মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

‘রিলেশনশীপ গোল’ তো এমনই হওয়া উচিত!

একটাই তো জীবন, সেটাকে ঠিকঠাকমতো উপভোগ করতে না পারলে সেই জীবনটা যাপনের তো কোন মানে নেই! ষাট-পঁয়ষট্টি বছরের গড় আয়ুতে যদি পছন্দের কাজগুলোই করা না গেল, তাহলে কি লাভ এতগুলো বছর বেঁচে থেকে? অজস্র আফসোস নিয়ে একদিন মরে যেতে হবে, তার আগে যতটা পারা যায় নিজের ইচ্ছেগুলো পূরণ করে নেয়াই উচিত। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষজনের পকেটে তো আর ইচ্ছেপূরণ দৈত্য নেই যে চাইলেই তিনটে ইচ্ছে পূরণ করে দেবে। তাই নিজের চাহিদা, নিজের অপ্রাপ্তিগুলো পূরণ করার দায়িত্ব নিতে হয় নিজেকেই। সাহস করে সামনে পা বাড়াতে হয়। এভাবেই জীবন কেটে যাবে ভাবলে পরিবর্তনটা আসে না কখনোই, মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত বাসনাগুলোও ডানা মেলে আকাশা ওড়ার সুযোগ পায় না কোনদিন। বিশ্বাস করুন, ছোট-বড় ইচ্ছে পূরণ করতে টাকার চেয়ে বড় যেটা দরকার, সেটা হচ্ছে মনের জোর।

এক দম্পতির গল্প শোনাই আপনাদের। ভারতের দক্ষিণে কেরালা রাজ্যের কোচিন শহরে তাদের বসবাস। ছেলেপুলেরা মানুষ হয়ে গিয়েছে, তাদেরও আলাদা সংসার হয়েছে। বুড়ো-বুড়ি দুজনে আলাদাই থাকেন, আয়ের একমাত্র উৎস হচ্ছে একটা চায়ের দোকান। স্বামী ভদ্রলোকের নাম বিজয়ন, স্ত্রীর নাম মোহনা। বিজয়ন সেই ১৯৬৩ সাল থেকে ছোট্ট একটা চায়ের দোকান চালান। সেটা দিয়েই সংসার চালিয়েছেন, ছেলে মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়ে বড় করেছেন।

এরকম গল্প তো ভারত কিংবা বাংলাদেশের হাজার হাজার চা দোকানদারের আছে। তাহলে বিজয়নের গল্পটা কেন বলছি? কি তার বিশেষত্ব?

বিজয়নের একটা রোগ আছে। শরীরের নয়, মনের রোগ। ঘুরে বেড়াতে তার প্রচণ্ড ভালো লাগে, জীবনে এই একটা নেশাতেই তিনি ডুবেছেন। ডুবে যাওয়ার পরে আর ওঠার ইচ্ছেও হয়নি। পুরো ভারত তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন, গিয়েছেন ভারতের বাইরেও। মালয়েশিয়া, দুবাই বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলো থেকে তিনি ঘুরে এসেছেন। কিশোর বয়সে যে ঘুরে বেড়ানোর ভূতটা মাথায় চেপে বসেছিল, সেটা এই সত্তর বছর বয়সেও মাথা থেকে নামেনি। বিজয়ন সেটা নামাতে চানও না, বরং ঘুরে বেড়ানোর পোকাটা ঢুকিয়ে দিয়েছেন স্ত্রী মোহনার মাথায়ও!

