অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া…

হারানোর আগে বোধহয় আমরা কখনোই কোনো কিছুর মর্যাদাকে ঠিক উপলব্ধি করতে পারিনা। মানুষ ভালবাসা হারিয়ে ভালবাসাকে খোঁজে, এক্সিডেন্টে দূর্ভাগ্যজনকভাবে পা হারিয়ে উপলব্ধি করে, আরেহ কোনোদিন তো পা থাকার কারণে নিজেকে আলাদা করে সৌভাগ্যবান ভাবিনি আমি। চোখের দৃষ্টিসীমা ক্ষীণ হয়ে গেলে বোঝে, চোখে দেখতে পারাটা কত বড় ব্লেসিং। এরকম অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানি না, আমাদের কি পরিমাণ সম্ভাবনা এবং আমরা কতটা সৌভাগ্যবান।

পৃথিবীতে আমাদের জীবনের বর্ডারলাইন খুব বেশি দীর্ঘ না। এই ক্ষুদ্র জীবনকেই আমরা কি মনোটনাস ভাবে হেলাফেলা করে কাটিয়ে দেই, কোনোরকমে। যখন আমাদের বয়স আছে, যখন আমাদের তারুণ্য তখন নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে উন্মুক্ত করার সময়। আর কে না জানে, ভ্রমণ করা, নতুন দেশ দেখা, নতুন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারলে দৃষ্টিভঙ্গি পালটে যায় ইতিবাচকভাবে। মানুষ উদার হতে শেখে। সবরকম মানুষকে ভালবাসতে শেখে। যদিও অনেকেরই সময় হয় না ঘুরে বেড়ানোর জীবনের বিবিধ জটিলতায়। চোখ থাকতেও আমরা অনেকে চক্ষু মেলিয়া দেখতে চাই না, ঘুরতে যেতে চাই না কত অজুহাতে। দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া…টাইপ অবস্থা। অথচ, এই মানুষটা অন্ধ, কিন্তু মনের চোখে অনুভব করেছেন, ঘুরেছেন ১৩০টি দেশে!

tony giles টনি জাইলস
image – BBC

ভদ্রলোকের নাম টনি জাইলস। তিনি চোখে দেখেন না। কানেও শুনতে সমস্যা হয়। হেয়ারিং এইড ব্যবহার করে কথাবার্তা শুনতে পারেন খানিকটা। এখন তার বয়স ৪১। যখন আরো তরুণ ছিলেন তখন ঘর ছেড়ে বেরুতে শুরু করেছিলেন। ২০ বছর আগে থেকে শুরু হয়েছিল তার ভ্রমণ গল্প। এই সময়টায় তিনি ঘুরে বেরিয়েছেন দেশ থেকে দেশে। চোখটা বন্ধ করলে আপনার আমার কাছে হয়ত সব কিছুর অর্থ এক হয়ে দাঁড়াবে। মনে হবে নিকষ অন্ধকার, আলাদা করে কোনো কিছু উপলব্ধি করাটা আমাদের জন্যে সহজ নয়। কিন্তু, এই মানুষটার কাছে দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতা কেমন? ১৩০টা দেশ তিনি ঘুরেছেন, তিনি পার্থক্য করেন কিভাবে?

মনের চোখে দেখা বলে একটা রোমান্টিক কথা আমরা প্রায়শই ব্যবহার করি। কিন্তু সম্ভবত আমাদের যাদের চোখে আলো আছে, তারা মনের চোখের ব্যবহার খুব কমই করি। আমাদের এবিলিটি কখনো কখনো আমাদের ডিজেবল করে দেয়। মনের চোখে দেখার মানে যে কি তা বুঝতে হলে টনি জাইলসের এই ভ্রমণকে অনুভব করতে হবে। এই লেখা থেকেও হয়ত আপনি তার মাহাত্ম্য পুরোপুরি ধরতে পারবেন না। কিন্তু অনুভব করলে বুঝতে পারবেন, তিনি তার ইন্দ্রিয়কে কতটা ভাল ব্যবহার করেন।

