অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

ঢাকার উত্তরখানের এক ভিনটেজ গাড়ি সংগ্রহশালার গল্প!

চট্টগ্রাম ক ২১৩৩।

একটি গাড়ির নাম্বার। যেনতেন গাড়ি নয় কিন্তু! শেভরোলেট ১৯৫৬ মডেলের এই গাড়িটির ইতিহাস বেশ গুরুত্ববহ। তিনজন রাষ্ট্রপতি এই গাড়িটি ব্যবহার করেছিলেন বিভিন্ন সময়ে। যার মধ্যে আছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানও। তিনি যখনই চট্টগ্রামে যেতেন, এই গাড়িটিতে চড়তেন। গাড়িটির সাথে জড়িয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গাড়িটি হাইজ্যাক করে মুক্তিবাহিনী। পাক সেনাবাহিনীর কাছ থেকে গাড়িটি ছিনিয়ে তারা যুদ্ধের সরঞ্জাম আনা নেয়ার কাজে গাড়িটিকে ব্যবহার করতেন। তবে, কোনো এক যুদ্ধ-আক্রান্ত ক্ষণে এই গাড়িটিও মানুষের মতো গুলিবিদ্ধ হয় পাক হানাদারের রাইফেল থেকে।

এই ঐতিহাসিক গাড়িটির দেখা পাওয়া যাবে রাজধানীর উত্তরখানের এক খামারবাড়িতে। গাড়িটির বর্তমান মালিক মাহমুদুল ফারুক। পুরানো ক্ল্যাসিক গাড়িগুলো সংগ্রহ করাই যার প্রধান নেশা। তার বাবা মোসলেহ উদ্দিন আহমেদেরও গাড়িপ্রীতি ছিল প্রবল। কিছুটা বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন এই শখ, বাকিটা পেয়েছেন উচ্চশিক্ষার জন্যে দেশের বাইরে পড়তে গিয়ে। চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুল এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি দিয়ে চলে যান লন্ডনে। সেখানে পড়াশুনা শেষে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের জন্য যান জার্মানি। তিনি দেখলেন সেসব দেশে অনেকেরই বিচিত্র শখ থাকে। গাড়ি সংগ্রহ করার বাতিকগ্রস্থ লোকেরও অভাব নেই। মাহমুদুল ফারুকের মনে ধরলো গাড়ি সংগ্রহ করার নেশাটি। ভিন্টেজ কার ক্লাবগুলোর সদস্যও হয়ে গেলেন। লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তে লাগলেন গাড়ি সম্পর্কিত বই।

১৯৭৭ সালের কথা। গাড়ির প্রতি বিস্তর কৌতূহল, ভালবাসা ও নেশা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরলেন মাহমুদুল ফারুক। চট্টগ্রামের নাজিরহাট মাইজভান্ডারিতে একটা গাড়ি চোখে পড়লো তার। ১৯২৮ সালের ফোর্ড ব্র্যান্ডের গাড়ি। পাঠকদের জন্য একটি মজার তথ্য দেই। তৎকালীন সময়ে এই ফোর্ড গাড়িগুলোই চাঁদের গাড়ি বলে পরিচিত ছিলো! এগুলোই ছিল আদি ও খাটি চাঁদের গাড়ি। যা হোক, মাহমুদুল ফারুক এই ১৯২৮ সালের চাঁদের গাড়িটি দিয়েই শুরু করলেন ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রহের কাজ। গাড়ি সংগ্রহ করার কাজটি সহজ নয় মোটেও। কারণ, বেশিরভাগ পুরানো গাড়ির অবস্থা থাকে মুমূর্ষ রোগীর মতো সঙ্কটাপন্ন! তবুও, দেশের যে প্রান্তেই পুরানো গাড়ির খোঁজ পান ছুটে যান মাহমুদুল ফারুক। গাড়িগুলোকে নিয়ে আসেন তার খামাড়বাড়িতে।