একসঙ্গে এই দম্পতি ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের বিশটিরও বেশি দেশে! মালদ্বীপ, আরব আমিরাত থেকে শুরু করে মিশর, সব দেশেই নিজেদেত পায়ের ছাপ ফেলে এসেছেন বিজয়ন আর মোহনা। সীমিত আয়, বয়স কিংবা সেই দেশের ভাষা পুরোপুরি না জানা- কোনকিছুই তাদেরকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি, পারবেও না। বিজয়নের ইচ্ছে, স্ত্রীকে নিয়ে তিনি পুরো পৃথিবী ঘুরবেন, এর আগে মরতে চান না এই দম্পতি।

মাথায় আসতেই পারে, চায়ের দোকান চালিয়ে বিদেশ ভ্রমণের মতো টাকা এই দুজনে পায় কোত্থেকে? এই প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক। উত্তরটা বেশ অদ্ভুত। বিজয়নের ‘শ্রী বালাজী কফি হাউজ’ নামের দোকানে চা-কফি থেকে শুরু করে হালকা নাস্তাও বিক্রি হয়। দিনশেষে যায় লাভ আসে, সেখান থেকে তারা তিনশো রূপি আলাদা করে রাখেন, এটা তাদের ঘুরে বেড়ানোর ফান্ডে চলে যায়। এভাবে মাসে নয় হাজার রূপি জমে, বছরে জমানো যায় এক লক্ষ রূপিরও বেশি। তাতেও যদি না হয়, তখন তারা ব্যাংক লোন নেন। একটা দেশ থেকে ঘুরে এসে কয়েক মাসের মধ্যে লোনটা শোধ করেন তারা, তারপর আবার টাকা জমানো শুরু করেন নতুন একটা দেশ ভ্রমণের জন্যে!

শুধু তা-ই নয়, মানুষের সাহায্যও পান তারা। বলিউড সেলিব্রেটি অমিতাভ বচ্চন যেমন এই দম্পতিকে বেশ কয়েকবার সাহায্য করেছেন আর্থিকভাবে, সাহায্য করেছেন আরেক অভিনেতা অনুপম খেরও। ভারতীয় রাজনীতিবিদ শশী থারুরও নানাভাবে সাহায্য করেন বিজয়ন এবং মোহনাকে, আরও অনেকেই ওদের ভ্রমণের জন্যে উপহার হিসেবে টাকা পাঠান, যাতে ঘুরে বেড়াতে তাদের অসুবিধা না হয়।

গল্পটা খুব সহজ মনে হতে পারে। আদতে সেটা এত সরলও নয়। বিজয়নদের বালাজী কফি হাউজটা শহরের একপ্রান্তে, তাছাড়া খুব জনপ্রিয় কোন দোকানও নয়, আয়টাও তাই সীমিত। তার ওপরে দুজনেরই বয়স হয়েছে সত্তরের ওপরে, এই বয়সে যা খুশি তা করতে গেলে শরীরও বিদ্রোহ করে বসে।

তবে বিজয়ন বা মোহনা এতসবের ধার ধারেননি। আর তাই তো রুগ্ন শরীর নিয়েও দুজনে হাত ধরাধরি করে উঠে পড়েন বিমানে, ওদের দেখা মেলে দক্ষিণ আমেরিকার চিলিতে, আন্দিজ পর্বতমালার সামনে বিস্ময়্র চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায় দুজনকে। কে জানে, ওদের এই অসহ্যরকমের প্রাণশক্তি আর সাহস দেখে আন্দিজও বোধহয় অবাক হয়।

ফেসবুকে অনেক রকম রিলেশনশীপ গোল দেখি। আসলে রিলেশনশীপ গোল কি জিনিস, সেটা তো বিজয়ন আর মোহনাই দেখিয়ে দিচ্ছেন! মানবজীবন তো এমনই হওয়া উচিত, যে জীবন বাধা ভেঙে সামনে এগিয়ে যায়, যে জীবন ভয়কে পায়ে মাড়ায়। ছাপোষা একটা জীবন কাটিয়ে কি লাভ বলুন? পদে পদে মানিয়ে নেয়ার যাতনা সহ্য করার নাম তো জীবন নয়, সেটার নাম যন্ত্রণা। সত্তরোর্ধ্ব চা দোকানদার হয়ে বিজয়ন এবং মোহনা যদি নিজেদের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে পূরণ করার পথে হাঁটতে পারে, তাহলে আপনি কেন বসে থাকবেন?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button