ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণে উগান্ডা সফর কিংবা জনগণের টাকা শ্রাদ্ধ উৎসব!

উগান্ডায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ২৭ জন কর্মকর্তা গেছেন প্রশিক্ষণ নিতে। নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণ নিতে তাদের সাথে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আর দপ্তরের আরো ১৪ জন কর্মকর্তাও উগান্ডা সফর করছেন।

অথচ, উগান্ডার জনগণের একটা বিশাল অংশ নিজেরাই নিরাপদ পানি হতে বঞ্চিত। সেদেশে ৭৫ ভাগ মানুষের নেই উন্নত পয়োনিষ্কাশন সুবিধা। এমন একটি দেশে আমাদের কর্মকর্তারা যখন নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণ নিতে যায়, তখন আমরা কেমন নিরাপদ পানির আশা করতে পারি – বুঝতেই পারছেন!

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চট্টগ্রাম ওয়াসা একটি প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে যার নাম ‘চিটাগং ওয়াটার সাপ্লাই ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড স্যানিটেশন প্রজেক্ট’। এই প্রজেক্টে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে উগান্ডার ‘ন্যাশনাল ওয়াটার অ্যান্ড স্যুয়ারেজ করপোরেশন’। এই পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি এই প্রজেক্ট থেকে পাচ্ছে ১১০ কোটি টাকা।

মূলত এই প্রতিষ্ঠানটিই চার ভাগে ওয়াসা ও মন্ত্রণালয়ের ৪১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের দেশে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে গেছে। একই প্রকল্পের অধীনে নেদারল্যান্ডসেও গেছেন ১৫ জন কর্মকর্তা।

যদিও খোদ ওয়াসা বোর্ডের কয়েকজন সদস্যই এই উগান্ডা ভ্রমণকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তারা এই সফরকে দেখছেন ‘আনন্দ ভ্রমণ’ হিসেবে। বাস্তবতাও কি তা-ই নয়?

উগান্ডা যদি উন্নত একটি দেশ হতো কিংবা সত্যিই যদি তাদের পানি নিরাপদ রাখার কৌশল কার্যকর হতো, তাদের দেশের জনগণ সুপেয় নিরাপদ পানি পেয়ে সন্তুষ্ট থাকতো – তাহলে হয়ত এই সফরের একটি যৌক্তিকতা আমরা দাঁড় করাতে পারতাম। কিন্তু, বর্তমান প্রেক্ষিতে এই সফরটিকে ‘আনন্দ ভ্রমণ’ এবং টাকা শ্রাদ্ধ উৎসব ছাড়া আর কিছু বলা যায় বলে মনে হচ্ছে না৷

ইদানিং যেকোনো ছুতায় বিদেশ সফর একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়দিন আগে শোনা গেছে পুকুর খনন শিখতেও নাকি বিদেশ সফর হচ্ছে! এসব ফাজলামোর অর্থায়ন আসে কোত্থেকে? এসব তো ঘুরে ফিরে জনগণেরই টাকা, তাই না? জনগণের অর্থে এমন আমোদ প্রমোদের উৎসব হচ্ছে- এসবের মানে কি?

বিমানে ওড়া, ঘোরাফেরা, স্পীডবোটে চড়া, ভিক্টোরিয়া হৃদে ঘুরতে ঘুরতে দুই একটা কর্মশালায় অংশ নিয়ে আবার পকেট মানি বাবদ একেকজন দুই লাখ টাকা করেও পাচ্ছেন- খুব দারুণ প্রশিক্ষণ হচ্ছে বলতেই হয়। জনগণকে বিশুদ্ধ নিরাপদ পানির জাদুকরি ফর্মুলা শিখে আসছেন তারা উগান্ডা থেকে- তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত আমাদের আসলে।

এক উপ পরিচালক আবার জানিয়েছেন তারা কি কি শিখেছেন, দেখেছেন। মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম নামের এই কর্মকর্তা বলেন, “কারিগরি দিক থেকে পানি ব্যবস্থাপনায় উগান্ডা আমাদের চেয়ে উন্নত না হলেও অফিস ব্যবস্থাপনা ও গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে। রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চট্টগ্রাম ওয়াসায় এসব বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।”

নিরাপদ পানির প্রশিক্ষণ নিতে এমন দেশেই গেছেন যেখানে মূল যে জিনিস পানি সেই পানি ব্যবস্থাপনাই উন্নত না। তারা শিখেছেন অফিস ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সেবা দেয়ার স্টাইল। মানে, হাস্যকর লাগে না? বাংলাদেশের সরকারি কর্মচারিরা গ্রাহক সেবা বোঝার আগে তাদের চাকরিটা আসলে কি, সেটা বুঝলেই অর্ধেক সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। তারা যে জনগণের জন্যে কাজ করছে এটাই ভুলে যায় অনেক সময়। এই বাংলাদেশেই এমনও হয়েছে, সরকারি চাকরিজীবীকে স্যার না ডাকায়, তারা রাগ করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন।

চট্টগ্রাম ওয়াসা সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন করে ইত্তেফাক, গত মাসে। সেখানে জানা যায়, চট্টগ্রাম ওয়াসায় বিদেশি ও সরকারের অর্থায়নে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ৭ হাজার ৬৫১ কোটি ৬ লাখ টাকা ঋণ নিতে হয়েছে। আগামী দুই বছর পর থেকে প্রকল্পের অধীনে নেওয়া ঋণ সুদে-আসলে পরিশোধ শুরু করতে হবে। এই যে উগান্ডা সফর, এতে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি টাকা। এই টাকাও কিন্তু ঋণের টাকা। প্রাথমিকভাবে এই ব্যয় বিশ্বব্যাংক বহন করলেও পরে সুদে-আসলে তা ওয়াসাকেই পরিশোধ করতে হবে।

যদি অর্থবহ সফর হতো, জনগণের জন্যেও সত্যিই কাজে আসতো, নিরাপদ পানি নিশ্চিতকরণ সম্পর্কে বাস্তবজ্ঞান লাভ হতো, তাহলে হয়ত টাকাটা উসুল হতো৷ কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে ঋণের বোঝা তো বাড়লোই, সাথে জনগণের বোঝাও বাড়লো। বিনিময়ে জনগণ পেলো কি তবে?

উগান্ডা নিরাপদ পানি প্রশিক্ষণ

বন্দর নগরী চট্টগ্রামের পানি সংকট, জলাবদ্ধতা, খোঁড়াখুঁড়ি এসব অতি পুরানো সমস্যা। এসব নিরসনে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ চোখে পড়ে কদাচিৎ। মৌখিক ফাঁপা বুলির অবশ্য অভাব হয় না। সেখানে নিরাপদ পানির মতো ইস্যু নিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে উগান্ডায় যাওয়া নাগরিকদের প্রতি অবহেলার চিত্রকেই যেন আরো বেশি করে ফুটিয়ে তোলে।

বাংলাদেশ থেকে প্রায় সব দিক থেকে পিছিয়ে থাকা উগান্ডা কেবল দুর্নীতিতে বাংলাদেশের সমান্তরাল। অদূর ভবিষ্যতে যদি একথা শুনা যায়, দুর্নীতি রোধ শিখতে কেউ উগান্ডায় প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যেমন অবাক লাগছে না, নিরাপদ পানির জন্যে উগান্ডায় প্রশিক্ষণের এই ব্যাপারটি। কারণ, এদেশে মানুষ সব খায়, সব সয়, এদেশে সব হয়..

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button