খেলা ও ধুলা

টেকনিক্যালি বেটার ভূটান ও আমাদের মানসিকতা!

*প্রশ্নঃ ফেভারিট কারা?
টিটুঃ ভাইরে ভূটান আমাদের চেয়ে টেকনিক্যালি বেটার আর এ তো ভারত!
* প্রশ্নঃ ম্যাচে কৌশল কি হবে?
টিটুঃ সে কি! শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫ জনের ডিফেন্স খেলিয়েও পোষাতে পারি না। লঙ্কায় ০-৩ এ হেরেছিলাম আর তার বছর পাঁচেক পর দেশে ১-১ ড্র। পারলে তো ৬ জনের ডিফেন্স লাইন দাঁড় করাই কিন্তু কোথাও এর উল্লেখ আর প্রয়োগ খুঁজে পেলাম কই!

উপরিউক্ত সাক্ষাত্‍কারটি কাল্পনিক। তবে কাল্পনিক হলেও এবং বলার ধরণে শ্লেষ থাকলেও তথ্যগুলো একদম সঠিক (৬ জনের ডিফেন্স লাইন কথাটা বাদে)। এতে প্রশ্ন করা হচ্ছিল চট্টগ্রাম আবাহনীর বর্তমান কোচ সাইফুল বারী টিটু কে। যিনি কিনা অসুস্থকর ডিফেন্সিভ কৌশলের জন্য পরিচিত অনেকের কাছে। ডিফেন্সিভ ফুটবল মানেই নেতিবাচক ফুটবল নয় কিন্তু নেতিবাচক ফুটবল মানেই ডিফেন্সিভ ফুটবলের অবধারিত উপস্থিতি। কে কে ভাবছেন যে টিটু থাকলে আজ অনুর্ধ্ব-১৮ সাফ চ্যাম্পিয়নসিপে ভারতের বিপক্ষে ০-৩ এ পিছিয়ে ৪-৩ স্কোরলাইনে জিতে বেরিয়ে আসা যেতো? প্রথমত টিটু থাকলে ৩ গোল তো খেতামই না! প্রথমার্ধের শুরুতেই গোল খেয়ে আলট্রাডিফেন্সিভ হয়ে ওই স্কোরলাইনেই ম্যাচ হেরে সবাই ভাবতাম, ‘সালা এবার রানার আপ ট্রফিটা নিব মাইরি!’। তা ট্রফি গুরুত্বপূর্ণ। এবারে চ্যাম্পিয়ন হতে পারবো কি না তা সময়ই বলবে। তবে এই যে কোচ মাহবুবুর রহমান রক্সির অধীনে ফুটবলাররা হারবার আগে না হারার মানসিকতার শিক্ষাটা সর্বোপরী এক প্রাণশক্তি পেল, তা দেশের ফুটবলকে আজ একটি টার্নিং পয়েন্টে নিয়ে গেছে।

এই মানসিক শক্তির এক ভীষণ তাত্‍পর্য আছে দেশের ফুটবলে। বেশি আগের কথা বলতে পারবো না তবে ২০০১ সাল থেকে যে দেশের ফুটবল অনুসরণ করে আসছি তাতে একটা বিষয় খুব ভালো করে খেয়াল করেছি। আর তা হলো ফুটবলাররা যখন মাঠের ফর্ম আর সাথে মানসিকতায় শক্তিশালী থাকে তখন প্রত্যাশিত জয়ের পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত ড্র বা হারও দেখতে হয় কিন্তু যখন মাঠের ফর্ম ভালো কিংবা খারাপ যাই হোক, মানসিক শক্তির জায়গাটাতে ঘাটতি থাকে তখন হারের চেয়ে বেশি কিছু ঘটে না। ড্র কিংবা জয় এক্ষেত্রে বিরল। বাংলাদেশের খেলাধূলার প্রেক্ষাপটে আমরা প্রায়ই ‘মাঠে নামার আগেই হেরে যাই’ কথাটা ব্যবহার করি যা বাংলাদেশের ফুটবলে আক্ষরিক অর্থে খাটে। এমন কি ক্রিকেটে মাশরাফি কে আমরা এই ব্যাপারে গুরুত্ব দিয়ে মন্তব্য করতে শুনি। গত চ্যাম্পিয়নস্ ট্রফির আগে দলের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট কে ৭/৮ করে নাম্বার দিলেও মানসিকতায় মাত্র ৫/৬ দিয়েছিলেন তামিম। সাম্প্রতিক সময়ে উড়তে থাকা ক্রিকেটেই এই অবস্থা। সেখানে বাকি ক্রীড়াগুলো? বাংলাদেশের খেলাধূলা এই এক ভীতিজনিত ও আত্মবিশ্বাসহীন সংস্কৃতিতে আজও আচ্ছন্ন।

