মতামত

হত্যাকারীকে ‘মানসিকভারসাম্যহীন’ বললে বোধহয় আপনারাই বেশি খুশি হবেন!

নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে জঘন্যতম দিন আজ। এক সন্ত্রাসী ভিডিও গেম খেলার স্টাইলে কি নির্মমভাবে মানুষের জীবন নিয়ে খেললো! কি অবলীলায় সে এতগুলো মানুষকে মেরে ফেললো মসজিদে প্রবেশ করে। যারা নিহত হয়েছেন এই সন্ত্রাসী হামলায় তারা বড়ই দুর্ভাগা। শুক্রবারের দিন মসজিদে গিয়ে সন্ত্রাসীর হামলার শিকার হবেন এমন দিনের কথা হয়ত স্বপ্নেও কেউ কল্পনা করেননি। এই হামলায় দুইজন বাংলাদেশিও নিহত হয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে।

এই ট্র‍্যাজেডিতে আক্রান্ত হতে পারতেন আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটাররাও৷ যে মসজিদে এই হামলা সেখানে তাদের নামাজ পড়বার কথা। একটু দেরি করে যাওয়ায় তারা গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেয়ে বুঝতে পারলেন কি নারকীয় ঘটনা ঘটছে আজ এখানে। তারা ফিরে গেলেন প্রাণ নিয়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আমাদের ক্রিকেটার পার্কের ভেতর দিয়ে সেই আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগ করছেন। কিন্তু কোনো নিরাপত্তা কর্মীকে দেখা গেল না তাদের সাথে। কেন নিরাপত্তার এত ঘাটতি নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে তা বোধগম্য হলো না। নিউজিল্যান্ড শান্তিপ্রিয় দেশ বলে তাদের হয়ত ওভারকনফিডেন্স, আমাদেরও হয়ত বিশ্বাস যে এমন দেশে এই ঘটনা ঘটতে পারে কেউ কল্পনা করেনি। যাইহোক, আপাতত তৃতীয় টেস্ট বাতিল করা হয়েছে। হয়ত শীঘ্রই দেশে ফিরে আসবেন আমাদের ক্রিকেটাররা৷

এই সন্ত্রাসী যে নারকীয় হত্যাজজ্ঞ চালিয়ে ৫০ জন মানুষ হত্যা করেছে তার দেশ আবার অস্ট্রেলিয়া। যে দেশের নাগরিক এই সন্ত্রাসী সেই দেশ নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের দেশে আসতে চায়নি, সিরিজ বাতিল করেছে একসময়। অস্ট্রেলিয়া নিশ্চয়ই বুঝবে এবার, আমরা যে নিরাপত্তা অফার করি সেটা মোর দেন এনাফ। কিন্তু আমরা তাদের মতো উন্নত দেশে যে নিরাপত্তায় যাই সেটা পর্যাপ্ত না। সন্ত্রাসী হামলা যেকোনো সময় যেকোনো দেশে হতে পারে। এর বিপরীতে কে কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সেটা হলো মূল ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়াও যে নিরাপদ না, এই দেশেও যে সন্ত্রাসী মনোভাবাপন্ন এক্সট্রিমিস্ট ঘরানার জন্ম হচ্ছে সেটা তো এখন প্রমাণ হলো। বাংলাদেশের উচিত হবে এখন থেকে প্রত্যেকটি দেশে খেলোয়াড় পাঠানোর আগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়া এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা আদায় করা।

যাইহোক, এইদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার বিশেষজ্ঞরা হা হুতাশ করে বেড়াচ্ছেন আজকে এই সন্ত্রাসী মুসলিমদের হত্যা করেছে বলে, তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলা হবে। তাকে সন্ত্রাসী বলা হবে না আন্তজার্তিক মিডিয়ায়। অথচ একজন মুসলমান হামলা করলেই তাকে জঙ্গী বলা হতো ইত্যাদি ইত্যাদি। এতবড় শোকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই যে জেনারালাইজ করে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে এর পেছনে যুক্তি কি? আজকের ঘটনায় এখন পর্যন্ত বিভিন্ন মিডিয়ায় এটাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবেই বলা হয়েছে। সিএনএন, দ্যা গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোষ্ট সহ প্রখ্যাত মিডিয়াগুলো এটাকে টেররিস্ট এট্যাক বলছে। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে সন্ত্রাসী হামলা বলছেন। অথচ, বাংলাদেশিরা মুখস্থ বলে বেড়াচ্ছেন মিডিয়া এটাকে টেররিস্ট এট্যাক বলবে না, বলবে মানসিক ভারসাম্যহীনের আক্রমণ।

নিউজিল্যান্ড, সন্ত্রাসী হামলা

 

তাদের মুখস্থবিদ্যা দেখে মনে হচ্ছে, এই অস্ট্রেলিয়ান সন্ত্রাসীকে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দিলে তারাই সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। কারণ, এতে তাদের সুবিধা। ঘৃণার বিপরীতে ঘৃণা ছড়িয়ে এই ঘৃণার যুদ্ধে তারাই জিতে যাবে! অথচ, এদের সময় হয় না কে কি লিখলো, কে কিভাবে ঘটনাটিকে দেখছে সেটিকে তলিয়ে দেখার! এই ঘটনার পর অনেকে নিউজিল্যান্ড বয়কটের ঘোষণা দিয়ে হ্যাশট্যাগ দিচ্ছেন। আমাদের দেশে যখন হলি আর্টিজানে সন্ত্রাসীদের হামলা হলো, জাপানি ও ইতালিয়ান নাগরিক মারা গেল, এই দুটি দেশ কিন্তু আমাদের বয়কটের ডাক দেয়নি। বরং, তারা বলেছে সন্ত্রাসী হামলা দুই দেশের সম্পর্কে বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।

এই ঘটনায় নিউজিল্যান্ড বয়কটের ডাক দেয়াটা যৌক্তিক মনে হয় না। বরং, নিউজিল্যান্ডের জন্যেও এটা শিক্ষা নেওয়ার মতো ঘটনা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তাদের আরো গভীরভাবে ভাবতে হবে। এই সন্ত্রাসীদের উত্থান সম্পর্কে সবারই ভাবতে হবে আসলে। আমরা যেভাবে অন্য দেশকে, ভিআইপিদেরকে নিরাপত্তা দেই, আমাদেরকেও একই মানের নিরাপত্তা আদায় করে নিতে হবে। আজকে অকল্পনীয় কিছু যদি আমাদের ক্রিকেটারদের সাথে ঘটতো, সেই দায় কি বিসিবি কোনোভাবে এড়াতে পারত? কোনো ক্ষতিপূরণ কি সেই ক্ষতির খেসারত দিতে পারত? কখনো না। এই ঘটনা সবার জন্যেই ওয়েক আপ কল।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button