ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আপনাকে ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!

থ্যাংকইউ পিএম নিয়ে এই ক’দিন আগে আমি নিজে ঠাট্টা-মশকরা করেছি। ছাত্রলীগ বা তেলবাজ সহমত ভাই সম্প্রদায়ের লোকজন প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর ব্যাপারটাকে এত বেশি হাস্যকর করে তুলেছিলো যে, এই লেখাটা দেখলেই হাসি চলে আসতো। ডেঙ্গুর প্রকোপে মানুষ ঢাকা ছেড়ে পালানোর কথা ভাবছে, তখন প্রধানমন্ত্রী বললেন ডেঙ্গু মোকাবেলায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে; তেলবাজেরা শুরু করলো জিকির- থ্যাংকিউ পিএম! ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রী!

দেশের হাজারটা সমস্যার মধ্যেও যখন এই তেলবাজ সমিতি দিনে দুইবেলা করে থ্যাংকিউ পিএম রব তুলতো, তখন ব্যাপারটা হাস্যকর হবেই। কিন্ত আজ প্রধানমন্ত্রীকে মন থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, নিজের দলের দুর্নীতিবাজ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার যে ঘোষণা তিনি দিয়েছিলেন, সেটাকে শুধু মুখের কথায় আটকে না রেখে বাস্তবায়ন করছেন বলে। ছাত্রলীগ বা যুবলীগ বলে দুর্নীতিবাজ, অস্ত্রবাজ নেতাদের ছাড় না দেয়ার কারণে প্রধানমন্ত্রী একটা ধন্যবাদ পেতেই পারেন।

যুবলীগের ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে র‍্যাব গ্রেফতার করেছে অবৈধ জুয়া ও ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় গুলশান-২–এর নিজ বাসা থেকে খালেদ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়, যার কোনটিরই লাইসেন্স ছিল না। এর আগে বিকেলে তার মালিকানাধীন ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবে অভিযান চালায় র‍্যাব, সেখান থেকে অবৈধ জুয়ার আসরের অস্তিত্ব পেয়েছে র‍্যাব, বিপুল পরিমাণ অর্থসহ ১৪২ জনকে আটক করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ফকিরাপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবের জুয়ার আড্ডায় চলছে র‍্যাবের অভিযান

ভাবুন তো একবার, কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠলে লাইসেন্সবিহীন তিনটি অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরতে পারে একজন রাজনৈতিক নেতা? ক্ষমতার দাপট কোন পর্যায়ে গেলে মতিঝিলের ফকিরাপুলের মতো জায়গায়, সবার নাকের ডগায় নিষিদ্ধ জুয়া খেলার আসর বসানো যায়? র‌্যাবের কাছে অভিযোগ ছিল, এই ক্লাবে আট মাস ধরে অবৈধ আসর বসত। আট মাস ধরে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, প্রধানমন্ত্রী যখনই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসব তথ্য পেয়ে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করলেন, তার ক’দিন পরেই ব্যবস্থা নেয়া হলো। তাহলেই ভাবুন, এতদিন ধরে কিভাবে বাকী সবাইকে ‘ম্যানেজ’ করে রাখা হয়েছিল!

কয়েকদিন আগে ছাত্রলীগের সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকের চাঁদাবাজীর খবর পেয়ে এই দুজনকে শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এরপরে গণভবনে এক সভায় তিনি যুবলীগের ব্যাপারেও উষ্মা প্রকাশ করে বলেছিলেন, তার কাছে প্রতিবেদন আছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যুবলীগের কিছু নেতা সম্পদের পাহাড় গড়েছে, অবৈধ অস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তায়। তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না হুঁশিয়ারী দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এরা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ!

