খেলা ও ধুলা

ভাবিয়া করিও ট্রল, করিয়া ভাবিও না!

বীরেন্দ্র শেবাগ যদি জানতেন, মাঠের খেলায় পাশার দান এভাবে পাল্টে যাবে, তাহলে হয়তো কোটি টাকা দিলেও ‘বেবি সিটিং’ নিয়ে সেই বিজ্ঞাপণটায় অভিনয় করতে রাজী হতেন না! ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফরে রিশভ প্যান্ট ও টিম পেইনের সেই বেবি সিটিঙের ঘটনা নিয়েই বানানো হয়েছিল ভিডিওটা। ঘরের মাঠে প্রবল প্রতাপশালী ভারতের সামনে অস্ট্রেলিয়া দলটা শিশুদের মতোই, কিংবা ভয়ে সফরকারীদের হিসু করে দেয়ার অবস্থা হয়েছে- এরকম বার্তাই ফুটে উঠেছিল সেই বিজ্ঞাপণে।

ম্যাথু হেইডেন তখন সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, বাজে অবস্থার মধ্যে দিয়ে গেলেও, অস্ট্রেলিয়াকে হালকাভাবে দেখার কিছু নেই। এই দলটা নামের ভারেও ভালো খেলতে পারে। হেইডেনের কথাটা ফলে গেছে অক্ষরে অক্ষরে, টি-২০ সিরিজে ভারতকে হোয়াইটওয়াশের পরে দারুণ এক প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস গড়ে ওয়ানডে সিরিজটাও যে নিজেদের করে নিয়েছে ক্যাঙ্গারুরা!

টি-২০ সিরিজের শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়া ছিল কোণঠাসা অবস্থায়। ক’দিন আগে ওই ভারতের কাছেই নিজেদের মাঠে টেস্ট আর ওয়ানডে সিরিজে হেরে এসেছে দলটা, এবার তো ভারতের মাঠে খেলা! স্মিথ-ওয়ার্নারবিহীন অস্ট্রেলিয়া দল এমনিতেই বেকায়দায়, তাদের অবস্থা কতটা শোচনীয় হতে পারে সেটা নিয়েই গবেষণা হচ্ছিল। দুই সিরিজেই অস্ট্রেলিয়ার হোয়াইটওয়াশ হবার সম্ভাবনা কতটা, আলোচনা হচ্ছিল সেসব বিষয়ে!

তবে টেবিলের আলাপ আর মাঠের খেলা যে এক জিনিস নয়, সেটা অস্ট্রেলিয়ার এই ‘ভঙ্গুর’ দলটাই বুঝিয়ে দিলো। একটা দল হয়ে তারা খেললো পুরোটা সফরে, দরকারের সময়ে জ্বলে উঠলেন ম্যাক্সওয়েল-খাজা-কামিন্সরা, দীর্ঘ রানখরা কাটালেন অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চও। আর সবকিছুর মিলিত ফলাফল, নিজের করা বিজ্ঞাপণের জের এখন টানতে হচ্ছে শেবাগকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক এই ভারতীয় ব্যাটসম্যানকে নিয়ে চলছে বাহারি ট্রলের মেলা! 

টি-২০ সিরিজের শুরুতেও অস্ট্রেলিয়াকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যই করছিলেন ভারতীয় ধারাভাষ্যকারেরা। হাতি কাদায় পড়লে যেমন চামচিকা লাথি মারে, সেরকম একটা অবস্থা ছিল অস্ট্রেলিয়ার। প্রথম টি-২০ তে ভারতকে হারানোর পরেও অবস্থার পরিবর্তন হলো না খুব একটা, সেটাকে ফ্লুক হিসেবেই নিয়েছিলেন অনেকে। ভারতীয় মিডিয়ার অনেকের কথাবার্তা শুনে তখন মনে হচ্ছিল, খেলাটা ভারতের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার হচ্ছে না, ভারতের প্রতিপক্ষ আসলে আফগানিস্তান!

