সিনেমা হলের গলি

ওয়ার: আড়াই ঘন্টার পয়সা উসুল বিনোদন!

সিক্রেট সার্ভিসের সিনিয়র এজেন্ট কবীরকে হন্যে হয়ে খুঁজছে ‘র’ (রিসার্চ এন্ড অ্যানালিসিস উইং), শত্রুকে মারার পরিবর্তে কবির খুন করেছে নিজের দলের লোককেই, ঘোষণা করেছে বিদ্রোহের। ওপর মহল থেকে জারী করা হয়েছে তার মৃত্যু পরোয়ানা, আর সেই কাজের দায়িত্ব দেয়া হলো কবিরেরই হাতে গড়া এক এজেন্ট খালিদকে। খালিদ কি পারবে কবীরের কাছে পৌঁছুতে? নিজের গুরুকে মারতে? কেন কবীর দেশের সঙ্গে, বাহিনীর সঙ্গে এমনটা করলো- সেই প্রশ্নের উত্তরটাও জানতে হবে খালিদকে, সেই উত্তরটা কি হতে পারে?

এমনই একটা প্লটের ওপর এগিয়েছে সদ্যমুক্তিপ্রাপ্ত বলিউডি সিনেমা ‘ওয়ার’ এর গল্পটা। অনেকদিন পরে মুম্বাইয়ের বানানো কোন অ্যাকশন ফিল্ম দেখে মনে হলো, ‘নাহ, কিছু একটা দেখলাম!’ ঋত্বিক রোশান অ্যাকশন হিরোর অবতারে ফিরলেন অনেকদিন বাদে, পর্দায় তার সঙ্গে টক্কর দিলেন টাইগার শ্রফ- আর সেই ইঁদুর-বিড়াল দৌড়টা প্রায় পুরো সঅময় জুড়েই ভীষণ উপভোগ্য হয়ে রইলো। আড়াই ঘন্টা সময় খরচ করে সিনেমা দেখার পরে অন্তত ‘সময়টা জলে গেছে’ ভেবে আফসোস করতে হচ্ছে না, এটাই বড় পাওয়া।

ওয়ারের গল্পটা লিখেছেন পরিচালক সিদ্ধার্থ আনন্দ এবং প্রযোজক অদিত্য চোপড়া মিলে। গল্প নিয়ে খুব বেশিকিছু বলার নেই, স্পয়লার হয়ে যেতে পারে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থ্রিল ধরে রাখার একটা চেষ্টা ছিল পরিচালকের মধ্যে, বারবার টুইস্ট আনার চেষ্টা করেছেন, তবে প্রায় সবগুলোই প্রেডিক্টেবল ছিল। এমন নয় যে বিশাল কোন চমক দেখাতে পেরেছেন। তবে ধুন্ধুমার অ্যাকশনের মাঝেও একটা গল্প বলার চেষ্টা ছিল, স্টারডমকে ব্যবহার করে সিনেমার প্লটকে মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়নি- এটা দেখেই ভালো লেগেছে।

মেজর কবীর চরিত্রে ঋত্বিক ছিলেন দুর্দান্ত, তাকে সুপারহিরো বানানোর কোন চেষ্টা করা হয়নি, সিনিয়র একজন এজেন্ট হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি গুলি খেয়ে জ্ঞান হারান, ভিলেনের পিটুনি হজম করেন। সুপার থার্টি মুক্তি পেয়েছে ক’দিন আগেই, সেখানে ঋত্বিক মুগ্ধ করেছিলেন তার অভিনয় দিয়ে। স্বল্পদিনের ব্যবধানে একদম বিপরীত এক অবতারে এসেও মন জয় করলেন। তাকে দেখে বারবার মনে হচ্ছিলো, হলিউডি কোন নায়কের সিনেমা দেখছি না তো?

আর টাইগার শ্রফ সম্ভবত তার ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয়টা করেছেন এই সিনেমায়। তার অভিনয় নিয়ে সমালোচনার অনেক জায়গা ছিল, রোবটিক এক্সপ্রেশন থেকে এখনও পুরোপুরি বের হতে পারেননি। কিন্ত ভালো আর মন্দ, কাছাকাছি সময়ে দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন টাইগার, ঋত্বিকের মতো দুর্দান্ত অভিনেতার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে ফিকে হয়ে যেতে দেননি তিনি।

নায়িকার চরিত্রে বানী কাপুর শো-পিসের বেশিকিছু নন। একটা গান ছাড়া মোটে চার-পাঁচ মিনিট ছিলেন পর্দায়। ওয়ার- এর বিশেষত্ব এটাই, পুরোপুরি অ্যাকশনধর্মী সিনেমাতেই থেকেছে এটা, জোর করে রোমান্স বা ইমোশন জড়ো করার চেষ্টা করা হয়নি এখানে। কাজেই নায়িকার চেয়ে অনেক বেশি স্ক্রিনটাইম পেয়েছেন ঋত্বিক-টাইগারের সহকর্মীর চরিত্রে অভিনয় করা অনুপ্রিয়া গোয়েঙ্কা। তার চরিত্রের গভীরতাও অনেক বেশি ছিল। আশুতোষ রানাও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ এক চরিত্রে, তবে এধরণের সিনেমায় ‘বস টাইপের’ রোলগুলোতে করার মতো খুব বেশিকিছু থাকে না আসলে।

