রিডিং রুমলেখালেখি

কেউ হয় ধর্মগুরু, কেউ হয় ধর্ষক! কিন্ত কেন?

একটা ভয়ংকর মানুষ তৈরি হবার গল্প বলি। একজন ট্রাক ড্রাইভার। চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে ট্রাক লোড করে রংপুরে রওয়ানা দিল। পাশে একজন হেল্পার। লোডেড ট্রাক নিয়ে ঢাকা পৌছাতে তার একদিন লেগে যায়। দীর্ঘ পথে ৪০ কিলোমিটার পার আওয়ারে ড্রাইভ করলেও তার লেগে যায় পুরো একদিন। দীর্ঘপথ একজন ট্রাক ড্রাইভারের জন্য অসহনীয় বিরক্তিকর-ক্লান্তিকর। আমি নিজে বাইক ড্রাইভ করে ঢাকা-রংপুর যাতায়াত করেছি তিনবার। ৮০ কিলোমিটার পার আওয়ার ড্রাইভ করলেও পাঁচ জায়গায় থামতে হয়। খেতে হয়। বসে বিশ্রাম নিতে হয়। প্রবল ক্লান্তিতে একটা সময় মনে হয় কেন বাইকে আসছি। রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে বরং হেঁটে যাই।

একজন ট্রাক ড্রাইভারের ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে ভাবুন তো? ধরা যাক, সে বিবাহিত। ঘরে স্ত্রী আছে। রংপুর যেতে লাগে দুইদিন। আবার ট্রাক আনলোড করে ফিরে আসতে লাগে দুইদিন। টানা চারদিনের ব্যাপার। এরপর? ফিরে আসে। আসার সাথে সাথে আবার নতুন ট্রিপ। আবার ছোটো। ক্লান্তিকর ভ্রমণ। তাদের পরিবার হয় নামমাত্র। পরিবারের সাথে থাকা হয় না, বসে আরাম করে দুইদিন আলাপ করার সুযোগ নেই। এরা যাত্রাপথে নেশা করবে না কে করবে? নেশা করলে কী ঘটবে? ভয় কমে যাবে। ভয় কমলে সাহস বাড়বে। কোনোকিছুতেই কিছু যায় আসে না তাদের। এবার? সংসার নেই, নেশাগ্রস্থ, ভয়হীন-সাহসী। এবার?

ট্রাকড্রাইভারের কাছ থেকে লাফ দিয়ে একজন বাস ড্রাইভারের কথা ধরি। একই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে তাকেও যেতে হয়। আমরা সারারাত সিটে বাসে-শুয়ে ঘুমাই। কিন্তু ড্রাইভার? জেগে থাকে। একটানা ৩০০ কিলোমিটার ড্রাইভ করে বাংলাদেশের মতো রাস্তায়…এমন কোন পেশা আর আছে?

যাত্রাপথে ঘন্টার পর ঘণ্টা জ্যাম আছে। এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে আগাতে হয়। তবুও ড্রাইভ করতে হয়। যারা ঢাকা শহরের বাসের ড্রাইভারদের চেনেন, একবার জিজ্ঞাসা করবেন তারা কোথায় ঘুমায়। দেখলে আপনি ভয় পেয়ে যাবেন। এসব জায়গায় যে মানুষগুলো থাকে, তারা কোনোভাবেই মানসিকসিকভাবে সাউন্ড থাকতে পারে না।

এবার দূরপাল্লার ড্রাইভার বদলে লোকাল বাসগুলোর কথা ভাবি। এরা ঘুম থেকে ওঠে ভোরে। সারাদিন প্রবল গরমে, জ্যামের ভেতর হর্ণের মধ্যে ট্রিপের পর ট্রিপ দেয়। গভীর রাতে ঘরে ফেরে। অধিকাংশদের সংসার থাকে গ্রামে। কিংবা সংসার থাকলেও সেই সংসারের প্রতি মায়াবোধ ধীরেধীরে কমে যায়। বাসের ড্রাইভারই একমাত্র মানুষ, যাকে জীবনে সবচেয়ে বেশিবার গালি খেতে হয়। যে মানুষটা হাত বাড়িয়ে বাস থামিয়ে বেজায়গায় বাসে উঠে পড়ে, সেই মানুষটা সিটে বসলে বদলে যায়। আরেকজন মানুষকে উঠাতে গেলে ড্রাইভারকে গালি দেয়। সুপারভাইজারকে হুমকি দেয়।

