সিনেমা হলের গলি

ছুটির দিনে দেখার মতো পাঁচ সিনেমা

In Cold Blood (1967): ১৯৫৯ সালে আমেরিকার একটি মফস্বল শহরে গা হিম করা এক খুনের ঘটনা ঘটে। শহরতলীর সেই নির্জন বাড়িতে অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ এবং ভদ্র সেই পরিবারের সব সদস্যকে পরেরদিন সকালে মরে পড়ে থাকতে দেখে সবাই আঁৎকে ওঠে। এই জঘন্য কাজ করলো কারা? খুনীদের নাম হলো পেরি স্মিথ এবং রিচার্ড হিচকক।

তবে খুন করার উদ্দেশ্য নিয়ে তারা বাড়িটিতে যায় নি। তারা গিয়েছিলো ডাকাতি করতে। এক মাস ধরে প্ল্যান করছিলো এই অপরাধটি সংগঠন করার জন্যে। খবর নিয়ে জেনেছিলো যে বাড়িটিতে সিন্দুকে প্রচুর টাকা আছে। এই টাকা নিয়ে তারা মেক্সিকো চলে যাবে, নতুন জীবন শুরু করবে। কিন্তু ডাকাতি করতে গিয়ে তারা দেখলো, বাসায় কোন টাকা পয়সাই নেই। সর্বসাকুল্যে ৪১ ডলার আর একটি রেডিও নিয়ে তারা গাড়ি করে চলতে লাগলো। আর হ্যাঁ, আসার আগে পেরি স্মিথ সবাইকে খুন করে এলো। যদিও খুন করার কোনই কারণ ছিলো না। পরিবারের সদস্যরা কেউ কোন অসহযোগিতা করেনি, প্রতিরোধ করেনি, চালাকি করেনি। পেরি আর রিচার্ড কথা দিয়েছিলো সবকিছু ঠিকঠাক করে বললে তাদের কোন ক্ষতি করবে না। তারপরেও কেন এতগুলি নিরীহ প্রাণ কেড়ে নেয়া হলো?

সত্যি ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি নানা দিক দিয়েই বিশেষ। খুনের রাতের ঘটনার চিত্রায়ন দেখে গা শিউরে উঠবে, অস্বস্তি জাগবে। রিচার্ড এবং পেরির অপরাধী মনের চিত্রায়ন নিখুঁত, তাদের গাড়ি করে রোড ট্রিপ দিয়ে চলা এবং পুলিশের ফাঁদে ধরা পড়া রোমাঞ্চ জাগাবে।

রেটিং ৮.৫/১০

Capote (2005): In Cold Blood দেখার পর এই সিনেমাটি অবশ্যই দেখবেন। In Cold Blood যদি নাও দেখেন, তাও অবশ্যই দেখবেন। In Cold Blood সিনেমাটি তৈরি হয়েছিলো ট্রুম্যান ক্যাপোটির একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে।উপন্যাসটি লিখতে তিনি দীর্ঘ চার বছর সময় নিয়েছেন। উপন্যাসের কাজে খুনী পেরি স্মিথের সাথে কথা বলতে বলতে তার সাথে এক ধরণের হৃদ্যতা গড়ে ওঠে ক্যাপোটির। এই হৃদ্যতা থেকে জন্ম নেয় এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকটের।

তার উপন্যাসটি সার্থকভাবে লিখতে হলে পেরি স্মিথের সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে যে রাতে সে খুন করে, সে রাতের নিখুঁত বর্ণনাটা পেলে সে একটা মাস্টারপিস লিখতে পারে। কিন্তু পেরি এটি বলতে চায় না মোটেও। কারণ, এতে করে তার সম্পর্কে মানুষের ‘ভুল’ ধারণা জন্মাতে পারে। পেরি ডেথ রোতে ছিলো দীর্ঘ পাঁচ বছর। একের পর এক আপিল করেছে, প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই সময়টা সে আশাতে ছিলো তার বন্ধু লেখক ক্যাপোটি তাকে ছাড়িয়ে আনার জন্যে সবরকম সাহায্য করবে।

