ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

জাদুর শহর ঢাকায় মুগ্ধ ট্রেভর জেমস, দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার!

ট্রেভর জেমস, ইউটিউবে যারা সময় কাটান তারা নামটি শুনামাত্রই নিশ্চয়ই চিনে ফেলেছেন তাকে! দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার ইউটিউবে অন্যতম জনপ্রিয় একটি চ্যানেল, যেখানে ট্রেভর জেমস তার ফুড ভ্লগ প্রকাশ কর থাকেন। খাবারপ্রেমীদের কাছে তিনি যে কি ভীষণ প্রিয় ব্যক্তিত্ব তা কল্পনার বাইরে। অসাধারণ এই মানুষটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান, খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেন এবং সেসব ভিডিও আকারে প্রকাশ করেন ইউটিউব, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রামে। খাবারের সাথে সাথে তিনি দেশগুলোর ঐতিহ্য সম্পর্কেও কথা বলেন টুকিটাকি, পরিচয় করিয়ে দেন প্রত্যেকটি দেশের বিখ্যাত খাবারগুলোর সাথে।

সেই ট্রেভর জেমস বাংলাদেশে এসেছেন বেশ কদিন আগে। এটা আমাদের জন্য ভীষণ দুর্দান্ত খবর একারণে যে, বাংলাদেশের ঐতিহ্য, খাবার, আতিথিয়েতাকে তিনি যদি ধারণ করেন ভিডিওতে তাহলে তার ভিডিও দেখে অনেক সম্ভাব্য ভীনদেশী পর্যটক আকৃষ্ট হবে বাংলাদেশের প্রতি৷ তারচেয়ে বড় কথা, অতিথিপরায়ণ জাতি হিসেবে আমাদের যে সুনামটুকু আমরা অর্জন করেছি, সেই অনুভূতি যদি ট্রেভর জেমসকে ছুঁয়ে যায়, তিনি নিশ্চয়ই ভিডিওতে সেটা প্রকাশ করবেন। তাতে করে বাংলাদেশকে অনেকেই ইতিবাচক একটি দৃষ্টিতে দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করবে। ফলে স্বভাবতই দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জারের আগমণে আমরা ভীষণ খুশি হয়েছিলাম।

ট্রেভর জেমস, দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার

সত্যি সত্যিই যে ট্রেভর জেমস বাংলাদেশকে এতটা ভালবেসে ফেলবেন, তার চোখে মুখে একধরণের তৃপ্তির ছাপ দেখা যাবে, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবেন এত অবলীলায় এতখানি ভাবিনি। তার ফেসবুকে পেজে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্তটা তার সেরা সিদ্ধান্ত। তিনি অবাক হয়ে গেছেন, মুগ্ধতায় তার মন ডুবে আছে। বাংলাদেশের মানুষ এতটা অতিথিপরায়ণ এটা আবিষ্কার করে এই কানাডিয়ান ভদ্রলোক ভীষণ রোমাঞ্চিত। ঢাকায় তিনি ঘুরছেন আনাচে কানাচে। এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। এখানে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার স্ট্রিট ফুড যেমন ভেলপুরি, ফুচকা, আচার ইত্যাদি খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ করতে দেখা গেছে। অনেকের সাথে হাসিমুখে সেলফি তুলেছেন দারুণ মিশুক এই মানুষটি। যেখানেই যান, যেকোনো মানুষের সাথে একেবারে মিশে যাওয়ার কি মারাত্মক দক্ষতা তার! শুনতে খুব মজা লাগছিল, যখন তিনি রিকশাওয়ালাকে হাই মামা বলছেন। যে খাবারের দোকানেই যাচ্ছেন গিয়ে একদম আপন ভঙ্গিতে, হেলো মামা বলে সম্বোধন করছেন এবং খাবার খেয়ে থাম্বস আপ দেখিয়ে বলছেন, ‘খুব ভাল, খুব ভাল, টেস্টি’!

ট্রেভর জেমস এখন মজেছেন পুরাণ ঢাকায়। জাদুর শহর এই ঢাকা মহানগরে আমরা যারা রোজকার বাসিন্দা তারা আজকাল অনেকেই নিজেদেরকে ভিক্টিম মনে করি। কি অসহ্য জ্যাম, বায়ু দূষণ, শব্দের অতি ঝংকারে মাথা ধরে যায়৷ রাস্তায় হাঁটা যায় না, সরু গলি৷ দম ফেলার জায়গা নেই কোথাও। ভীষণ ব্যস্ত এই শহর। অভ্যাসে অভ্যাসে হয়ত জাদুর শহরের জাদু অগ্রাহ্য করে বেঁচে থাকা শিখে গেছি আমরা৷ তাই ট্রেভর জেমসের চোখে যখন এই শহরের কানাগলিগুলো দেখি, ব্যস্ততা দেখি, রিকশার টুংটাং শব্দ দেখি, ট্রাফিক জ্যামের স্থবিরতা দেখি, ফুটপাতের লোভনীয় খাবারগুলো দেখি- তখন মনে হয় বাহ! কি দারুণভাবে এই শহরের মধ্যে প্রাণ আবিষ্কার করে ফেললেন একজন ট্রেভর জেমস!

