অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

যে দেশগুলোর নাম হয়তো আগে কখনও শোনেননি!

একবার ম্যারাডোনা এক মন্তব্য করে তাঁর বাংলাদেশী ভক্তদের চটিয়ে দিয়েছিলেন।

আমাদের দেশে বেশ হৈ হল্লা হলো এটি নিয়ে। ম্যারাডোনা মন্তব্য করেছিলেন, তিনি নাকি বাংলাদেশের নাম কখনও শোনেননি! ব্যাস। এতেই বাজার জমে গেছে।

সুজলা সুফলা এই আমার প্রিয় বাংলাদেশ এমনিতেই বিপ্লবীদের স্বর্গরাজ্য। ম্যারাডোনার কথায় তো বিপ্লবীদের কান গরম হয়ে গেলো। মাথা ঘুরে গেলো। হাত চুলকাতে শুরু করলো। তারা তীব্র প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠলেন। অবশ্য, এটা যে খুব অস্বাভাবিক তাও না।  নিজের দেশের অপমান কে কবে সহ্য করেছে!

সে ঘটনা শোনার পর আমি চিন্তা করলাম, আচ্ছা ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার ভদ্রলোক। তাদের বোধহয় সাধারণ জ্ঞ্যান এর বই সারাদিন মাথা ঢুলে ঢুলে মুখস্থ করা লাগে না, এজন্যে হয়ত নাও শুনতে পারে বাংলাদেশের নাম। তবে শোনা উচিৎ ছিলো। যাই হোক, আমি নিজে জানি তো সব দেশের নাম? জানার চেষ্টা করি। এক সুযোগে হালকা জ্ঞ্যানের চর্চা হয়ে যাবে। একটু ঘাটাঘাটি শুরু করলাম। কিন্তু সব দেশের নাম জানা তো সহজ কথা নয়।

এই পৃথিবীতে সব মিলিয়ে ২০০টির বেশি দেশ আছে। বেশিরভাগ দেশের নামই একবার হলেও হয়ত শুনেছি। তবুও, এমন কয়েকটা দেশ আছে যার কথা খুব কম মানুষই জানেন। আমি নিজেও শুনিনি অনেকগুলো দেশের নাম।

জানবো কিভাবে, শুনবো কিভাবে! এই দেশগুলো’র অবস্থা অনেকটা খালি চোখে দেখা না যাওয়ার মতো! এসব দেশ এত ছোট যে কয়েকটি দেশে মাত্র অল্প কয়েকটি পরিবার বসবাস করেন। কিছু দেশের আয়তন আবার এতই ক্ষুদ্র যে, বিশ্ব মানচিত্রে হয়ত তাদেরকে আলাদা করে চোখেই পড়বে না। একা একা জেনে মজা নেই। এগিয়ে চলো পাঠকদের জন্য এমনই দশটি বিশেষ ক্ষুদ্র দেশের পরিচয় দেয়া হলো-

পালাউঃ পালাউ নামটি কি আগে কখনো শুনেছেন? এগিয়ে চলো’র নিয়মিত পাঠক হলে অবশ্য শুনতে পারেন। কারণ, পালাউ নামক দেশের এক বাংলাদেশি ফুটবল ক্লাবের গল্প! নামে একটি ফিচার এগিয়ে চলো’তে প্রকাশিত হয়েছিলো।

তবুও এই দেশটি অনেকের কাছে অজানা। যার আয়তন মাত্র ৪৩৯ বর্গ কিলোমিটার।  জনসংখ্যা সর্বসাকুল্যে ২২ হাজারের মতো। রিপাবলিক অব পালাউ একটি দ্বীপরাস্ট্র যা ৩০০ টি বিভিন্ন আকারের দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। পালাউ দেশটি অত্যন্ত চমৎকার। দেশটির রেইন ফরেস্টগুলোতে অদ্ভুত সুন্দর বৃক্ষরাজি আর পাখিতে ভরপুর। এই জলবেষ্টিত দেশটিতে ১৩০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় হাঙ্গরের এর বসবাস। কিন্তু দেশটির সবচেয়ে অসাধারণ ব্যাপার হচ্ছে লেকগুলো। যে লেকগুলোতে প্রায় ২০ লক্ষ জেলি ফিশ আছে!