উত্তরখান মৈনার টেকের এই খামারবাড়িতে প্রবেশ মুখেই একটি গেইট। ভেতরে প্রবেশ করলেই সবুজ ঘাসের চাঁদরে মোড়া খোলা প্রান্তর। তারপর চোখে পড়বে আরেকটি ছোট গেইট। এই গেইটে প্রবেশ করলেই দেখা মিলবে মাহমুদুল ফারুকের সংগ্রহশালা। এখানে কিছু লোককে দেখা যায় গাড়ির কাজ করতে। যেন কিছুটা ওয়ার্কশপের মতোই। সংগ্রহে থাকা গাড়িগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে তারা কাজ করেন। পাশাপাশি নতুন সংগ্রহ করে আনা মুমূর্ষ গাড়িগুলোকে মেরামত করে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তারা। গোটা প্রক্রিয়া নিজ হাতে তত্ত্বাবধান করেন মাহমুদুল ফারুক। ইন্টারনেট খুঁজে নকশা বের করে সে মতো নিজেই ডিজাইন করেন। এছাড়া গাড়ি বই পড়ে, নেট ঘেঁটে তথ্য খুঁজে বের করেন।

একটা গাড়ি শুধু মেরামত করলেই চলে না। এটাকে দিতে হয় একদম আসল রুপ। ১৯৩০ মডেলের গাড়ির জন্য খুঁজে বের করতে হয় ওই একই মডেলের ইঞ্জিন। জোড়াতালির কাজ ফারুকের পছন্দ নয়। অনেক সময় পুরানো গাড়ির পার্টস পাওয়া কঠিন। তবুও তিনি ধৈর্য ধরে দেশের বাইরে থেকে পার্টস এনে কাজ করেন। তাই সময়ও লাগে প্রচুর একেকটি গাড়ির আদিরূপ ফিরিয়ে আনার জন্যে। তবুও ভালবাসা-যোগে কি কঠোর নিবেদনের সাথেই না কাজ করেন তিনি! একেকটি গাড়ি যেন তার সন্তান সমতুল্যই।

বর্তমানে প্রায় ৬০ টি গাড়ি আছে তার সংগ্রহে। একেকটা গাড়ির পেছনে একেকটা গল্প। একাত্তরের যুদ্ধে ব্যবহৃত গাড়ি যেমন তার সংগ্রহে আছে, তেমনি আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত গাড়িও। ব্রিটিশ আর্মি, জাপানিজ আর্মি, বাংলাদেশী আর্মিদের ব্যবহার করা গাড়ির দেখাও পাওয়া যাবে মাহমুদুল ফারুকের কাছে। সংগ্রহে আছে জাপান, এমেরিকা, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের গাড়ি। ব্র্যান্ডগুলোও কী ক্ল্যাসিক! অস্টিন, শেভরোলেট, ফিয়েট, রোলস রয়েলস, মারসিডিজ বেঞ্জ, টয়োটা, ভক্সওয়াগন, মরিস মাইনর, মাজদা, জাগুয়ার সহ আরো কিছু ব্র্যান্ডের ক্ল্যাসিক মডেলের গাড়ি সংগ্রহ করেছেন।

এই গাড়িগুলো যখন ঠিকঠাক করে চালান, মাহমুদুল ফারুক যেনো গাড়ির সাথে ফিরে যান সেইসব পুরানো দিনে। গাড়িগুলোকে যখন চোখের সামনে দেখেন, ফিরে যান সেই ইতিহাসের দিনগুলোতে। গল্পগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার। কাছে গেলে হয়তো ঘ্রাণ অনুভব করেন,চোখ বন্ধ করলেই দেখেন বঙ্গবন্ধু বসে আছেন ফোর্ড ১৯২৮-এ।

মাহমুদুল ফারুক ঢাকার রাস্তায় শেভরোলেট (১৯২৭) ব্র্যান্ডের একটি চার সিলিন্ডার বিশিষ্ট গাড়ি অনেক দিন চালিয়েছেন নিজেই। এই গাড়িটি নিয়ে ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রথম ভিনটেজ র‍্যালিতেও অংশ নেন। তার চেয়েও চমৎকার ব্যাপারটি হচ্ছে ভিনটেজ গাড়িপাগল এই মানুষটা তার বিয়েতেও এই গাড়িটাই ব্যবহার করেছিলেন। তার বিয়ের বরযাত্রী গিয়েছিল এই গাড়িতে করেই!