এদিকে খুনের বর্ণনা এবং কারণ জানার পর ক্যাপোটির লেখা তরতরিয়ে এগুতে থাকে, ওদিকে পেরি এবং রিচার্ডের আপিল সুপ্রিম কোটে ঝুলে আছে। যদি এবার তাদের খালাস হয়ে যায়? তাহলে ক্যাপোটির কী হবে? তার চার বছরের কষ্টের কোনো মূল্যই থাকবে না। তাহলে কি ক্যাপোটি চায় যে পেরি স্মিথের ফাঁসি হোক? কিন্তু পেরি স্মিথ যে বিশ্বাস করে তাকে, বিশ্বাস করে সে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবে, কারণ তার ভয়ংকর ছোটবেলা সম্পর্কে ক্যাপোটি সব জানে, সে জানে ইচ্ছে করে সে খুন করে নি। এই অবস্থায় ক্যাপোটি কী করবে? দুর্দান্ত সিনেমা, ক্যাপোটির চরিত্রে ফিলিপ সিমুর হফম্যানের দুর্দান্ত অভিনয়। মাস্ট সি। হফম্যান এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে অস্কার পেয়েছিলেন।

রেটিং- ৯.৫/১০

The Virgin Spring (1960): সুইডিশ পরিচালক বার্গম্যানের একটি মাস্টারপিস। মধ্যযুগের সুইডেনে একটি ধার্মিক পরিবারের অতি আদরের মেয়ে গির্জায় ফুল দিতে যায় তার সহকারীকে নিয়ে। সেই মেয়ে সুন্দর, নিষ্পাপ, তার ভেতর কোন পাপ নেই, সে সবাইকে বিশ্বাস করে, সবার জন্যে তার মনের ভেতর মায়া। পথিমধ্যে একদল ভবঘুরে মুসাফিরের সাথে তার পরিচয় হয়। তাদের সাথেও সে গল্পে মেতে ওঠে। কিন্তু প্রতিদান হিসেবে তাকে ধর্ষিত ও নিহত হতে হয়। এই খুনীর দল আবার ঘুরতে ঘুরতে মেয়েটির বাড়িতেই চলে আসে আশ্রয়ের জন্যে। তারপর? কাহিনীটা সাধারণ রিভেঞ্জ থ্রিলারের মত। কিন্তু এটা সাধারণ রিভেঞ্জ থ্রিলার নয়। এটি বার্গম্যানের সিনেমা! সিম্বল এবং স্পিরিচুয়ালিটিতে থাকা এক ডিপ্রেসিভ জার্নি। মন ভালো থাকলে এই সিনেমা দেখার দরকার নেই, খুব মন খারাপ করা সিনেমা।

রেটিং ৯/১০

Threads (1984): আপনি এইচবিও আলোচিত মিনি সিরিজ চেরেনোবিল দেখছেন তো? তাহলে এটিও দেখুন। বৃটেনের শেফিল্ড নামের এক শহরের কাহিনী। আমরা দেখতে পাই এক মিষ্টি যুগলকে। জিমি এবং রুথ। মধ্যবিত্ত, ভালো ঘরের ছেলে-মেয়ে তারা। বয়স তাদের খুবই কম। কিন্তু এর মধ্যেই রুথ প্রেগনেন্ট হয়ে গেছে। নাহ, এটা মোটেও সংকট নয়। জিমি তাকে বিয়ে করবে।

