ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ভিসি নামের এই বিষবৃক্ষটাকে উপড়ে ফেলুন দয়া করে!

জীবনে কখনও শুনেছেন, সরকারী একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, যিনি স্বয়ং রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত, তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ একজন ছাত্রীকে ফোন করে ধমক দিচ্ছেন, উত্তপ্ত কণ্ঠে পরিবার তুলে কথা বলছেন- “তোর আব্বা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছে কোনোদিন? আমি খুলেছি (বিশ্ববিদ্যালয়) বলেই তোর চান্স হইসে। নাইলে রাস্তায় গিয়ে ঘুরতি। বেয়াদব মেয়ে…”

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন এমনই এক কীর্তি গড়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক ছাত্রীর সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে, সেখানে জিনিয়া নামের ছাত্রীকে বিশ্রি ভাষায় শাঁসাচ্ছিলেন তিনি। সেই ছাত্রী ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল- ‘একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি হওয়া উচিত?’ সেই স্ট্যাটাসটাই ভিসি মহোদয়ের মেজাজ গরম হবার কারণ।

সেই ছাত্রীকে ফোন দিয়ে ইচ্ছেমতো ধমক দিয়েছেন ভিসি, তারপর তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারও করেছেন নিজের খুঁটির জোর খাটিয়ে। ফেসবুকে এক লাইনের নিরীহ একটা স্ট্যাটাস দেয়ার কারণে যে কাউকে এত বড় শাস্তি দেয়া যেতে পারে, সেটা খোন্দকার নাসির উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি না হলে জানা হতো না। একজন ছাত্রীর বাবা মা তুলে কথা বলার অধিকার তাকে কে দিয়েছে, এই প্রশ্নটা করতে বড্ড ইচ্ছে করছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ফাতেমা তুজ জিনিয়া, ভিসি খন্দকার নাসির উদ্দিন

মজার ব্যাপার হলো, ছাত্রীকে বহিষ্কারের উসিলা হিসেবে কারণ দেখানো হয়েছে ছাত্রী নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করতে চায়, ভিসির ফেসবুক হ্যাক করেছে, ভিসির ফেসবুক হ্যাক করে প্রশাসনকে বিব্রত করে বিশ্ববিদ্যালয়কে নাকি অচলাবস্থার মধ্যে ফেলে দিতে চেয়েছে! অথচ সেই ছাত্রীটি বলছিল, সে এই প্রশ্নের উপর মতামত ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন লিখবে। তাই এই প্রশ্ন করেছে। উল্লেখ্য, ফাতেমা তুজ জিনিয়া একটি পত্রিকার ক্যাম্পাস প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

ভিসির এত রাগের কারণ জানতে গিয়ে তার সম্পর্কে একটু খোঁজখবর করার ইচ্ছে হলো। গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন তার শিক্ষকতা জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন মহমনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীরত অবস্থায়। বিএনপির রমরমা সেই সময়টায় তিনি ছিলেন বিএনপিপন্থী সোনালী দলের শিক্ষক নেতা, নির্বাচন করে বিজয়ীও হয়েছেন।

প্রশ্ন আসতেই পারে, বিএনপিপন্থী শিক্ষক আওয়ামী লীগের আমলে কি করে ভিসি হন, তাও আবার গোপালগঞ্জের মতো জায়গায়? এখানেই টুইস্টটা লুকিয়ে আছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই গিরগিটির মতো রঙ বদলে ফেললেন খোন্দকার নাসির, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বইও লিখলেন। অথচ কয়েকবছর আগেও তিনি মেজর জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবী করেছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে! এ কি ভানুমতি, এ কোন ইন্দ্রজাল!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ফাতেমা তুজ জিনিয়া, ভিসি খন্দকার নাসির উদ্দিন
এই স্ট্যাটাস দেয়ার জন্যে ভিসি ফোনে ধমকান ছাত্রীকে!