গাড়ি সংগ্রহ করতে করতে চোখে পড়লো মোটর বাইক। ভিনটেজ বাইক মাহমুদুল ফারুকের নজর এড়াতে পারেনি। তিনি তাদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করেছেন সংগ্রহশালায়। ট্রিয়াম্প অব ইংল্যান্ড, ইতালিয়ান ভেসপা, ইতালিয়ান ল্যামব্রেটা, জাপানের হোন্ডা, মোটো গুজ্জি, ইন্ডিয়ান রয়েল এনফিল্ড, ডুকাটির মতো ব্র্যান্ডগুলোর ভিনটেজ বাইক আছে তার সংগ্রহে। গাড়ির মতো বাইকেরও গল্প আছে। তার সংগ্রহে একটি বাইক আছে, ইন্ডিয়ান ইউএসএ ১৯৪২ মডেলের। যেটি ব্রিটিশ আর্মিরা জাপানিজ আর্মিদের বিরুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্যবহার করেছিল।

এছাড়া একটি ট্রাক্টর আছে, তার ধারণা এটিই সম্ভবত বাংলাদেশে (তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া) আসা প্রথম ট্রাক্ট্রর। এই ট্রাক্টরের সাথে জড়িয়ে আছে আরেক ট্র্যাজেডি। কুষ্টিয়ার এক জমিদারপুত্র ত্রিশের দশকের শুরুতে অ্যামেরিকা থেকে ট্রাক্টরটি কিনে আনেন। তারপর তাদের বিশাল সম্পত্তিতে চাষাবাদ শুরু করেন তিনি। কিন্তু হটাতই কিছুদিনের মধ্যে সান স্ট্রোকে জমিদারপুত্রটি মারা যায়। পুত্রশোকে জমিদার ট্রাক্টরে মাথা খুঁড়ে খুঁড়ে মারা যান। তারপর তাদের পরিবার এটি এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে ধান ভাঙ্গার মেশিন হিসেবে। একদিন ধানভাঙ্গার সময় এর মধ্যে পিষ্ট হয়ে মারা যায় ১০-১২ জন লোক। এভাবে পরে আরো কয়েকহাত হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত এটি এখন আছে মাহমুদুল ফারুকের কাছে।

তার সংগ্রহে আছে এমন ফ্রিজ যা চলে কেরোসিনে। শুনতে আশ্চর্য মনে হলেও এটিই সত্যি। আজকের প্রজন্ম হয়তো জানবেই না কখনো যে, বাংলাদেশে যখন বিদ্যুৎ ছিল না, তখন এই ধরণের ফ্রিজগুলোর প্রচলন ছিলো। এই রেফ্রিজারেটরগুলো চলতো কেরোসিনে। ১৯৩০ সালের একটি চার সিট বিশিষ্ট ট্রেইনিং বিমানের বডিও আছে তার এই সংগ্রহশালায়।

বেশ কয়েকবার ভিনটেজ গাড়ির প্রদশর্নীতে অংশ নিয়েছেন মাহমুদুল ফারুক। ইচ্ছে আছে, গাড়িগুলো দিয়ে ভিনটেজ গাড়ির যাদুঘর করবেন। সেই কাজ অনেকদূর এগিয়েও নিয়ে গিয়েছেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, এই গাড়িগুলো সংগ্রহ করতে তার অনেক সময় গেছে, গেছে অনেক অর্থ। কিন্তু তবুও এই কাজটি তিনি করতে ভালবাসেন। এটি যে শুধু নিজের জন্যেই করছেন তা নয়। তার ইচ্ছে, এই জেনারেশনের ছেলেমেয়েরা এই ভিনটেজ গাড়িগুলো সম্পর্কে জানবে, চড়বে। গাড়িগুলোর সাথে জানবে তারা ইতিহাসও। একেকটি গাড়ি তো একেকটি গল্পেরই বাহন!             

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button