এসব বলা অর্থহীন। কারণ এগুলি এই সিনেমার মূল অনুষঙ্গ নয়। রেডিও এবং টেলিভিশনে ক্রমাগত একটি যুদ্ধাবস্থার কথা বলা হচ্ছে। আমেরিকা, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য বিভিন্ন জায়গায় নানারকম টেনশন চলছে। শেফিল্ড শহরের ওপর দিয়ে মাঝেমধ্যেই যুদ্ধবিমান উড়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। শহরের মানুষজন প্রথমদিকে এসব নিয়ে চিন্তিত ছিলো না মোটেও। যুদ্ধবিমান যেতে দেখলে তাকিয়ে দেখে পরক্ষণেই অন্য বিষয় নিয়ে ভাবতো, রেডিওতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার কথা শোনালে তারা চ্যানেল পাল্টে খেলার খবর শুনতো। কিন্তু ধীরে ধীরে সংকট গুরুতর আকার ধারণ করতে লাগলো। খাদ্য, পানীয় এবং বিদ্যুতের সরবরাহ সীমিত হয়ে এলো, রেডিওতে প্রচার করা হতে থাকলো বোমা পড়লে কী করণীয়। এবং একসময় সুন্দর শহরটিতে নিউক্লিয়ার বোমা আঘাত হানলো। সে এক ভয়ংকর বিভীষিকা, অবর্ণনীয় কষ্ট। একেকটা দিন যায়, একেকটা সপ্তাহ যায়, আর মানুষ উপভোগ করতে থাকে সভ্যতার উপহার! প্রতিটা দিন আগের দিনের চেয়ে খারাপ। এভাবে কতদিন টিকে থাকা যাবে? ভবিষ্যত প্রজন্মের কী হবে? সভ্যতার গন্তব্য কোথায়? অনেক প্রশ্ন আর অনেক বিষাদে ছেয়ে যাবে মন।

রেটিং ৯/১০

The Woman (2011): সিনেমাটিতে একজন গৃহকর্তা শিকার করতে গিয়ে এক বুনো মহিলাকে ধরে আনেন। সভ্যতার কোনো ছাপ তার মধ্যে নেই। পশুদের মতো জীবনযাপন করে সে। গৃহকর্তার উদ্দেশ্য, তাকে একটু সভ্য ভব্য করে গড়ে তুলবেন। বাসায় তার ওপর কোন কথা চলে না। তার স্ত্রী তাকে খুব মান্য করে, কিশোরী মেয়েটি ভয়ে তটস্থ, কিশোর ছেলের মধ্যে সোশিওপ্যাথের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, আর বাচ্চা মেয়েটি তো একদম শিশু! বুনো মহিলাটিকে নিয়ে এসে বেঁধে রেখে গৃহকর্তা তাকে একটু পরখ করতে দেখে প্রথমেই হাতের আধখানা আঙ্গুল হারালেন। এতে অবশ্য তার বিশেষ প্রতিক্রিয়া হলো না। যেন একটু সরে গেছে আর কী। বেশ বিরক্ত হয়েছিলাম এমন অদ্ভুত আর অবাস্তব চরিত্রায়নে। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর বুঝলাম, সিনেমাটি অন্যান্য হলিউডি স্ল্যাশারের মতো না, একদমই না!

এর টুইস্টগুলি একদমই ভড়কে দেয়া, যা ফরমুলার সাথে মেলে না। যেমন বলা যায়, হোস্টেজ সাইকো মুভিতে আমরা সাইকোপ্যাথ চরিত্রে আমরা যেমন দেখি, এই পরিবারের কর্তা কিন্তু মোটেও তেমন না! তার সুন্দর একটি বাড়ি আছে, সুন্দর পরিবার আছে, সুন্দর একটি কাজ আছে, তিনি তার পরিবারের প্রতি যত্নশীল, এদিকে অবলীলায় পরিবারের সামনে বিভৎস সব কাজ করে যাচ্ছেন। পরিবারের মানুষেরাও এতে খুব যে গা করছে তা না, কারণ, তাদের তো খেয়ে পরে ভালোভাবেই চলে যাচ্ছে! বুনো মেয়েটিকে সভ্য করতে চাওয়া এই সভ্যতা আসলে কতটুকু সভ্য? বেশ উপভোগ্য সিনেমা, উপভোগ্য মেসেজ, এবং সাথে আছে প্রচুর রক্ত এবং বুনো মহিলার গা শিউরানো চিৎকার।

রেটিং ৭.৫/১০

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button