ম্যাক্সওয়েল দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে টি-২০ সিরিজটা জেতালেন অস্ট্রেলিয়াকে, ওয়ানডে সিরিজে আবার প্রথম দুই ম্যাচেই জিতলো ভারত। এরমধ্যে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জয়ের সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হলো অস্ট্রেলিয়ার। ওয়ানডেতে ধবলধোলাই হওয়া তখন সময়ের ব্যাপার, একটা ম্যাচ হারলেই সিরিজ হাতছাড়া! দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই নাকি নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে হয়। অস্ট্রেলিয়াও সেটাই করলো।

দলে না থাকুক নিয়মিত কোন ম্যাচ উইনার, না থাকুক বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান কিংবা অলরাউন্ডার, তাতে কি? স্টিভ ওয়াহ-রিকি পন্টিং বা মাইকেল ক্লার্কের উত্তরপুরুষের বীজটা তো তাদের মধ্যেও আছে, হলুদ জার্সিটার ভারই যে অন্যরকম! তার ওপরে দুয়ারে কড়া নাড়ছে বিশ্বকাপ, এমন সময়ে ঘুমিয়ে থাকলে চলে?

উসমান খাজা পরপর দুই ম্যাচে সেঞ্চুরী হাঁকালেন, হ্যান্ডসকম্বের সেঞ্চুরীর সঙ্গে অবিশ্বাস্য এক রান চেজে ম্যাচ জেতালেন অ্যাশটন টার্নার! বল হাতে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের আটকে রাখলেন কামিন্স-জাম্পারা। রান তাড়ায় গত কয়েক বছর ধরেই ভারত অবিসংবাদিত সেরা, সেই দলটাই কিনা শেষ ম্যাচে ২৭২ রান তাড়া করতে পারলো না! আর সবকিছুর মিলিত ফলাফল? প্রথম দুই ম্যাচ হেরে ০-২ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ওয়ানডে সিরিজটা অস্ট্রেলিয়া জিতে নিলো ৩-২ ব্যবধানে! অধিনায়ক হিসেবে অ্যারন ফিঞ্চ ভারতে পা রাখার আগে জিতেছেন মোটে দুই ম্যাচ, আর ভারতে এসে টানা তিন ম্যাচ সহ সিরিজটাই জিতে নিলেন তিনি!

১৯৯৬ সালের ১৩ই মার্চের দিনটা ক্রিকেট ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে আছে ভারতীয় দর্শকদের কারণে। ইডেন গার্ডেনে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে নিজেদের দলের হার মেনে নিতে পারেনি ভারতীয়রা, ম্যাচ শেষ হবার আগেই স্টেডিয়ামে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিক তারা, বোতল ছুঁড়ে থামিয়ে দিয়েছিল খেলা, গ্যালারিতে লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়েছিল পুলিশ! ২০১৯ সালের ১৩ই মার্চ তারিখটাও সহজে ভোলার কথা নয় ভারতীয় দর্শকদের। যে দলটাকে ক’দিন আগেই তাদের মাটিতে গো-হারা হারিয়ে এল ভারত, সেই একই দলের কাছে নিজেদের দেশে এমন নাস্তানাবুদ হওয়াটা মেনে নেয়া তো সহজ নয়!

ভারতীয় মিডিয়া বেশ ক’বছর ধরেই ক্রিকেট নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি রকমের যুদ্ধাংদেহী একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করে আসছে। বিশ্বকাপের ‘মওকা মওকা’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে অস্ট্রেলিয়াকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, সবকিছুই এই তালিকায় পড়বে। হয়তো ব্যবসার খাতিরেই করা হচ্ছে এসব, মানুষেএ আগ্রহটা এসবে বাড়ে। তবে দিনশেষে স্টার ক্রিকেটের মতো চ্যানেলগুলোকে হাসির পাত্রেও পরিণত হতে হচ্ছে এসবের কারণে, সেইসাথে এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে নিজেদের ভাঁড়ে পরিণত করছেন শেবাগের মতো বিখ্যাত ক্রিকেটারেরাও। ভারতীয় দল দারুন ফর্মে আছে এটা সত্যি, কিন্ত দল হেরে গেলে যে এসব ট্রল কয়েকগুণ হয়ে ফেরত আসবে, সেসব হয়তো তারা ভেবেও দেখে না!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button