খেলা ও ধুলা

রাষ্ট্রনায়ক যখন বিশ্বকাপের সেরা ‘খেলোয়াড়‘!

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় মানেই ম্যারাডোনার সোনালী ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরার সেই চিরচেনা দৃশ্যটা। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় মানেই হ্যান্ড অফ গড, লাফিয়ে ওঠা ক্ষুদে জাদুকর আর জালে জড়ানো বল! কিন্ত আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় মানে তো বিতর্কও! ছিয়াশিতে যেমন ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা সেই গোলটা, আটাত্তরে তেমন বিশ্বকাপে সামরিক জান্তার অবৈধ হস্তক্ষেপ। যদিও সেটার কথা অনেকেই ঠিকঠাক জানেন না, আবার যেটুকু রটেছে তার কতখানি সঠিক সেটা নিয়েও আছে প্রচুর বিতর্ক। তবে ইতিহাসের খেরোখাতায় আর্জেন্টিনার সেই প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পথটা নিস্কণ্টক ছিল না, ছিল না একেবারে স্বচ্ছও।

ঘটনার সূত্রপাত বিশ্বকাপের অনেক আগে থেকেই। চার বছর আগেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল, ১৯৭৮ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে আর্জেন্টিনায়। কিন্ত গোলমাল বাঁধালো ল্যাটিন আমেরিকার এই দেশটার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। ক্ষমতায় বসলেন সেনাসমর্থিত স্বৈরশাসক জেনারেল ভিদেলা। স্বভাবতই ইউরোপের গণতন্ত্রমনা রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে খুব একটা সদ্ভাব ছিল না এই একনায়কের। ১৯৭৬ সালে ক্ষমতা দখল করেছিলেন ভিদেলা। প্রথম দুই বছরে তার সরকারের দুঃশাসন আর অত্যাচার-নির্যাতনে মোটামুটি অতিষ্ট হয়ে উঠছিল আর্জেন্টিনার জনগণ।

এইখানে একটু থামি। আর্জেন্টিনার ঘরের ব্যাপারে পরে আসছি। তার আগে একটু বিশ্বফুটবল থেকে ঘুরে আসা যাক। নেদারল্যান্ডের নেতৃত্বে ইউরোপের কয়েকটা দেশ সেবার বিশ্বকাপ খেলতেই যেতে চায়নি। এরকমটা হলে ভিদেলার সরকার কঠিন একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তো। আগের বিশ্বকাপের রানারআপেরা বিশ্বকাপ বয়কট করছে, ব্যাপারটা মেনে নেয়া সহজ কিছু নয়। কুটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে নেদারল্যান্ডকে খেলতে রাজী করানো গেল, কিন্ত ইয়োহান ক্রুইফ গেলেন না দলের সঙ্গে। এটার পেছনেও হাজারটা গুজব রটে। কেউ বলে ল্যাটিন মাফিয়ারা নাকি স্পেনে ক্রুইফের বাড়িতে হুমকি দিয়েছিল, ক্রুইফ আর্জেন্টিনায় গেলে খুব খারাপ পরিণতি বরণ করতে হবে তাকে। আবার কারো মতে, স্বৈরাচারী সরকারের বিরোধিতা করেই ক্রুইফ নাকি সেবার খেলতে যাননি আর্জেন্টিনায়!

সে যাই হোক, মাঠের খেলা শুরু হলো। তার আগেও একদফা বিতর্ক হলো আর্জেন্টিনার দল নির্বাচন নিয়ে। উদীয়মান প্রতিভা ডিয়াগো ম্যারাডোনাকে বাদ দিলেন কোচ সিজার মেনেত্তি, অজুহাত হিসেবে বললেন, ম্যারাডোনার বয়স কম! নিয়তি হয়তো সেদিনই ঠিক করে ফেলেছিল, এই ম্যারাডোনার পায়েই আট বছর পরে আবার বিশ্বকাপ জিতবে আর্জেন্টিনা!