যে মানুষটা সারাদিন এভাবে বাসভর্তি মানুষের অভিশাপ জমিয়ে যায়, সেই মানুষটার কাছ থেকে কখনোই ভালো কিছু আশা করা যায় না। ঘরের কাজের মেয়েটাকে চড় দিলে, রান্নাঘরে শরবত বানিয়ে সেই গ্লাসে একদলা থুতু মিশিয়ে বাড়িওয়ালাকে খেতে দেয়। এমন নজির দুনিয়াভর্তি। প্রত্যেকটা কাজের একটা বাইপ্রোডাক্ট আছে। সেটা কাজের মেয়ের থুতু খাওয়া কিংবা বাসের ড্রাইভারের ধর্ষক হয়ে ওঠার পেছনেও আছে।

এই ড্রাইভারগুলোই যখন রাস্তায় একটা মেয়ের দিকে তাকাবে, স্বাভাবিকভাবেই তার দৃষ্টি যাবে নারীদের প্রতি। ফ্যামিলিহীন সেক্সুয়ালি ফ্রাস্ট্রেটেড, মাতাল, প্রতিহিংসাপরায়ণ একটা মানুষের না থাকে নৈতিকতা, না থাকে ভয়। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। সুযোগ পেলে এরা বাছবিচার করে না। তাদের চোখে সেই ফিল্টার নেই। প্রথম সুযোগেই এরা ধর্ষণ করে। এরপর?

ধর্ষণ, ধর্ষণের শাস্তি

যার মাঝে নৈতিকতা নেই, যার মাঝে ভয় নেই- সেও ভেবে বসে, জীবিত ছাড়লে বিপদ হবে। বাস চিনে ফেলবে। পুলিশ ধরবে। বিচার হবে। এমন অনেককিছুই তার মাথায় খেলে যায়। তখন বেস্ট অপশন কী? বেস্ট অপশন হল মেয়েটাকে মেরে ফেলা। এরপর নির্জন কোনো জায়গা পেলে লাশটাকে ফেলে দেওয়া। এরপর? যা বারবার ঘটছে এই নগরে…লাশ পেয়ে যায় পুলিশ। মামলা হয়। অপরাধী ধরা হয় কিন্তু মেয়েটির পিতামাতা?

একটা অপরাধী জন্ম নেওয়ার পেছনে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। কেউ একদিনে এই পথে পা বাড়ায় না। একটু একটু করে ইঁদুর মারা বিষ দিলে হাতিও মরে যায় একদিন। সমাধান কী? পরিবহন সেক্টরে একটা ম্যাসিভ নীতিমালা না আসলে এসব কোনদিন বন্ধ হবে না। ধরামাত্রই ফায়ারিং স্কোয়াডে দিলেও না। এরা পত্রিকা পড়ে না। ফেসবুকিং করে না। এরা জানে না, গতকালই হয়তো একটা বাসে ধর্ষন-হত্যাকান্ড ঘটেছে, আজ তাদের সাবধান হতে হবে।

সভ্য দেশে কেউ ঘনঘন রেগে গেলে তার কারণ অনুসন্ধান করা হয়। কোন পেশাজীবী ডিপ্রেশনের ভেতরে গেলে সেই পেশার সারাউন্ডিংস নিয়ে রীতিমত গবেষণা করা হয়। কেউ ঘুষ নিলে এর পেছনে কারণ খুঁজে বের করতে কামান দাগানো হয়। অপরাধপ্রবণদের মধ্যে গবেষণা হয় শয়ে শয়ে। এরপর? প্রোপার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয় শ্রমিকদের।

আমরা সবাই মোটামুটি জানি, এই সমস্যার উত্তরণ একদিনে হবে না। কী করলে আগামী দশ বছর পর এমন ঘটনা মোটামুটি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে, সেটাও জানি। শুধু আরেকটু রিসার্চ করে, ত্রুটিগুলো সারালেই দেশের মেয়েগুলো আরেকটু নিরাপদ হয়। পত্রিকায় পাতায় থেমে যেত এমন ভয়ংকর খবরগুলো। আমার বোনকে সন্ধ্যার পর বাইরে থেকে ফিরতে হয়তো এতটা দুশ্চিন্তা সেদিন নাও করতে হতে পারে।

প্রতিটি মানুষ নয়মাস মায়ের পেটে থেকে জন্ম নেয়। এরপর তাদের ধর্ম আলাদা আলাদা হয়। শৈশব আলাদা আলাদা হয়। পেশা আলাদা হয়। নীতিবোধ আলাদা হয়। এরপর… কেউ হয় ধর্মগুরু, কেউ হয় ধর্ষক।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button