ইনসাইড বাংলাদেশ

লজ্জায় লজ্জিত না হইলে গর্বে গর্বিত হইব কেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্যের বাড়ি আমারই গ্রামে, তার ও আমার নামেরও একাংশে মিল আছে। তিনি যখন উপাচার্য নিযুক্ত হলেন, এলাকার একাধিক প্রিয়জন জানতে চেয়েছিলেন তাকে অভিনন্দন জানিয়ে আমি কোনো লেখা লিখব কি না। আমি যে জেলায় জন্মেছি; সে জেলায় যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে বিখ্যাত কোনো প্রাকৃতিক নিদর্শন বা মনুষ্যসৃষ্ট স্থাপনা নেই এবং যেহেতু দেশব্যাপী খ্যাতিমান কোনো নায়ক-গায়ক, বাদক-সাধক, কবি-সাহিত্যিক, দাবাড়ু-সাঁতারু জেলাটিতে জন্মাননি; সেহেতু এই জেলার কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হলে তা জেলাটির অধিবাসীদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক ও গৌরবময় একটি খবর। কিন্তু এই কথিত গৌরবে আমি ব্যক্তিগতভাবে গৌরবান্বিত হতে পারি না। পারি না চায়ের আকণ্ঠ আড্ডায় ‘আমার বাবার খালাতো বোন আর উপাচার্য একই ইশকুলে পড়েছেন’ কিংবা ‘উপাচার্য এককালে আমার দাদার হাতে কত্ত লেবেঞ্চুষ খেয়েছেন’ মর্মে কলার উঁচিয়ে উপাচার্যের কৃতিত্বে একচিমটি ভাগ বসাতে। কেননা তার উপাচার্য হওয়ার পেছনে আমার জেলার বা আমার কোনো ভূমিকা নেই। আমার জেলায় না জন্মে অন্য কোনো জেলায় জন্মালেও তিনি ঠিকই উপাচার্য হতেন। আজ তিনি উচ্চপদে আসীন বলে ‘উপাচার্য আমার জেলার’ বলে আত্মশ্লাঘা বোধ করলেও তিনিই কোনো একদিন অসদাচরণের দায়ে পদচ্যুত হলে আমরাই তাকে নিজেদের বলে অস্বীকার করব এবং ‘একজন দুর্জনকে দিয়ে গোটা জেলাকে বিচার করতে নেই’ বলে চ্যানেল পালটে অন্য চ্যানেলে মনোনিবেশ করব। এই উপাচার্য কখনও দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হলে আমার জেলার বাসিন্দাদের একাংশ বলবে— এই ব্যক্তি আমাদের থানার না, তার থানার বাসিন্দাদের একাংশ বলবে— এই লোক আমাদের ইউনিয়নের না, তার ইউনিয়নের বাসিন্দাদের একাংশ বলবে— এই ব্যাটা আমাদের ওয়ার্ডের না, তার ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের একাংশ বলবে— ও আমাদের বাড়ির না, তার বাড়ির লোকজন বলবে— একবাড়িতে জন্মালেই তার পাপের ভার পরিবারের প্রত্যেকে নিতে বাধ্য না; পাপকে ঘৃণা করুন, পাপীকে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়েও আমাদের একধরনের অলীক গর্ব আছে। যে প্রতিষ্ঠানে আমরা