যাই হোক, রঙ বদলে যাওয়ার পরে পদ বাগাতেও খুব একটা সমস্যা হয়নি তার, গোপালগঞ্জে বশেমুরপ্রবি’র ভিসি হিসেবে তার নিয়োগটাই সেই প্রমাণ দেয়। ভিসি হবার পর থেকেই নানা ধরণের বিতর্কিত কাণ্ডকীর্তি করে খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি। স্বেচ্ছাচারীতা আর অনিয়মের আখড়া বানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়কে, একটা স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র চালু করেছেন সেখানে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনটা কোন শিক্ষালয় নয়, যেন জঙ্গলমহল। সেখানে কেবল ভিসির আইন চলবে, ভিসির কথাই শিরোধার্য্য, এর বিপরীতে গেলেই বিপদে পড়তে হবে।

গত এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি খাত থেকে তিনি ৩৬৫ জনকে প্রায় ৭২ লাখ টাকা দিয়েছেন, মূলত ভিসিপন্থী একটা গোষ্ঠী তৈরি করার জন্য। এই টাকার ভাগ শিক্ষক থেকে শুরু করে কর্মচারী, ছাত্র, সাংবাদিক- সবাই পেয়েছেন। ছোট্ট একটা উদাহরণ দেই। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ায় জিনিয়াকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কারের পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাটুকার সাংবাদিক সমিতিও তাদের সংগঠনে জিনিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে। স্বার্থটা কোথায়, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না কারো।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম, কিংবা ভিসির নাম লিখে গুগলে সার্চ করলে ভালো কোন খবর পাবেন না, পাওয়া যাবে নারী কেলেঙ্কারি, ভর্তি বাণিজ্য, বিউটি পার্লার দিয়ে ব্যবসা করার খবরগুলো। গতবছর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর এক নারী কর্মচারী ভিসিকে তার সন্তানের পিতা দাবী করে অবস্থান ধর্মঘটে বসেছিলেন। পরে তাকে হুমকি-ধামকি দিয়ে সেটা ধামাচাপা দেয়া হয়েছে, এই খবর তখন সবগুলো জাতীয় দৈনিকে স্থান পেয়েছিলো। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যখন এরকম বিচ্ছিরি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে খবরের শিরোনাম হন, তখন ভিসি পদে থাকার নৈতিকতা তার আর অবশিষ্ট থাকে কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

ভিসির রোষের শিকার কিন্ত জিনিয়া একা নন। ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা নিয়ে স্ট্যাটাস দেয়ার আরও ছয় ছাত্রকে নানা মেয়াদে বহিস্কার করা হয়েছে। জিনিয়াকে সমর্থন জানানোয় মারধর করা হয়েছে এক সাংবাদিককে। বিশ্ববিদ্যালয়ে লুটপাটের আসর বসানো নিয়ে রিপোর্ট করায়, কর্তৃপক্ষের অবহেলা আর অসঙ্গতিগুলো নিয়ে কথা বলায় এই শাস্তি পেতে হচ্ছে ছাত্র-ছাত্রীদের। গোপালগঞ্জের ভেতরে এক টুকরো মগের মুল্লুক বানিয়ে বসে আছেন ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন।

সবচেয়ে কষ্ট লাগে কি জানেন? বঙ্গবন্ধুর শহরে, বঙ্গবন্ধুর নামে যে বিশ্ববিদ্যালয় গড়া হয়েছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে এই অজাচার। বঙ্গবন্ধু বলতেন- ‘কেউ যদি ন্যায্য কথা বলে, সে যদি সংখ্যায় একজনও হয়, তার ন্যায্য দাবী আমরা মেনে নেবো।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমনরুম তৈরি করা, ছাত্রীদের হল বানিয়ে আবাসিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিস্কার রাখা- এগুলোর কোনটিই অন্যায্য দাবী নয়। এগুলো নিয়ে কথা বলায় ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাচ্ছেন ভিসি খোন্দকার নাসির উদ্দিন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভিসি নামের এই বিষবৃক্ষটাকে উপড়ে ফেলুন দয়া করে। আপনার শহরে, বঙ্গবন্ধুর নামে বানানো বিশ্ববিদ্যালয়কে আর অপবিত্র হতে দেবেন না প্লিজ, এই একনায়কের হাত থেকে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের রক্ষা করুন। বঙ্গবন্ধু সারাজীবন মানুষের জন্যে আন্দোলন করেছেন, জেল খেটেছেন, তার এলাকায় মগের মুল্লুক তৈরি হতে দেবেন না দয়া করে…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button