ষোল দলের বিশ্বকাপ, কিন্ত ফরম্যাটটা অদ্ভুত। দুই দফা গ্রুপপর্ব, নেই কোন সেমিফাইনাল! হার দিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু হলো স্বাগতিকদের। দেশজুড়ে সরকারী খরচে জাতীয় পতাকা সরবরাহ করলো ভিদেলা সরকার, কট্টর জাতীয়তাবাদের আড়ালে ঢেকে দিতে চাইলো জনগণের অসন্তোষকে। গ্রুপপর্বে আর্জেন্টিনার সবগুলো ম্যাচই ছিল রাতে। এটা নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। ঘরের মাঠে এই বিশ্বকাপটা জিততে পারলে সরকারবিরোধী তৎপরতা মোটামুটি ঢেকে দেয়া যাবে, এটা জানা ছিল ভিদেলার। সেই লক্ষ্যেই নামলেন তিনি।

দ্বিতীয় পর্বে আর্জেন্টিনার গ্রুপে ছিল ব্রাজিল, পেরু এবং পোল্যান্ড। ব্রাজিলের বিপক্ষে ড্র করেছিল আর্জেন্টিনা। পোল্যান্ডের সঙ্গে জিতলেও, শেষ ম্যাচের আগে ফাইনালে যাওয়ার সমীকরণটা ছিল আর্জেন্টিনার জন্যে যথেষ্ট কঠিন। ফাইনালে উঠতে হলে অন্তত চার গোলের ব্যবধানে হারাতে হবে পেরুকে। আগের চার ম্যাচে পাঁচ গোল হজম করা পেরুর জালে নব্বই মিনিটে এতগুলো গোল দেয়াটা মোটামুটি দুঃসাধ্য একটা কাজ। কিন্ত সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে পেরুকে ৬-০ গোলে হারালো আর্জেন্টিনা!

এই ম্যাচটা পাতানো বলেই মত দিয়েছিলেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক। বিতর্ক আরও উস্কে ওঠে বিশ্বকাপের পরে যখন ভিদেলা সরকার পেরুতে পঞ্চাশ হাজার মেট্রিক টন গম পাঠিয়েছিল সাহায্য হিসেবে। এটা সম্ভবত বিশ্বকাপের সেই ম্যাচের উপঢৌকন ছিল। এছাড়া আর্জেন্টিনার কারাগারে বন্দি থাকা তেরোজন পেরুভিয়ান নাগরিককে মুক্তি দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। দুই দেশের মধ্যে বেশকিছু অর্থনৈতিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল বিশ্বকাপের পরে। এতে ভালোই লাভবান হয়েছিল পেরু। আর আর্জেন্টিনার কেন্দ্রীয় ব্যাংক জব্দ হয়ে থাকা পেরুর ৫০ মিলিয়ন ডলার ফেরত দিয়ে দেওয়ার পর নিন্দুকেরা ব্যাপারটি বিশ্বাসই করা শুরু করে দিয়েছিলেন। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে এটা মোটামুটি নিশ্চিত যে, আর্জেন্টিনা আর পেরুর সেই বিতর্কিত ম্যাচের আড়ালে অনেক নাটকই মঞ্চস্থ হয়েছিল।

পেরুকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলো আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে কোন ম্যাচ না হেরেও বাদ পড়লো ব্রাজিল। ফাইনালে ক্রুইফবিহীন নেদারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা ঘরে তুলেছিল মারিও কেম্পেসের আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচের আগে হল্যান্ড দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, আগের রাতে তাদের হোটেলের সামনে উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো হয়েছিল। এছাড়া ম্যাচের আগে হোটেল থেকে স্টেডিয়ামের পনেরো মিনিটের রাস্তাটা তাদেরকে আনা হয়েছিল দেড় ঘন্টা ঘুরিয়ে! তবে সেসবের অস্তিত্ব রেকর্ডবুকে নেই, সেখানে লেখা আছে, ১৯৭৮ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন দলের নাম আর্জেন্টিনা!

আর্জেন্টিনার সেই দলটা ছিল দারুণ প্রতিভাবান, কেম্পেস, প্যাসারেলা, আরদিলেস, লিওপোলদো- এদের দলটা বিশ্বকাপ জেতার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। কিন্ত তবুও বিশ্বকাপ জিততে বিতর্কের আশ্রয় নিয়েছিলেন ভিদেলা, অনেকে তো ১৯৭৮ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রনায়ক ভিদেলাকেই মানেন এখনও!

*

এখন ঘরে বসেই অনলাইনে কিনুন ক্যাসপারস্কি ল্যাবের সব পণ্য, খুব সহজে। অনলাইনে পেমেন্ট, অনলাইনেই ডেলিভারি!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button