পড়েছি, সেখানকার কোনো সাবেক বা বর্তমান শিক্ষার্থী ইতিবাচক কোনো কারণে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পেলে ‘প্রাউড টু বি আ অমুক-ইয়ান’ মর্মে আমরা হাস্যকর হ্যাশট্যাগে আচ্ছন্ন হই। আবার ঐ প্রতিষ্ঠানেরই কেউ কুখ্যাতি অর্জন করলে ‘একজনকে দিয়ে গোটা প্রতিষ্ঠানের সবাইকে মাপা অনুচিত’ মর্মে আমরা রেডিমেড ফতোয়া জারি করি। অথচ ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো কর্মকাণ্ডেই ঐ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। আমার স্কুলের কেউ মন্ত্রী হলে তাতে স্কুলের বা আমার কৃতিত্ব নেই; স্কুল তাকে মন্ত্রী বানায়নি, বানাইনি আমিও। নিজের প্রতিষ্ঠানের কারো ইতিবাচক অর্জন সবাই লাইন ধরে ত্রাণ নেওয়ার মতো করে ভাগবাটোয়ারা করে নিলেও কারো নেতিবাচক কর্মের ভাগ নিতে আমরা অনিবার্যভাবে অনিচ্ছুক। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কেউ দেশব্যাপী ঘৃণিত হলে অন্য শিক্ষার্থীরা নির্বিকারভাবে বলে ফেলেন— এই লোক আমাদের ব্যাচের না, তার ব্যাচের শিক্ষার্থীদের একাংশ নির্লিপ্তভাবে বলে বসেন— সে আমাদের শাখায় পড়ত না, তার শাখার শিক্ষার্থীরা নিশ্চিন্তে বলে ওঠেন— একই শাখার হলেও ওর সাথে এক বেঞ্চে কখনও বসিনি, এককালে একসাথে বসা শিক্ষার্থীরা বেমালুম বলে বসেন— একসাথে বসলেও কখনও কথা বলিনি, তখনই ওর ভাবভঙ্গিমা দেখে অনুমান করতে পেরেছিলাম একদিন সে একটা দুর্ধর্ষ ক্রিমিনাল হবে; ওর বাড়ি যে জেলায়, সে জেলার অধিকাংশ মানুষই এ রকম ক্রিমিনাল কিসিমের। আবার, কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেরা— এই তর্কের ডালপালা যে কত সুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, কীভাবে ভেঙে দেয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কীভাবে বিনষ্ট করে সামাজিক শান্তি; তা কারো অজানা নয়। আমরা ভুলে যাই— একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমরা যে সময়টা-জুড়ে পড়ি, তা আমাদের দীর্ঘ জীবনের ক্ষুদ্র একটি অংশ এবং মূল জীবন শুরুই হয় শিক্ষাজীবন-শেষে; আমরা ভুলেই যাই— অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া অনেকে ছাত্রজীবন-পরবর্তীকালে হারিয়ে যান কালের গর্ভে আর অখ্যাত প্রতিষ্ঠানে পড়া এককালের অপাঙক্তেয়-অনাহূত ছাত্রটি প্রাপ্তবয়সে হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রপ্রধান।