সিনেমার অ্যাকশন-স্ট্যান্ট দুর্দান্ত। হলিউডি লেভেল বললে হয়তো বোঝানো যাবে। অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো খুব যত্নের সঙ্গে করা হয়েছে, দুই নায়কও নিজেদের উজাড় করে দিয়ে খেটেছেন, সেটার ফলই পর্দায় দেখা গেছে। বলিউডি অ্যাকশন সিনেমায় ‘ওয়ার’ একটা নতুন স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়েছে, এটা বললে খুব একটা ভুল হবে না বোধহয়। মোটরসাইকেল থেকে রেসিং কার বা যুদ্ধবিমান, পাহাড়-সাগর অথবা বরফে ঢাকা উপত্যকা থেকে জনবহুল শহরের পথঘাট- ওয়ারের অ্যাকশন রাডার থেকে বাদ যায়নি কিছুই!

আরেকটা জিনিসের কথা না বললে অপূর্ণতা থেকে যাবে। চিত্রনাট্যে পুরোটা সময় জুড়ে টাইগার শ্রফকে ঋত্বিকে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, কখনও আবার গল্পের খাতিরে ঋত্বিকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন তিনি। জুনিয়র একজন অভিনেতার জন্যে এটা বড়সড় একটা প্রাপ্তি। সিদ্ধার্থ আনন্দ ওয়ার’কে ঋত্বিকের সিনেমা বানাতে চাননি, তিনি প্যারালাল রোলে রেখেছেন দুটো চরিত্রকেই। খালিদকে তিনি ঢাকা পড়তে দেননি কবীর নামের মহীরূহের ছায়ায়। এই ব্যাপারটা প্রশংসা করার মতো।

ওয়ারের কি সবকিছুই ভালো? মন্দ কিছুই কি নেই? তা আবার হয় নাকি? এই সিনেমায় হুটহাট যেভাবে গান ঢুকে গেছে, সেটাই তো ভীষণ দৃষ্টিকটু! গানের এমন বিচ্ছিরি প্লেসমেন্ট খুব কম বলিউডি সিনেমাতেই হয়েছে। টাইগার আর ঋত্বিকের মতো দক্ষ দুই নাচিয়ে আছে সিনেমায়, তাই গল্পের পরোয়া না করে ঢোকাও আইটেম নাম্বার! জয় জয় শিবশঙ্কর শিরোনামের গানটা সিনেমায় না থাকলে এমন কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না। কমার্শিয়াল সিনেমার বিচারে হয়তো সেটা জাস্টিফাই করা যাবে, তবে দর্শক হিসেবে এমন কিছু দেখাটা আনন্দদায়ক অনুভূতি নয় মোটেও।

পার্শ্বচরিত্রগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়নি, কয়েকজনের অভিনয়ও ছিল জঘন্যের কাছাকাছি। আইএস নেতা চরিত্রে শুরুর অ্যাকশন সিকোয়েন্সে জেসন মোমোয়ার মতো দেখতে যে ভিলেনটা হাহা করে অট্টহাসি দিলো, এমন কাঁচা অভিনয় বোধহয় আলিফ লায়লার কমেডিয়ান জিনগুলোও করে না। সিনেমাজুড়ে দুই নায়ক কয়েকদফা এন্ট্রি নিয়েছেন, একটা সময় তো স্লো-মোশনের এন্ট্রি সিনগুলোর ওপরেই বিরক্তি চলে আসছিল। যদিও সিঙ্গেল স্ক্রিনের দর্শকেরা এসব দৃশ্য লুফে নেবে, সবচেয়ে বেশি তালি আর শীষও বাজবে এই সীনগুলোতেই।

মোদ্দাকথা, ভরপুর অ্যাকশন আর মোটামুটি একটা গল্পের ওপরে দাঁড়ানো ‘ওয়ার’ একটা পরিপূর্ণ এন্টারটেইনমেন্ট প্যাকেজ। গল্পে প্লটহোল আছে বেশকিছু, কমার্শিয়াল অ্যাসপেক্টে সেসব হয়তো সাধারণ দর্শকেরা ওভারলুক করে যাবেন, অনেকের নজরেও পড়বে না। আড়াই ঘন্টার বিনোদন চাইলে ওয়ার আপনার জন্যে পারফেক্ট প্যাকেজ। সিনেমাটা ইতিমধ্যেই হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে মুক্তির প্রথম দিনে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড গড়েছে, দুইদিনে ওয়ারের ঘরে জমা পড়েছে ৭৫ কোটি রূপি। কন্টেন্ট অ্যাভারেজ, রিভিউ বেশিরভাগই মিক্সড টু পজিটিভ, ঋত্বিক-টাইগারের রূপালী পর্দার এই যুদ্ধ যে বক্স অফিসে তাণ্ডবনৃত্য চালাতে যাচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহই নেই।

আরও পড়ুন- ডিয়ার বক্স অফিস, গেট রেডি ফর দ্য টাইফুন!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button