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যুবলীগের সভাপতি আবার প্রধানমন্ত্রীর সেই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে সাংবাদিকদের কাছে দাবী করেছিলেন, এসব মিথ্যে অভিযোগ! এখন যুবলীগ নেতা যখন লাইসেন্সবিহীন অবৈধ অস্ত্রসহ ধরা পড়লেন, তার মালিকানাধীন ক্যাসিনো থেকে এতগুলো জুয়াড়িকে গ্রেফতার করা হলো, তখন তিনি নিজের সংগঠনের নেতাকে কিভাবে ডিফেন্ড করবেন সেটা জানার খুব ইচ্ছে হচ্ছে।

এই কঠিণ কাজগুলো আরও অনেক আগে করা উচিত ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। মানুষের মনে ক্ষোভ জমেছে, বিরক্তি এসেছে, এদের উৎপাত, এদের যন্ত্রণায় লোকে অতীষ্ট হয়েছে। দিনশেষে এদের কেউ গালি দেয়নি, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশটা আপনার ওপরে গিয়ে ঘটেছে, কারণ আপনি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, সবার আশা ছিল আপনি এসব দেখবেন, এদের লাগামহীন নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণ করবেন।

সবকিছু নষ্টদের অধিকারে গেছে আগেই, সেটা আপনার অগোচরে ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি না। এই শক্ত কথাগুলো, এই হুংকারটা আরও অনেক আগে আসা দরকার ছিল আপনার দিক থেকে। বাড়তে বাড়তে অসীমের কাছাকাছি চলে গেছে একদল হায়েনা, এরা বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়, আপনার নাম ভাঙিয়ে লুটপাটের আসর চালায়। দিনশেষে এদের কথা কেউ মনে রাখে না, কলঙ্কৃত হয় বঙ্গবন্ধুর নাম, কলঙ্কৃত হন আপনি। বেটার লেট দ্যান নেভার বলে একটা কথা আছে। এদের একটা একটা করে শেষ করুন প্লিজ, নইলে এরা একদিন আজদাহা অজগর হয়ে আপনাকেই গিলে খাবে, এটা আমি লিখে রাখলাম।

বঙ্গবন্ধু সেই ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন, ‘সবাই পায় সোনার খনি, আমি পাইছি চোরের খনি!’ সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সরকারী কর্মচারীদের একাংশের সীমাহীন দুর্নীতি এবং রাহাজানিতে অতিষ্ট হয়ে এই কথাটা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মানুষটা সময় পাননি সেই চোরের দলকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার, তার আগেই সপরিবারে তাকে শেষ করে দিয়েছিল একদল হায়েনা।

rabbani রাব্বানী শোভন ছাত্রলীগ

আওয়ামী লীগের হাতে স্টেবল একটা গভর্নমেন্ট আছে, গত এগারো বছর ধরে তারা ক্ষমতায়, প্রশাসনও এই সরকারের অনুকূলে, দেশে এখন কার্যকরী বিরোধী দল বলতে কিছুই নেই। সেসবের সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগের একদল নেতা এবং সরকারী কিছু কর্মচারী লুটপাটের মচ্ছবে নাম লিখিয়েছে, জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খাচ্ছে। দেরীতে হলেও শেখ হাসিনা এসবদিকে নজর দিয়েছেন। কথায় আছে, চ্যারিটি বিগিনস এট হোম। শেখ হাসিনাও তাই শুদ্ধি অভিযানটা ঘর থেকে শুরু করেছেন। নিজের হাতে নির্বাচন করা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন, যুবলীগ নেতাকেও ছাড় দেননি।

শেখ হাসিনার ওপরে নানা কারণে অভিমানের পাহাড় জমেছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে তার কাছে যে পরিমাণ আশা ছিল, সেটা তিনি পূরণ করতে পারেননি এখনও, আমজনতার একজন হিসেবে অতৃপ্তি আছে, অপূর্ণতার হাহাকার আছে মনের ভেতরে। তবুও আজ শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই মন থেকে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে এই অবস্থানটা গ্রহণ করার জন্যে। আশা করি, এই জিরো টলারেন্সটাই তিনি বজায় রাখবেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে নিজের মাথাটা তিনি সবসময় এভাবে উঁচুই রাখবেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button