নিজধর্মের কেউ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কৃত হলে আমরা আনন্দে আহ্লাদিত হই, উল্লাসে উদ্বাহু নাচি, তার নাম সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে তুলি, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য তার নাম মুখস্থ করি এবং নিজধর্মেরই কেউ ধর্মের নামে নরহত্যায় মেতে উঠলে আমরা ‘একজন দুষ্কৃতকারীর জন্য আমার ধর্মের সবাই দোষী হতে পারে না’ বলে চিরাচরিতভাবে তাকে অস্বীকার করি, সুখ্যাতির শরবত পান করতে উদগ্রীব হলেও কুখ্যাতির কণ্টকশয্যায় শুতে আমরা নেহায়েতই নারাজ। নিজধর্মের কারো সংঘটিত অপকর্মের দায়ভার যতদিন আমরা প্রত্যেকে নিজের ঘাড়ে টেনে নিতে না পারব, নিজধর্মের কারো ব্যক্তিগত অর্জনে ততদিন পর্যন্ত যে আমাদের গর্বিত হওয়ার সুযোগ বা অধিকার নেই; এই সহজ সমীকারণটি আমরা মনে রাখি না, মনে রাখলেও মেনে চলি না।

গৌরবের ভাগীদার আর অগৌরবের ‘ভাগি দ্বার’ হওয়ার প্রবণতা মনুষ্যসম্প্রদায়ের মজ্জাগত প্রবৃত্তি। নিজ অঞ্চল, প্রতিষ্ঠান বা সম্প্রদায়ের ব্যক্তিগত অর্জনে গর্বিত হতে মেধা, শ্রম বা সময়ের কোনোটিই খরচ করতে হয় না; বরং ‘তিনি আমার এলাকার’ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেই তার অর্জনের ছটাকপরিমাণ ছটা আমাকেও আলোকিত করে। এই নিখরচা নাগরামোয় আমাদের আকূল আগ্রহ আর অন্য অঞ্চল, অন্য প্রতিষ্ঠান, অন্য সম্প্রদায়কে লাগাতার বিদ্রূপ করে যাওয়ার মাঝে পৈশাচিক আনন্দ খুঁজে পাওয়া বস্তুত উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকেই উৎসারিত। জেলাবাদ-প্রতিষ্ঠানবাদ-সম্প্রদায়বাদের খোলসের ভেতরেই উগ্র জাতীয়তাবাদ ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ইউনিট অদৃশ্যভাবে কাজ করে। অন্য অঞ্চলকে বা খেলাধুলায় অন্য দলের সমর্থকদেরকে নিয়ে বিরামহীন বিদ্রূপকে আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও দিনের শেষে এই বিদ্রূপ ঘৃণায় রূপ নেয়, ঘৃণা রূপ নেয় বিদ্বেষে, বিদ্বেষ থেকে উৎপত্তি ঘটে শারীরিক সংঘাতে।

নিজের অঞ্চলকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণে আমাদের যতটা আগ্রহ, অন্য অঞ্চলকে নিয়ে নির্মম ব্যঙ্গ করায় আমাদের এর চেয়ে বেশি আগ্রহ। আমাদের এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি এতটাই ক্ষুদ্র যে, আকারে এটি ইউএসএ বা ভারতের কতিপয় বৃহৎ অঙ্গরাজ্যের অর্ধেকের চেয়েও ক্ষুদ্র; ভারতের কোনো-কোনো রাজ্যের জনসংখ্যা আমাদের রাষ্ট্রের গোটা জনসংখ্যার চেয়েও কয়েক কোটি বেশি। একেক রাজ্যের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতি বৈশিষ্ট্য একেক রকম হওয়ার কারণে এবং দুই রাজ্যের দূরত্ব অত্যধিক হওয়া হেতু পরস্পর সম্পর্কে জানাশোনার ঘাটতিজনিত কারণে ইউএসএ বা ভারতের দুই রাজ্যের জনগণের মধ্যে বিদ্বেষ থাকতে পারে, অবিশ্বাস থাকতে পারে। দূরত্ব কম হওয়ার কারণে এবং ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এক ও অভিন্ন হওয়ার কারণে, এক অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে নিয়ে অন্য অঞ্চলের অধিবাসীদের বিদ্রূপ করার সুযোগ বাংলাদেশে থাকার কথা না। তদুপরি বাংলাদেশের এক জেলার অধিবাসীরা অন্য জেলার অধিবাসীদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে যে পরিমাণ উগ্র ঘৃণা লালন করেন, এমনকি বিয়ের বিজ্ঞাপনে পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কয়েকটি জেলার অধিবাসীদের আবেদন যে নিষিদ্ধ করে রাখেন; তা নেহায়েতই উন্মাদ আচরণ। নিজের জেলাকে সেরা প্রমাণিত করার জন্য এবং অন্য তেষট্টি জেলাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য সজ্ঞানে-অজ্ঞানে যে পরিমাণ কাদা আমরা প্রতিদিন ছুড়ি, সে পরিমাণ কাদা পদ্মা-মেঘনা-যমুনার তলদেশে সম্মিলিতভাবে আছে কি না; সন্দেহ আছে। অন্য অঞ্চলের প্রতি বিদ্বেষ লালন এবং নিজ অঞ্চলের কারো বিচ্ছিন্ন অর্জনের গৌরবে ভাগ বসানোর মানসিকতার মাঝে সবিশেষ পার্থক্য নেই।

পুনশ্চ : আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন— আমার আপেক্ষিকতা তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হলে জার্মানি আমাকে জার্মান হিশেবে দাবি করবে, আর ফ্রান্স বলবে আমি পুরো বিশ্বের নাগরিক। কিন্তু তত্ত্বটা ভুল প্রমাণিত হলে ফ্রান্স বলবে আমি একজন জার্মান আর জার্মানি বলবে আমি হলাম ইহুদি।

আখতারুজ্জামান আজাদ
বই : আপনি তখন কোথায় ছিলেন
২৯ মে ২০১৮

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button