মুহূর্ত এখন রক্সির দলের সাথে

আন্তর্জাতিক ম্যাচে একাধিক গোলে পিছিয়ে নাটকীয়ভাবে সমতা আনবার ঘটনা বাংলাদেশের ফুটবলে বিরল। আর জয়ের ঘটনা তো একদমই নেই। কোচ রক্সি তো ম্যাচের পর বলেই ফেললেন, ‘আমার জীবদ্দশায় কোন দিন দেখিনি একাধিক গোলে পিছিয়ে থেকেও গোল করে জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে বাংলাদেশের ছেলেরা।’। ৩ গোলে পিছিয়ে পড়ে উল্টো ৪ গোল করে ফিরে আসা বা ম্যাচ জয় তো বিশ্ব ফুটবলেই অভূতপূর্ব এক ব্যাপার। এটা যে কাউকেই নাড়া দেবে। ২০০৫ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস্ লীগের ফাইনালে এসি মিলানের বিপক্ষে তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে লিভারপুলের ফিরে আসা কিংবা ২০১১ সালে ইপিএল এ আর্সেনালের বিপক্ষে চার গোলে পিছিয়ে গিয়েও চার গোল শোধ দেয়া নিউক্যাসেল! ২০১০ আফ্রিকান কাপ অফ নেশনস্ এ স্বাগতিক এঙ্গোলা’র বিপক্ষে ৭৪তম মিনিটে ০-৪ এ পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা ড্র করে স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় অর্ধলক্ষ সমর্থকদের পাথর বানিয়ে দিয়েছিল মালি! একই কাজ করে ইব্রাহিমোভিচের সুইডেন তাও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে জার্মানদের মাটিতে! ম্যাচ শেষ হবার ২৮ মিনিট আগেও চার গোলে পিছিয়ে ছিল সুইডিশরা! বছর কয়েক আগে লীগ কাপে ৪ গোলে পিছিয়ে পড়েও রিডিং কে ৭-৫ এ হারিয়ে দেয় আর্সেনাল। রেকর্ড বুক ঘাটলে অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। তবে নিকট অতীতে এই ম্যাচগুলোর কথাই মনে পড়ে।

সব পর্যায়ের ফুটবলেই দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও সমতা আনবার ঘটনা চার বার দেখা গেছে বাংলাদেশের ফুটবলে- ১৯৮০ এশিয়া কাপে উত্তর কোরিয়া, ২০০৩ সালের এশিয়া কাপ বাছাইতে স্বাগতিক হংকং, ২০০৮ সাফ চ্যাম্পিয়নসিপে আফগানিস্তান ও ২০১৫ বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে মালয়েশিয়া অ-২২ খ দলের বিপক্ষে। সব গুলোর কৃতিত্ব সিনিয়র জাতীয় দলের। এর ভেতর প্রথম ও চতুর্থ ম্যাচের ইনজুরি টাইমে গোল হজম করে হারতে হয় আমাদের।

