ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ট্রেন দুর্ঘটনা, মানবিক কুলাউড়াবাসী এবং টর্চ জ্বেলে আহত মানুষের খোঁজে একজন জাহাঙ্গীর হোসেন!

বরমচালে উল্টে যাওয়া ট্রেন পড়ে আছে। এখন সব নিস্তব্ধ৷ মানুষের কান্না, হাহাকার, উৎকন্ঠা পেরিয়ে এখন সময়টা যেন সেখানে থমকে আছে। চারদিক থেকে যেসব শব্দ কানে লাগছে সেসব যেন ঝিঁঝি পোকার শব্দের মতো একঘেয়ে। প্রাণঘাতী দূর্ঘটনাস্থলে এখন কয়েকজন মানুষ কেবল প্রাণের সন্ধ্যান করে যাচ্ছেন। রাত ভোর হয়ে যাচ্ছে। রাতের নিকষ আঁধারেই তারা ছুটে এসেছিলেন এখানটায়। খুঁজে খুঁজে উদ্ধার করেছেন আহত যাত্রীদের। ব্যাপারটা বোধহয় নেশায় ধরে গেছে তাদের। মানুষের ভাল করাটাও কারো কারো নেশা।

তেমনি একজন মানু্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন। তাকে ভোররাতে দেখা গেল উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের সামনে। হাঁটু-সমান পানিতে টর্চলাইটের আলো ফেলে দেখছেন ধুমড়ে মুচড়ে যাওয়া ট্রেনের বগি। কী খুঁজছেন—জানতে চাইতেই বললেন, ‘আহত মানুষ’।

উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন দূর্ঘটনা
উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণকারী জাহাঙ্গীর হোসেন। ছবি- প্রথম আলো

শুধু জাহাঙ্গীর হোসেন নন, এমন মানবিক হৃদয় নিয়ে সেখানটায় হাজির ছিলেন কুলাউড়ার ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামও। ভদ্রলোকের গলাও ভেঙ্গে গেছে চিৎকার করতে করতে। সারারাতের উদ্ধারকাজে নির্ঘুম কাটিয়ে সত্যিকারের জনসেবকের মতো কাজ করছিলেন তিনি। আপনি যদি সেদিন দূর্ঘটনাস্থলে থাকতেন আপনার চোখ হয়ত পড়তো এক গ্রামীন গৃহবধূর দিকেও। তিনি ফ্লাক্স হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাপারটা কি! তেমন কিছু না আবার অনেক কিছু। এই নারী ফ্লাক্স হাতে নিয়ে তৈরি ছিলেন কারণ তার কেবলই মনে হচ্ছিলো, সাহসী উদ্ধারকারীদের কেউ যদি চা খেতে চায়? তিনি উদ্ধারকাজে সরাসরি যুক্ত না থেকেও উদ্ধারকাজের একজন হয়ে গেছেন এদিন।

আপনি অবাক হয়ে সেদিন লক্ষ্য করতেন, উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া স্থানীয় মানুষ শুধু আহতদের নিরাপদে বের করে আনার কাজেই থেমে থাকেনি, নিজেদের সাধ্যমতো একজন দুজন আহত মানুষকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গেছে। মধ্যরাতে সেবার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, খাবার দিয়েছে।

গত রবিবার রাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বরমচল স্টেশন অতিক্রমকালে উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি ভয়ংকর দূর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। স্টেশন সংলগ্ন বড়ছড়া রেল ব্রিজের ওপর এলে বিকট শব্দে ছিটকে পড়ে ৩টি বগি, এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন নারীসহ কয়েকজন যাত্রী। আহত হন প্রায় দুই শতাধিক যাত্রী। দূর্ঘটনার পর স্থানীয় এক যুবক ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দিয়ে পুলিশকে দূর্ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন। উদ্ধার তৎপরতায় পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস অংশ নিতে ছুটে আসে দ্রুতই।

উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন দূর্ঘটনা
photo source – Dhaka Tribune

তবে তার চেয়ে বেশি প্রাথমিক অবস্থায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সেখানকার স্থানীয় মানুষ। মসজিদের মাইকে এই দূর্ঘটনার খবর জানানো হলে স্থানীয় মানুষ দূর্ঘটনাস্থলে হাজির হন। তারা ট্রেন থেকে আহত মানুষদের বের করে নিয়ে আসার কাজে লেগে পড়েন। কখনো কখনো হয়ত অতিরিক্ত জনতার জন্য উদ্ধার কাজ কিছুটা ব্যহত হয়েছে, তারপরেও কুলাউড়াবাসীর মানবিক প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। অত রাতে তারা এগিয়ে না এলে উদ্ধার কাজ যথেষ্ট প্রলম্বিত হতে পারত।

দূর্ঘটনা-কবলিত ট্রেনের ‘চ’ বগির যাত্রী মিজানুর রহমান ঘটনার বিবরণ দেন এভাবে, “স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় আমরা প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। তারা এসে আমাদের উদ্ধার করে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। অক্ষতদের নিজেদের বাড়িঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা তাদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।”

এই দূর্ঘটনার পর প্রশাসনের দায়িত্বশীল লোকজনের রেল খাতকে ঘিরে যে অবহেলা তা নিয়ে অনেক লেখালেখি হচ্ছে। রেলমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়েও হাসাহাসি হচ্ছে। তদন্ত কমিটি ঘটিত হয়েছে, যার রিপোর্ট কবে আসবে কেউ জানে না। আসলেও তদন্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন কখনো হবে কিনা তাও বহু দূরের বিষয়। হতাশাজনক এত চক্রের ভেতরে কুলাউড়াবাসীর মানবিক হাত প্রসারিত করার গল্পটা কেবল একটু প্রশান্তি জাগায়। একজন জাহাঙ্গীর হোসেনকে তাই খুব আপন লাগে। তার টর্চের আলোকে তাই মানবিকতার আলো জ্বলা বাতিঘর মনে হয়।

হ্যা, ঘুষ দুর্নীতি আর চুরি যেমন বাংলাদেশ, তার থেকে বেশি এই জাহাঙ্গীর হোসেনের মহানুভবতা, ওই গৃহবধুর কলিজার ভেতর থেকে উঠে আসা এই আন্তরিকতাও বাংলাদেশ। সমগ্র দেশের পক্ষ থেকে কুলাউড়ার ঘটনায় উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া সিলোটিদের সালাম শ্রদ্ধা আর ভালবাসা।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button