একটা নতুন দেশ। নতুন শব্দ। মানুষের ভাষা বদলে যাচ্ছে। কথা বলার ভঙ্গি, কথা বলার বিষয় বদলে যাচ্ছে। কারো কণ্ঠে আশা, কারো হতাশা। কেউ আনন্দ করছে। কেউ গান গাইছে। কেউ চেঁচামেচি করছে। হৈ হল্লা। আপনি চোখে না দেখেও শুধু মানুষদের কথা বলার টোন, তাদের ভাষা শুনেও তাদেরকে বুঝতে পারবেন। আমরা বুঝতে চাই না, আমরা শুধু দেখি। কিন্তু টনি জাইলস যেহেতু দেখেন না, আমার ধারণা তিনি গোটা ব্যাপারটাকে খুব নিঁখুতভাবে অনুভব করেন।

চোখ না থাকলেই যে ঘোরা যাবে না, ভ্রমণের নেশা থাকা যাবে না এমন নয়। আপনি ঘ্রাণ শুঁকেও বুঝতে পারবেন অনেক কিছু। খাবারের স্বাদ, বৈশিষ্ট্য বুঝেও আপনি একটা নতুন জাতিকে আলাদা করতে পারবেন। টনি জাইলসের ক্ষেত্রেও এমন হয়। তার ইন্দ্রিয় প্রবলভাবে সজাগ থাকে। তিনি প্রতিমুহূর্তে যেন বাঁচেন, প্রতিমুহূর্তে প্রত্যেকটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শব্দ, গন্ধ, ভাষা, কোলাহলের মধ্যে তিনি থাকেন। মনের আয়নায় তিনি নিজের ভাবনার সাথে কানেক্টেড থাকেন প্রতি মুহুর্তে।

টনি জাইলস বলতে গেলে সলো ট্রাভেলার। একাই তিনি বেশিরভাগ দেশ ঘুরেন। তার ভ্রমণের অর্থ আসে মূলত বাবার পেনশনের টাকা থেকে। দরকারি টিকেট কাটাকাটির ব্যাপারে মা সাহায্য করেন তাকে। আমৃত্যু এই উৎসুক মনের চোখটাকে জাগিয়ে রাখা তার স্বপ্ন। যতদিন বেঁচে থাকবেন, এভাবেই ঘুরতে থাকবেন নতুন কোনো শহর-নগর-বন্দরে। যেতে চান পৃথিবীর সবগুলো দেশে। পৃথিবীর সব মহাদেশে পা পড়েছে তার, এবার সব দেশে পা ফেলতে চান টনি জাইলস।

*

আমি প্রায়ই দেখি বন্ধুরা যখন কোথাও ঘুরতে যায়, তারা ঘুরে না আসলে। ছবি তুলতেই সময় পার করে দেয়। তারা মানুষকে দেখে না, মানুষের কথা শোনে না। প্রকৃতির কাছে কান পাতে না। মাটির ঘ্রাণ কেমন হয়, খালি পায়ে নরম মাটিতে হেঁটে বেড়াতে কেমন লাগে তারা জানে না। এর মানে হলো, চোখ থাকতেও আমরা বেশিরভাগ মানুষ আসলে অন্ধ।

অথচ টনি জাইলস কিছু না দেখেও সবটাই যেন দেখেন। তিনি সব কিছুকে স্পর্শ করেন। পা দিয়ে নতুন ভূমিকে স্পর্শ করেন অনুভব করেন নতুন দেশের মাটিকে। দেয়ালে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বোঝেন আর্কিটেকচার, পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে বোঝেন উঁচু স্থানে উঠার কসরত কেমন এডভাঞ্চারাস। কখনো দেশের ইতিহাস জানতে গাইড ভাড়া নেন। মানুষের সাথে কথা বলেও বুঝতে চান।

এ যেন এক নেশার মতো ব্যাপার। নিজেকে আরো জানা। দেশ ঘুরতে ঘুরতে নিজের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতির মধ্য দিয়ে প্রতি মুহুর্তে বেঁচে থাকার গল্প তৈরি করছেন যেন তিনি। চোখ নেই অথচ, চোখওয়ালা মানুষের চেয়েও বেশি দেখেন তিনি। অদ্ভুত একাত্মতা তার এই পৃথিবী, মানুষ, প্রাণ প্রকৃতির সাথে…

Facebook Comments

Tags

ডি সাইফ

একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাব....

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button