অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ওরা ‘আবেগ’ কেনে না, পৃথিবী বাঁচানোর স্বপ্ন দেখে!

কত কিছুই ভাইরাল হয়, আমরা জনসাধারণই সেসব ভাইরাল করি। এই যেমন টিফিনের টাকায় আবেগ কিনার কথা গানের লাইনে শুনেও আমরা আবেগে আক্রান্ত হই। কিন্তু, সত্যিকারের ভাইরাল হওয়ার ঘটনাগুলো চাপা পড়ে থাকে কেনো যেন। প্রবলভাবেই যে আমরা ভুল শিরোনাম এবং ভুল জায়গায় এটেনশন দিয়ে তারই বহিঃপ্রকাশ হয়ত আমাদের সেলিব্রেশনগুলো। কিন্তু, আমাদের অফলাইন এবং অনলাইন জীবনকে একটু সুস্থ রাখতে আমাদের উচিত কি নিয়ে কথা বলবো, কাকে ভাইরাল করবো সেসব নিয়ে একটু ভাবা।

যেমন আজকে মনে হয়েছে একদল স্কুল পড়ুয়া কিশোর কিশোরীর এই অসম্ভব সুন্দর কাজের কথাটা নিয়ে একটু কথা বলা প্রয়োজন। এদের কাজকে সেলিব্রেট করা, তাদের উৎসাহিত করার সাথে সাথে নিজেরাও এমন কাজে উৎসাহ নিয়ে নামার চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। তারা শিক্ষানগরী রাজশাহীর বাঘা ও চারঘাট উপজেলার শিক্ষার্থী। আপনি জেনে অবাক, বিস্মিত এবং গর্বিতও হবেন যখন জানবেন এই শিক্ষার্থীদের দল তাদের একদিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে ১ লাখ ৫ হাজার বৃক্ষ রোপণ করেছে!

এই পৃথিবী নামক গ্রহটি এখন এমনিতেই একটু বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশেষ করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের যে পূর্বাভাস আমরা শুনি, জলবায়ু সংকটের ফলে পৃথিবীর পরিণতি কেমন হতে পারে বলে আমরা জানি- জানার পরেও এনিয়ে আমাদের যতটা সোচ্চার থাকার কথা ততটা বোধহয় আমরা নই। কারণ, মানুষ বর্তমানের সুখ দুখ নিয়েই বেশি চিন্তিত। বাকির লোভে নগদ পাওনা কে ছাড়ে এই ভুবনে- ব্যাপারটা যেন অনেকটাই এমন। তাই, আজকে আমার একটা নেতিবাচক পদক্ষেপের ফলাফল ভবিষ্যৎকে কতটা প্রভাবিত করবে সেটা নিয়ে ভাবনা কাজ করে কদাচিৎ।

বৃক্ষ রোপন

আবার আজকের সামান্য একটা ছোট্ট ভালো কাজও যে সুন্দর ভবিষ্যতের বীজ বুণে দিতে পারে, এই কথাও ভাবে খুব কম লোকই। আমরা ভাবি, অনেকেই তো আছে, আমার একার এতো কিছু না ভাবলেও চলবে। কিন্তু অস্থির এই সময়ে গাঁ বাঁচিয়ে চলার সময় নেই আসলে। এই সময়টায় যত নেতিবাচক খবর আমরা শুনি, তার চেয়ে দ্বিগুণ খবর শোনা দরকার ভাল কাজের। দ্বিগুণ উদ্যমে ভালো কাজ করে যাওয়া উচিত, কেউ যদি সেই কাজের দাম প্রাথমিকভাবে নাও দেয় তবুও। সেই কাজে কেউ যদি সাহায্য নাও করে তবুও।

চাইলে ছোট পদক্ষেপও যে মহিরুহ হয়ে উঠতে পারে তারই প্রমাণ এই কিশোর প্রাণ-প্রকৃতি প্রেমীদের উদ্যোগ। তারা মাত্র একদিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে যে প্রকৃতি বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে তা রীতিমতো আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, আ লিটল স্টেপ ক্যান মেইক আনবিলিভেবল ডিফারেন্স।

রাজশাহীর শিক্ষার্থীদের এই আয়োজনের স্লোগান ছিল “সবুজের জয়গানে, এসো মিলি প্রাণে প্রাণে”। কিশোর নবীন দল যেন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে সবুজের গান গাইছে, নব পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর হয়েছে। আজকের দিনে যখন একই দিনে পত্রিকার পাতায় আমরা কিশোর গ্যাংয়ের বিকৃত কার্যকলাপের কথা পড়ে হতাশ হই, তখন আমাদের মনে একটু হলেও আশা জাগায় আরেকদল কিশোর গ্যাং হয়ে যখন জীবনের গান গায়।

টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে বৃক্ষ রোপন
Image Courtesy- Dhaka Tribune

এই কিশোররাও তো আমাদের দেশের সন্তান, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নয় এরা বর্তমানকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেয়ার কাজ করছে এই বয়সেই! আমরা এদের ভাইরাল না করলে, কাকে করবো আর? কিশোর দল প্রাণঘাতী গ্যাং নয়, বরং প্রাণের বীজ বোনার গ্যাং হয়ে উঠবে – যদি এই হয় স্বপ্ন – তবে এধরণের উদ্যোগকে উৎসাহ দেয়া এবং নিজেরাও এমন কাজে সামনে এগিয়ে আসব – এই ডিটারমিনেশন জরুরি।

‘একদিনের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে গাছ রোপন’ এটা কেবলই একদিনের আয়োজন নয়। রীতিমতো এটা এক আন্দোলন। যে আন্দোলন চলছে ২০১৫ সাল থেকে! জুবায়ের আল মাহমুদ নামক একজন তরুণ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবেলা করে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এই আন্দোলনে গত চার বছরে সারাদেশের ৭৫০টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

সর্বশেষ গত ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে একদিনে চারঘাট ও বাঘা উপজেলায় এক লাখের অধিক বৃক্ষ রোপন করা হয়। উপজেলাদ্বয়ের প্রশাসনও এতে সমর্থন এবং সহযোগিতা করেন। এটাকে তারা দেখছেন, পৃথিবীর বুকে গড়া এক ইতিহাস হিসেবে। এই গাছগুলোর বেড়ে উঠার সাথে সাথে এই প্রজন্মও একসাথে বেড়ে উঠবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট মোকাবেলা করার স্পৃহা এই বয়স থেকেই তারা অনুধাবন করতে শিখবে।

tree plant 1

জুবায়ের আল মাহমুদের এই আন্দোলনের ফলাফল হিসেবে ইতিমধ্যে সাড়ে তিনলক্ষাধিক বৃক্ষ রোপন করা হয়েছে। এরকম আন্দোলন শুধু ‘ওয়ান ম্যান স্ট্রাগল’ না হয়ে থাকুক, কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আমাদের সবাইকেই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। তাই, সবাই মিলে নিজের জায়গা থেকে সচেতনতা জরুরি, আরো জরুরি এমন ইতিবাচক আন্দোলনের গল্পকে ছড়িয়ে দেয়া, যে আন্দোলন পৃথিবী বাঁচানোর স্বপ্ন দেখে…

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button