তো অ-১৮ পর্যায়ে এর মাহাত্ম কি? মাহাত্ম তো এই যে প্রতিপক্ষ ছিল গ্রাসরুট ফুটবলে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী দেশ ভারত। মাহাত্ম তো এই যে এই অনভিজ্ঞ পর্যায়ে এভাবে ফিরে এসে ম্যাচ জেতার বিরল ঘটনা। মাহাত্ম তো এই যে ওরা বাংলাদেশি ফুটবলার হিসেবে অসাধ্য সাধন করেছে। মাহাত্ম তো এই যে এই একটি মাত্র ম্যাচ আমাদের ভবিষ্যত্‍ ফুটবলের টার্নি পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াতে পারে। মাহাত্ম তো এই যে চিরকালীন হারার আগেই হেরে যাবার মানসিকতা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে আসা। মাহাত্ম তো এই যে কোন কিছুই অসম্ভব নয় প্রাণশক্তিতে উজ্জ্বীবিত হয়ে ওঠা।

এবং অ-১৮ হলেও তা এশিয়াতে যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। ভারতীয়রা যথেষ্ট মুষড়ে গেছে। ফেসবুকের এশিয়ান ফুটবল গ্রুপগুলোতে চোখ বোলালেই অন্যান্য দেশের লোকদের প্রতিক্রিয়া চোখে পড়বে। এক জাপানিজ তরুণী তো ‘কিং অফ কামব্যাক’ লিখে পোস্ট করলো।

মুখ ফসকে দুর্বল মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়েই ফেললেন! ফটো ক্রেডিটঃ গোলনেপাল

টিটুর কথা বলছিলাম। দুঃখিত যে এভাবে কটাক্ষ করতে হলো উনাকে। বিস্তারিত বলবার সুযোগ নেই এখন কিন্তু সাইফুল বারী টিটু একজন দারুণ ফুটবল কোচ। এএফসি’র কোচিং ইন্সট্রাক্টর হিসেবেও কাজ করেছেন। এই যে জাফর সাফ মাতাচ্ছে, তাকে টিটুই আবিষ্কার করে তৃতীয় ডিভিসন থেকে সোজা প্রিমিয়ারে নিজ দল আরামবাগে ভিড়িয়েছিলেন গত মৌসুমে। ঘরোয়া ফুটবলে গত এক যুগে অবশ্য গুটিকয়েকবার কাপ টুর্নামেন্ট জয় ছাড়া লীগ শিরোপা নেই নামের পাশে। এবার অবশ্য চট্টগ্রাম আবাহনী তে সেই ঘাটতি পূরণ হতে পারে। তবে কথা হচ্ছে তার নেতিবাচক মানসিকতার ফুটবল কৌশল নিয়ে। বছর দুই আগে ‘ভূটান আমাদের চেয়ে টেকনিক্যালি বেটার’ বলে যিনি বিতর্কের জন্ম দেন। এই কথা বলবার পর দিন সাফের ম্যাচটিতে ভূটান কে ২-০ তে হারাতে সক্ষম হলেও এর মাস দেড়েকের ভেতর অ-১৯ এশিয়া কাপ বাছাইতে দেশের মাটিতে ভূটানের বিপক্ষে ১-১ ড্র করি আমরা। অথচ ভূটান এই দুই ম্যাচ ছাড়া খেলা বাকি তিন ম্যাচে এক ডজন গোল হজম করে। শ্রীলঙ্কার মত ছন্নছাড়া দলের বিপক্ষেও হারে ২-০ তে।