নিউইঃ নিউই হচ্ছে ওশেনিয়ার ছোট্ট একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। যার আয়তন ২৬১.৪৬ বর্গ কিলো মিটার। আর জনসংখ্যা ১১৯০ জন!

অনেক সুন্দর একটি দেশ হলেও সেখানে পর্যটন বেশি একটা জনপ্রিয়তা লাভ করেনি এখনো। ফলে খুব কম মানুষই দেশটি সম্পর্কে জানে। দেশটি মূলত বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল। তাদেরকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে নিউজিল্যান্ড। ছোট্ট একটি গ্রামই হচ্ছে নিউই’র রাজধানী। অনেক ছোট হলেও দেশটির নিজস্ব এয়ারপোর্ট আছে। আর পুরো দেশের জন্যে আছে একটা সুপারমার্কেট!

সেইন্ট কিটস এন্ড নেভিসঃ এই দেশটির আয়তন নিউই’র সমান-২৬১ বর্গ কি.মি। তবে জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশিই- ৫২৩২৯ মানুষ এদেশে বসবাস করেন। এই দেশটি দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত। একটা দ্বীপের নাম সেইন্ট কিটস, আরেকটা নেভিস। দুইটা মিলিয়ে নামকরণ হয়েছে সেইন্ট কিটস এন্ড নেভিস।

এই দেশের আয়ের উৎসটা কিছুটা ব্যাতিক্রম। বিনিয়োগকারীদেরকে সিটিজেনশীপ দেয়ার মাধ্যমে এই দেশ আয় করে থাকে। যেমনঃ কেউ যদি লোকাল চিনি শিল্পে আড়াই লাখ ডলার বিনিয়োগ করে সে দেশটার সিটিজেনশীপ পাবে। আর এই বিনিয়োগ থেকে আয় করে সেইন্ট কিটস এন্ড নেভিস। আরেকটা উপায় আছে সিটিজেনশীপের। কেউ দুইটা দ্বীপের যেকোনো একটা থেকে চার লাখ ডলার মূল্যের কোনো সম্পদ ক্রয় করলে তাকে সিটিজেনশীপ দেয়া হয়।

দ্যা প্রিন্সিপালিটি অফ হার্ট রিভারঃ এই দেশকে বলা হয় মাইক্রো ন্যাশন অথবা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। কতটা ক্ষুদ্র তার নমুনা দেই। এই দেশের জনসংখ্যা মাত্র ৩০ জন। ভুল পড়েন নি, আসলেই ৭৫ বর্গ কি.মি সীমানার এই দেশে মাত্র ৩০ জন মানুষ থাকে।

এই দেশটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে লিওনার্দ ক্যাসলে’র হাত ধরে, যিনি তার ফার্মকে একটি নতুন স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা দিয়ে দেশটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও এই দেশটিকে অন্য কোনো স্টেট স্বীকৃতি দেয় নি। কিন্তু জেনে অবাক হবেন, এই ছোট দেশটিরও নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা আছে, স্ট্যাম্প আছে, পাসপোর্ট আছে।

টুভালুঃ তুভালু পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশগুলোর একটি, শুধু তা-ই নয় এটি পৃথিবীর গরীব দেশগুলোর একটি। ২৬ বর্গ কি.মি আয়তনের দেশে থাকেন প্রায় ১১ হাজার মানুষ। দেশটার অর্থনৈতিক অবস্থা আরো বেশি খারাপ হতে পারতো। তবে, কোনো মতে চলছে এর কারণ, তাদেরকে ইন্টারনেট ডোমেইন দেয়া হয়েছে .tv নামে। এখান থেকেই একটা মোটামুটি ভালো অর্থ তারা পায়,তাদের বাজেটের জন্যে।

নাউরুঃ নাউরু তুভালুর চেয়েও ছোট আয়তনে। ২১ বর্গ কি.মি। দেশটির জনসংখ্যা ৯৫৯১ জন। নাউরু এই পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র স্বাধীন প্রজাতন্ত্র এবং সবচেয়ে ক্ষুদ্র দ্বীপ। দেশটির কোনো রাজধানী নেই, নেই কোনো যাতায়াত ব্যবস্থাও। পরিবেশগত সমস্যার কারণে দেশটি পর্যটনে একটুও সুবিধা করতে পারেনি।

একটা মজার তথ্য দেই। নাউরুকে কেউ কেউ মোটা মানুষের দেশও বলে। দেশটিতে গেলে আপনার চোখে পড়বে বিচিত্র সাইজের মোটা মানুষ। আহারে, এই গরীব দেশটার ৭০ ভাগ মানুষই স্থূলকায়!

