ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

তনু…সাগর-রুনি…রেইনট্রি হোটেল…নুসরাত…

৩ বছর আগে সোহাগী জাহান তনু নামের একটি মেয়ে রাতের বেলা টিউশনি করে ঘরে ফিরছিলেন। রাস্তায় মেয়েটিকে ধর্ষন করে মেরে ফেলা হোলো সেনাবাহিনীর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। প্রথমবার ময়না তদন্তে তনু ধর্ষিত হয়নি বলে জানা গেলো। দ্বিতীয়বার ময়না তদন্তে তনুর অন্তঃর্বাসে বীর্যের অস্তিত্ব পাওয়া গেলো। সেটির ডি এন এ পরীক্ষার পর সি আই ডি এর তরফ জানা গেলো তিনজন পুরুষ এখানে জড়িত রয়েছে। গণমাধ্যমকেও সেটি জানানো হলো। অনলাইন পোর্টাল জাগো নিউজ টুয়েন্টিফোরের গত ২০ শে মার্চ ২০১৯ সালের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়-

“সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করার কথা থাকলেও তা করা হয়েছে কিনা এ নিয়েও সিআইডি বিস্তারিত কিছু বলছে না।

সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহ করা ব্যক্তি বলেও সিআইডি জানিয়েছিল। তবে তাদের নাম জানানো হয়নি।

একই সালের ২২ নভেম্বর ঢাকা সিআইডি কার্যালয়ে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম, চাচাতো বোন লাইজু ও চাচাতো ভাই মিনহাজকে দিনভর পুরানো বিষয়গুলো জিজ্ঞেস করেন ঢাকা সিআইডির কর্মকর্তারা। এরপর থেকে তনুর পরিবারের সদস্যরা মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং তদন্তকারী সংস্থাও তাদের কিছু জানাচ্ছে না বলে সাংবাদিকদের জানান তনুর বাবা-মা”।

এই হচ্ছে বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যাকান্ডের বিচারিক বিষয়ের সর্বশেষ অবস্থা। প্রথম দিককার সময়ে দেশের মানুষের প্রতিবাদের তোপে মনে হয়েছিলো বিচার বুঝি এক সপ্তাহেই হয়ে যাবে। কিন্তু আদতে ৩ বছরেও বিচারের “ব” ও হয়নি। তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন,

“সিআইডির কর্মকর্তারা প্রথম থেকেই বলে আসছেন তারা সহসা ঘাতকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন। তাদের এমন আশ্বাসের কথা শুনে শুনে ৩টি বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু আশার আলো এখনও দেখছি না, দেখব কিনা তাও জানি না। গত এক বছর ধরে সিআইডি কর্মকর্তাদের কোনো খবর নেই। মৃত্যুর আগে আমি আমার একমাত্র মেয়ের হত্যাকারীদের দেখে যেতে পারব কিনা জানি না।

তবে এখন আমার একটাই ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এ বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আমার আবেগ ও কষ্টটা ওনার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে বলতে চাই। কারণ তিনিও একজন মা। একজন মা বোঝেন সন্তান হারানোর বেদনা”

তনুর মায়ের বলা শেষ কথাগুলো পড়ে বরাবরের মত হেসেছি। কেন হেসেছি সেটা বুদ্ধিমান পাঠক/পাঠিকারা বুঝে নেন।

তনুর হত্যাকান্ড থেকে আরেকটা হত্যাকান্ডে যাই। সেটা হচ্ছে ৭ বছর আগে ঘটে যাওয়া সাংবাদিক সাগর আর রুনির হত্যাকান্ড। তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাব শুধু আদালতে একটি তদন্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে সাত বছরে ৬২ বার সময় নিয়েও এখনো প্রতিবেদনটি দিতে পারেনি৷ আমি নাম বলছি না। নাম বললে সেই ব্যক্তি বিপদে পড়তে পারেন। সাগর রুনি পরিবারের একজন আমাকে কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “ভাই বিচার তো দূরের কথা এখন আইন শৃংখলা বাহিনীর লোকেরা তো বলছে খুন নাকি আমরাই করেছি। আর এই হত্যাকান্ড নিয়ে নোংরা সকল কথা বার্তাও তো প্রতিদিনই বলছে এরা”।

অবশ্য সাগর আর রুনির মা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার দিতে বা কষ্টের কথাগুলো বলতে যাবেন কিনা আমরা আজও জানিনা। যদি যেতেন তাহলে আবার একটু হাসা যেতো।

এবার আসি আলোচিত বনানী রেইন ট্রি হোটেলের ধর্ষন মামলার ঘটনায়। এই মামলার দুই ভিক্টিমের সাথে যেহেতু আমার যোগাযোগ রয়েছে ফলে এই মামলা সম্পর্কে মোটামুটি আপডেটেড থাকি। এই মামলার ৫ জন আসামীরা ছিলো আপন জুয়েলার্স এর মালিকের ছেলে সাফাত আহমেদ, পিকাসো রেস্তোরাঁর অন্যতম মালিক ও রেগনাম গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ হোসেন জনির ছেলে সাদমান সাকিফ, সাফাতের বন্ধু নাঈম আশরাফ (সিরাজগঞ্জের আবদুল হালিম), সাফাতের গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী আবুল কালাম আজাদ (রহমত)। এর মধ্যে সাদমান সাকিফ, গাড়ি চালক বিল্লাল আর দেহরক্ষী রহমত জামিনে বহাল তবিয়তে রয়েছে। শাফাত আর নাঈমের জামিন হয়ে গেলেও পরবর্তীতে তাদের সেই জামিন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্তই মামলার ১৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। গত ৮ ই এপ্রিল সোমবার এই মামলাতে একজন ভিক্টমের মা সাক্ষ্য দিতে আসলে তিনি হয়রানির অভিযোগ করেন। একের পর এক মামলার তারিখ কেবল পেছাচ্ছে আর পেছাচ্ছে। কবে শেষ হবে বিচার কেউ জানে না। পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহনের তারিখ দেয়া হয়েছে ৬ ই মে ২০১৯।