অনেকেই বলতে পারেন যে এটা হয়তো টিটুর একটি কৌশল ফুটবলারদের তাতিয়ে তোলার। তো এটা ভূটানের বিপক্ষে কেন করতে হলো? আর অন্য দল কি ছিল না? আর ‘টেকনিক্যালি বেটার’ এ কেমন কথা? এমনিতে ‘ভূটানীরা টেকনিক্যালি বেশ ভালো খেলে’ কি বলা যেত না? আমার মোটেও মনে হয়নি ভূটানিরা টেকনিক্যালি বেটার ছিল। অন্তত ইব্রাহিমের চেয়ে তো নয়ই। আমার ধারণা ভুল হলেও এই কথা কি ড্রেসিংরুমের জন্য চেপে রাখতে পারতেন না টিটু? এর ফলে একটি বিশাল ক্ষতি হয় বাংলাদেশ ফুটবলের। ২০০২ সালের পর অ-১৯ এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার সুযোগ হাতছাড়া হয় এবং এর চেয়ে সহজ সুযোগ আর হতে পারে না। ২০১৩ সালের বাছাইপর্বে ক্রুইফের ১০ জনের বাংলাদেশ ১-০ তে কুয়েত কে হারানোতে পরের আসরের বাছাইতে এই সহজ গ্রুপটি পাই আমরা। গ্রুপে উজবেকিস্তান ছাড়া বাকি দুই দল ছিল শ্রীলঙ্কা ও ভূটান। খেলা দেশের মাটিতে। ইব্রাহিম-মান্নাফ-রোহিতদের নিয়ে গঠিত আক্রমণভাগ যে কোন সাফ দলের জন্য ঈর্ষার কারণ। মান্নাফ আর ইব্রাহিম প্রিমিয়ার লীগে আগুনে ফর্মে ছিল। মাঝমাঠে ছিল মাশুকের মতো খেলোয়াড়। সাদ’কেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল। ভূটানকে এক গোলে হারিয়ে উজবেকদের কাছে দুই গোলে হারলেও সেরা পাঁচ গ্রুপ রানার আপের একটি হয়ে মূল পর্বে উঠে যেতাম আমরা। দেশের মাটিতে এটা বেশি চাওয়া ছিল? দুই বছর আগে যে কুয়েতকে হারালাম আমরা আর তারপর ভূটানের চেয়ে টেকনিক্যালি গরীব হয়ে গেলাম? কলঙ্কজনক!

এর চেয়েও বড় ক্ষতিটা হল সিনিয়র দলের। বছরখানেক পর এশিয়া কাপ প্রাকবাছাইয়ে দেশের মাটিতে ভূটানের বিপক্ষে নামবার আগে ওই ১-১ এ ড্র করা ম্যাচটার কথা বারবার ফিরে আসছিল।

এসব হারু মানসিকতা একদম সহ্য করতে পারি না আমি।

মাত্র গুটিকয়েকদিনের অনুশীলন শেষে খেলতে গিয়ে ভারতের বিপক্ষে পাঁচ জনের ডিফেন্স নিয়ে খেললেও রক্সি কে কেউ কিছু বলতো না। দলে জেনুইন স্ট্রাইকারও নেই। এর ভেতরও প্রথমার্ধে ভালো খেলেছিল বাংলাদেল ওই গোল তিনটি হজম করা ছাড়া। স্কোরলাইন একচেটিয়া দেখালেও ভারত একচেটিয়া খেলেনি। দুই গোলে এগিয়ে যাবার পর একটি গোল লাইন ক্লিয়ারেন্স করতে হয়েছিল ভারত কে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের বোঝাপড়ার অভাবের সুযোগ নিয়েছিল মাস দুয়েক আগে সিঙ্গাপুর কে ৭-২ তে উড়িয়ে দেয়া ভারত। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও তাদের একটি শট বারে লাগে। এখন রক্সি যদি নিজের মান-সম্মান হারাবার ভয়ে প্রকৃতপক্ষেই সমন্বয়হীন দলটিকে তখন ডিফেন্সিভ খেলিয়ে গোল বাঁচিয়ে কাউন্টারে কোনরকম একটি গোল করবার চিন্তা করতেন তাহলে আজ এই অভূতপূর্ব উপলক্ষ্যটা আসতো না বাংলাদেশ ফুটবলে। জাফরদের আক্রমণাত্মক ফুটবল ফুল হয়ে ফুটতো না ভূটানের চাঙলিমিথাং স্টেডিয়ামে। সাফে বড় পাওয়া এই মানসিক অর্জন। সাফ আমরা জিতি বা না জিতি কিন্তু আরও বড় উপলক্ষ্য উঁকি দিচ্ছে অক্টোবর-নভেম্বরে অ-১৯ এশিয়া কাপ বাছাইতে। মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, উজবেকিস্তান ও স্বাগতিক তাজিকিস্তানের গ্রুপ থেকে মূল পর্বে কোয়ালিফাই করা কি খুব কঠিন হবে? আগাম শুভকামনা রইল রক্সির দলের জন্য।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button