ট্রেভর জেমস, দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার

দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার নামক ফেসবুক পেজে ট্রেভর জেমস বিশ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এই ভিডিওতে দেখা যায়, তার পুরাণ ঢাকা এডভেঞ্চার। বিখ্যাত বিউটি লাচ্ছির দোকানটিতে গিয়ে লাচ্ছি এবং ফালুদা খান। তাকে দেখা যায়, পুরাণ ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাকরখানির দোকানগুলোতে৷ তিনি বর্ণনাও করছিলেন কিভাবে বাকরখানি জনপ্রিয়, মোঘল আমলের এই খাবারটির প্রস্তুত প্রণালীও তিনি জানাচ্ছিলেন। বাকরখানি নিয়ে তিনি ফুটপাতের চা দোকানে গিয়ে চাও পান করেছেন। আমাদের পুরাণ ঢাকার বিখ্যাত একটি হোটেলের নাম নিরব হোটেল। ঢাকায় যারা ভোজনরসিক তাদেরকে নিরব হোটেলের পরিচয় নতুন করে দেয়ার কিছু নেই। এই বিখ্যাত হোটেলেও গেছেন দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার ট্রেভর জেমস। ত্রিশ পদের রান্না সেখানে তার সামনে উপস্থাপন করা হয়।

তিনি পুরাণ ঢাকার অলিগলি একেবারে চষে বেড়িয়েছেন। হাঁটার সময় তিনি বর্ণনা করছেন এই জায়গাতে এসে তিনি যেন হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়, চারশ বছর আগের মোঘল আমলের ঢাকায়! এই পুরাণ ঢাকার বিচিত্রতা তাকে আনন্দিত করেছে। তার অভিব্যক্তিতেই ফুটে উঠেছে বিস্ময়, আনন্দ, মুগ্ধতা৷ প্রত্যেকটা গলিতে রকমারি দোকান, বাহারি খাবার, খাদ্যের সুঘ্রাণ তাকে মাতোয়ারা করে দিচ্ছে যেন। নিরব হোটেলের ভর্তা, খাবার শুধু খাননি, তিনি কথা বলেছেন রন্ধনশিল্পীর সাথে। প্রত্যেকটি ভর্তা, তরকারিকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। নিরব হোটেলের বিখ্যাত ভর্তা সামনে থাকা সত্ত্বেও তিনি শুরু করেছিলেন মাছ দিয়ে এবং বলছিলেন, বাংলাদেশ মাছের জন্য খুব বিখ্যাত! মজার ব্যাপার হলো, তিনি খাবারগুলোর রেটিংও দিচ্ছিলেন এবং দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জারের কাছে বেশ ভালই মার্কস পেল পুরাণ ঢাকার খাবার!

ট্রেভর জেমস, দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার

পুরাণ ঢাকার আরেক বিখ্যাত খাবার হলো, হাজীর বিরিয়ানি। ট্রেভর জেমস রিকশায় চেপে গেলেন সেখানেও। হাজীর বিরিয়ানি তার কাছে ১০ এর মধ্যে ৯.৩ মার্কস পায় রেটিং হিসেবে। বাংলাদেশের ঐতিহ্য পিঠাপুলি। গ্রাম বাংলার মতো শহরে মহাসমারোহে পিঠা বানানোর আয়োজন চোখে পড়ে না কিন্তু ফুটপাতে আমরা অনেক দোকানীকে পিঠার পসরা সাজিয়ে বসতে দেখি। ট্রেভর জেমস গেলেন পিঠা খেতেও। চিতই পিঠা, ভাপা পিঠার স্বাদ নেন তিনি৷ সারাদিনের পুরাণ ঢাকার সফর সন্ধ্যায় শেষ হলো পুরাণ ঢাকার মোরগ পোলাও দিয়ে, সাথে টিকা কাবাব এবং ফিরনিও ছিল। সবচেয়ে দুর্দান্ত ছিল ট্রেভর জেমসের বর্ণনা। তিনি খাবারের নামগুলো ঠিকঠাক উচ্চারণ করতে পারছিলেন, প্রত্যেকটা মশলার নাম নিতে পারছিলেন এবং খাবারের স্বাদ সম্পর্কেও কি সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করছিলেন!

ট্রেভর জেমস, দ্যা ফুড র‍্যাঞ্জার

ট্রেভর জেমস ভিডিও শেষ করে বলছিলেন, পুরাণ ঢাকা এমন একটি জায়গা যেখানে পৃথিবীর সেরা কিছু খাবার মেলে। ভিডিও’র এক ফাঁকে তিনি এও বলেছিলেন, বাংলাদেশের এই খাবারে একবার মজে গেলে এই দেশটা ছেড়ে আপনার যেতেই মন চাইবে না। এতটা উচ্ছ্বসিত মুখ দেখেও আসলে তৃপ্তি লাগে। আমাদের দেশটা নিয়ে পৃথিবীর মানুষদের কতরকম কৌতুহল, কতরকম ধারণা। কিন্তু, ইতিবাচক কথা যখন শুনি দেশটা সম্পর্কে, যখন একজন ভিনদেশী খাবারপ্রেমী বাংলাদেশে এসে বলেন, এই দেশটায় আসা তার সেরা সিদ্ধান্ত ছিল এখন পর্যন্ত তখন গর্ব লাগে ভীষণ৷ আমাদের অনেক ত্রুটি আছে,এই সময়ে এসে বেড়ে গেছে হিংসা বিদ্বেষ। তবুও কোথাও একটা ব্যাপার আছে আমাদের মধ্যে, আমরা মেহমানদারিতে সেরা, আতিথিয়েতায় সেরা। এই অতিথিপরায়ণতা আমাদের টিকে থাকুক, ট্রেভর জেমসের মতো সকল ভীনদেশী মানুষ জানুক, একটা দেশ আছে পৃথিবীতে যারা ভালবাসতে জানে, অতিথিদের সম্মান দিতে জানে, যে দেশের খাবারের স্বাদ ঠিক ‘মায়ের মতোই ভাল’!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button