দ্যা প্রিন্সিপালিটি অফ স্যাবরগাঃ এটিও আরেকটি মাইক্রো ন্যাশনের উদাহরণ। এই অস্বীকৃত দেশটির আয়তন মাত্র ৪.৯১ বর্গ কি.মি! আর জনসংখ্যা ৩১২ জন।

প্রথম মার্সেলো নামের এক ব্যাক্তির শাসনে ইতালির এক এলাকায় অবস্থিত এই দেশটি চলে। এটি মূলত একটি গ্রাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দেশটির আর্মি বাহিনী আছে। বাহিনীর সদস্য কত শুনলে হাসি আসতে পারে। তিনজন! এই তিনজন এর একজন আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, বাকি দুইজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বর্ডার গার্ড হিসেবে।

মিলিটারি অর্ডার অফ মাল্টাঃ ভ্যাটিকান সিটি ছাড়াও রোমে আরেকটা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র আছে। সেটি হচ্ছে মিলিটারি অর্ডার অফ মাল্টা,যে দেশটির আয়তন ০.০১২ বর্গ কি.মি। দেশটির নিজস্ব মুদ্রা আছে, স্ট্যাম্প, ওয়েবসাইট, গাড়ির নাম্বার, পাসপোর্টও আছে। তবে, এই দেশটিতে মাত্র তিনজন মানুষের কাছে মিলিটারি অর্ডার অফ মাল্টার পাসপোর্ট আছে।

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ পাসপোর্ট হচ্ছে এই দেশের পাসপোর্ট।   খোলাসা করে বলতে গেলে বলতে হয়, এই দেশটি মূলত একটি চ্যারিটি সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকে এই দেশের অধীনে থাকা বিভিন্ন লোকেরা। এই দেশের অধীনে আছে ১৩৫০০ জন নাইটস, ৮০০০০ ভলান্টিয়ার এবং ২৫০০০ কর্মচারী যারা চিকিৎসা সেবা দেয়ার কাজে নিয়োজিত।

দ্যা প্রিন্সিপালিটি অফ সিল্যান্ডঃ এটিও একটি অস্বীকৃত দেশ। গ্রেট ব্রিটেনের উপকূল থেকে ৬ মাইল দূরে এর অবস্থান। জনসংখ্যা মাত্র ২৭, আয়তন ০.০০৪ বর্গ কি.মি। এই দেশটির সরকার ব্যবস্থা পরিচালনা করেন একজন স্বঘোষিত রাজ্য শাসক।

রিপাবলিক অব মোলোসিয়াঃ আরেকটি স্বঘোষিত রাষ্ট্রের উদাহরণ রিপাবলিক অব মোলোসিয়া। এই মাইক্রো ন্যাশন বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন কেভিন বাগ। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদার দিকে এই রাষ্ট্রটির অবস্থান। আয়তন ০.০৫৫ বর্গ কি.মি আর জনসংখ্যার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না, তবুও বলি মাত্র ৭ জন!

এই সাত জন কারা? কেভিন বাগ আর তার পরিবার, তিনটা কুকুর, একটা বিড়াল আর একটা ইঁদুর—এই হচ্ছে অবস্থা! তবে তাই বলে দেশটাকে অবহেলা করা যাবে না। কারণ, তাদেরও নিজস্ব জাতীয় সংগীত আছে, জাতীয়তার প্রতীক আছে, পতাকা আছে,পাসপোর্ট ও আছে। আবার আইনও আছে। আইনে বলা আছে, এই দেশ সিরিয়াস ধরণের অপরাধ করার জায়গা না। অপরাধী যে-ই হোক তারে ছাড়াছাড়ি নাই, ধুমধাম করে ফাঁসি দেয়া হবে!

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Back to top button