আদালতের বাইরে সেই ভিক্টিমের মা সাংবাদিকদের জানান,

“আমাদের বিচার চাওয়াই ভুল ছিল। আজ ছয় দিন মেয়েকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আসলাম, তার মধ্যে ৩ দিন বিচার কাজ হয়েছে, আর ৩ দিন ফিরে গেলাম। এছাড়া আরও ২/৩ দিন এমনিই আসতে হয়েছে। এ হয়রানি আর ভাল লাগছে না। মেয়েটি সম্প্রতি একটি চাকরিতে ঢুকেছে। আমি নিজেও উত্তরবঙ্গে একটি কলেজে চাকরি করি। এভাবে বারবার আসা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এ কারণেই মানুষ বিচার চায় না”।

মামলাটিতে ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জগঠন হয়। এরপর প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য হয় ওই বছর ২৪ জুলাই। ওইদিনসহ ৪টি ধার্য তারিখ পর ওই বছর ১৬ অক্টোবর ভিকটিমের সাক্ষ্য শুরু হয়। ওই ৪টি তারিখের মধ্যেও ২ দিন ভিকটিম এসে ফিরে যায়। ১৬ অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮টি ধার্য তারিখে জেরা ও জবানবন্দির পর ওই ভিকটিমের সাক্ষ্য শেষ হয়। এরপর ওই বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১৪ মার্চ কারাগার থেকে আসামি না আনায় সাক্ষ্য হয়নি।

এরপর ওই বছর ২৭ মার্চ ২২ এপ্রিল পর্যন্ত ৩টি ধার্য তারিখে রেইনট্রি হোটেলের ১০জন কর্মচারীরসহ ১১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়। এরপর ৩টি ধার্য তারিখে সাক্ষি না আসায় সাক্ষ্য হয়নি। সর্বশেষ গত ৯ আগস্ট থেকে সোমবার ফিরে যাওয়া ভিকটিমের সাক্ষ্য শুরু হয়। ওইদিন জবানবন্দির পর পরবর্তী তারিখ ৭ অক্টোবর আংশিক জেরা হয়। এর পরবতৃী ২টি ধার্য তারিখ ১৫ ও ২২ জানুয়ারি একদিন আসামিদের কারাগার থেকে না আনায় এবং একটি আইনজীবী না থাকায় ভিকিটিম ফিরে যান। সর্বশেষ ১৩ ফেব্রুয়ারি ভিকটিমের আংশিক জেরা হয় এবং ৬ ও ১৮ মার্চ ভিকটিম না আসায় সাক্ষ্য পেছায়।

এই ব্যাপারে ভিক্টিমের মা প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাবেন কিনা এসবের বিচার জানাতে আমরা জানি না। জানলে আরেকবার হাসা যেতো।

এই উপরের যে আপডেট দিলাম, সেটির হিসেব যদি মাথায় নিয়ে বিচার ও বিশ্লেষন করতে পারেন তাহলে এই ঘটে যাওয়া নুসরাত ধর্ষন ও খুনের বিচার ঠিক কোথায় যাবে, তা আপনারাই হিসেব করে নিয়েন। যাবার আগে আমি আমি বরাবরের মত হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটা কবিতাই এখানে দিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশের কথা উঠলেই যে কবিতাকে আমি প্রাসঙ্গিক মনে করি।

“যখন আমরা বসি মুখোমুখি, আমাদের দশটি আঙুল হৃৎপিন্ডের মতো কাঁপতে থাকে

দশটি আঙুলে, আমাদের ঠোঁটের গোলাপ ভিজে ওঠে আরক্ত শিশিরে,

যখন আমরা আশ্চর্য আঙুলে জ্বলি, যখন আমরাই পরষ্পরের স্বাধীন স্বদেশ,

তখন ভুলেও কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা জিজ্ঞেস করো না;

আমি তা মূহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, -তার অনেক কারণ রয়েছে।
তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।

জানতে চেয়ো না তুমি নষ্টভ্রষ্ট ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের কথা, তার রাজনীতি,অর্থনীতি, ধর্ম, পাপ, মিথ্যাচার, পালে পালে মনুষ্যমন্ডলি, জীবনযাপন, হত্যা, ধর্ষণ,মধ্যযুগের দিকে অন্ধের মতোন যাত্রা সম্পর্কে প্রশ্ন ক’রে আমাকে পীড়ন কোরো না;

আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, – তার অনেক কারণ রয়েছে।

তোমাকে মিনতি করি কখনো আমাকে তুমি বাঙলাদেশের কথা তুলে কষ্ট দিয়ো না।

তার ধানক্ষেত এখনো সবুজ, নারীরা এখনো রমনীয়, গাভীরা এখনো দুগ্ধবতী,কিন্তু প্রিয়তমা, বাঙলাদেশের কথা তুমি কখনো আমার কাছে জানতে চেয়ো না;

আমি তা মুহূর্তেও সহ্য করতে পারি না, তার অনেক কারণ রয়েছে”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button