এক অভ্যাস আছে। তিনি প্রতিদিন ৫০০ পাতা বই পড়েন!

তার কাছে বই পড়া হলো একটা ‘কম্পাউন্ড ইন্টেরেস্ট’। যারা কম্পাউন্ড ইন্টেরেস্ট থিউরি সম্পর্কে জানেন তারা ব্যাপারটা সহজে ধরতে পারবেন। ব্যাপার হলো, আপনার কাছে বই পড়া আপাতদৃষ্টিতে কোনো কাজের মনে না হতে পারে কিন্তু আপনি যদি রোজ অভ্যাস মেনে বই পড়েন এটাই আপনাকে আপনার কাজের জায়গায় সেরা হতে সাহায্য করবে। আপনি অন্য দশজনের চেয়ে আলাদা জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন, কারণ আপনার নিজস্ব চিন্তাবোধ আপনাকে অন্য দশজনের চেয়ে বেশি গভীর দৃষ্টিতে জীবনকে দেখতে শেখাবে।

বাফেট বলেন, ‘আমি পড়ি এবং চিন্তা করি। আমি এত বেশি পড়ি এবং চিন্তা করি কারণ এটা আমাকে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত কম নেয়ার জন্য সাহায্য করে যেটা বেশিরভাগ বিজন্যাসম্যান নিয়ে থাকেন। আমি এটা করি, কারণ আমি এই জীবনটাকেই ভালবাসি।’

বাফেটের জীবনের এই অভ্যাস রাতারাতি তাকে শীর্ষ ধনী বানিয়ে দেয়নি। ‘কম্পাউন্ড ইন্টেরেস্ট’ কিভাবে কাজ করে তার একটা উদাহরণ হতে পারে ওয়ারেন বাফেটের জীবন। তার যাবতীয় সম্পদের ৯৯ ভাগই তিনি অর্জন করতে শুরু করেন পঞ্চাশ বছর বয়সের পর থেকে। এর আগে তিনি অর্থ উপার্জন করেছেন, বিনিয়োগ করেছেন, বই পড়েছেন সবই করেছেন। কিন্তু তার একাগ্রতাই তাকে বহুগুণ সম্পদ এনে দিয়েছে। যদি তিনি লেগে না থাকতেন তাহলে এগুলো কিছুই পাওয়া হতো না হয়তো।

বাফেট তার জীবনের সেরা বিনিয়োগগুলোর পেছনে বই পড়ার অভ্যাসকে মূল অনুঘটক বলে মনে করেন। এ কারণেই তিনি তার দিনের ৮০ ভাগ সময় ব্যয় করেন বই পড়ার পেছনে।

এ কারণেই বয়স বাড়লেও বাফেট যেন প্রতিদিনই আরো স্মার্ট হচ্ছেন! ৮৮ বছরের জীবনের অপরাজিত ইনিংসে তিনি নিজের অবস্থানকেও যেন নিয়ে গেছেন হিমালয় চূড়ায়। বিনিয়োগের ব্যাপারে তিনি হয়ে গেছেন অপরাজেয় এক গুরু!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button