রিডিং রুমলেখালেখি

তবু তো ভাই, কারোরই নাই, একটুখানি হুঁশ!

আমরা প্রায়ই বলতে শুনি, এ্যারোসলে আজকাল আর মশা মারা যায় না। ব্যাপারটা আসলেই তাই, আমি রীতিমতো পরীক্ষা করে দেখেছি। ধরুন, আপনার সামনে মশা উড়ছে দারুণ দক্ষতায়। আপনি তামিল ভিলেনের মতো তার নাকে এ্যারোসল স্প্রে করে দিলেন। দেখা গেল, আপনার লিথাল আক্রমণেও মশা ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইলেন, তারপরেই আবার উঠে বিপুল বিক্রমে আক্রমণ শুরু করলেন । 

কখনো ভেবে দেখেছেন, এরকম কেন হয়? এ্যারোসল তো ভাই মশা মারার জন্যই, মশাকে নেশা করানোর জন্য না। ধরুণ, আপনার রুমে ১০০ টি মশা আছে। এখন এই ১০০ টি মশা মারার জন্য আপনি গোটাপাঁচেকবার এ্যারোসল স্প্রে করলেন। এই এ্যারোসল আক্রমণে ধরা যাক ৯০ টি মশা মারা গেল। বাকী থাকলো ১০ টি মশা। 

এখন এই ১০টি মশাকে তো বাঁচতে হবে, সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। সুতরাং, তাদের শরীর, ভবিষ্যত এ্যারোসল আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এমন একটা সিস্টেম করে নিল, দেখা গেল, এরপরে আর ভবিষ্যত এ্যারোসল আক্রমণে তাদের আর কিছু হচ্ছে না। এই তরিকা বংশপরিক্রমায় তাদের জীনে স্থায়ীভাবে বসে গেল, তাদের বাচ্চা-তাদের বাচ্চাদেরও দেখা যাবে, এ্যারোসলে কিছু হচ্ছে না । 

মশা প্রসঙ্গ বাদ দেই। ধরুন, আপনার গত একসপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বর। এমনই জ্বর, যে জ্বরের ইয়েতে আর দাঁড়াতে পারছেন না। আপনি বিশ্বাস করেন, দেশের এমবিবিএস পাশ করা সবাই কসাই, তাদের চেয়ে আপনি বেশি বিশ্বাস করেন পাড়ার ফার্মেসির মালিক কুদ্দুস ভাইকে। আপনি ডাক্তারের ফি দিতে চান না, সুতরাং, আপনি কুদ্দুসভাইয়ের কাছে গিয়ে হাজির হলেন। ফার্মেসি মালিক কুদ্দুসভাই পঞ্চম শ্রেণী পাশ হলেও, গত বিশ বছর ধরে তিনি দেদারসে ঔষধ বিক্রি করছেন। সুতরাং, আপনাকে তিনপাতা নতুন এ্যান্টিবায়োটিক তিনি ধরিয়ে দিলেন। আপনি ২ দিন খাওয়ার পরে দেখলেন আর জ্বর নাই, আপনি বাকী ঔষধ ফেলে দিলেন। 

এখন, ধরা যাক, আপনার শরীকে জীবাণূ আছে ১০০টা । কুদ্দুসভাইয়ের দেয়া এ্যান্টিবায়োটিকে, ২ দিনে ৯০ টা মারা গেল। কী হবে বাকী দশটার?

Image Source: applegate

গল্পটা পরিচিত লাগছে? হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, ঐ দশটা বেঁচে যাওয়া মশার মতোই, আপনার শরীরের থেকে যাওয়া ১০ টা জীবাণু এবং তাদের বাচ্চাকাচ্চারা এবং তাদের বাচ্চাকাচ্চারা তৈরি হবে ঐ বিশেষ গ্রুপের এন্টিবায়োটিক প্রুফ হিসেবে। এই জিনিসটাকেই বলা হয় ‘এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স’ । 

এখন, আপনি চাইলেই এ্যারোসলের মতো এন্টিবায়োটিক পরিবর্তন করতে পারেন না। কারণ, এন্টিবায়োটিকগুলোর যতোই গালভরা বাহারী নাম থাকুক, মাত্র হাতেগোণা কয়েকটি ধরণ বা গ্রুপ রয়েছে। এখন, যদি আপনি যে এন্টিবায়োটিক খেয়েছেন, এরপর এই গ্রুপের যতোই এন্টিবায়োটিক খান, আপনার শরীরে সেটা আর কোনো কাজ করবে না। এভাবে দিনের পর দিন, গ্রুপের পর গ্রুপ এন্টিবায়োটিক খেতে খেতে, একটা সময় আসবে- যেদিন আলেক্সান্ডার ফ্লেমিং সাহেব আর আপনাকে সাহায্য করতে পারবেন না, বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন আপনি। 

ভয়ংকর লাগছে? আরে আসল ভয়ংকর খবর তো এখনো দেইনি। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজে গতমাসে ৪ দিন বয়সী একটি শিশুর ব্লাড রিপোর্ট দেখলাম। শিশুটি সব কয়টি এন্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্ট। অর্থাৎ কোনো এন্টিবায়োটিক তার শরীরে কাজ করবে না। শিশুটির বয়স, মাত্র চার দিন। 

আপনি ভয়ে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেবেন? আরে দাঁড়ান ভাই, এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হবার জন্য আপনার কষ্ট করে ঔষধ কিনে খাবারও প্রয়োজন নেই। সংবাদপত্র দেখুন, দেশে সবগুলো পাস্তুরিত তরল দুধে পাওয়া গেছে এন্টিবায়োটিক।দারুণ স্বাস্থ্যকর ভেবে যে মুরগির মাংস কিনে খাচ্ছেন, শিশুকে খেতে দিচ্ছেন, সীসা আর এন্টিবায়োটিকে ভরা সেই মাংস। দুধে, ডিমে, মাংসে, মাছে– সবখানেই সীসা আর এন্টিবায়োটিকের ছড়াছড়ি। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক বছর আগে থেকেই জানাচ্ছে, বিশ্বে যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয় তার অর্ধেকই ব্যবহৃত হয় পশু উৎপাদনে। আমাদের দেশের কৃষকেরাও দেশের অন্য সবগুলো পেশার লোকের মতই সৎ ও সচেতন। তাই তারা গবাদীপশুকে পুষ্টিকর ইউরিয়া সারের পাশাপাশি উচ্চমাত্রার সীসাযুক্ত রেডিমিল এবং এন্টিবায়োটিকসমৃদ্ধ খাবার খাইয়ে থাকেন। সেই গরুর দুধ আপনি পরম নির্ভরতায় কিনে এনে আপনার শিশুর মুখে তুলে দেন, তার সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের আশায়।

গ্রামবাংলায় এমন একটা সময় ছিলো, যখন বাঘের আক্রমণে মানুষ মারা যেত। এখন আমরা, ২০১৯ সালে এসে, মারা যাবো ‘সুপারবাগ’ এর আক্রমণে। সুপারবাগ হচ্ছে এমন এক ব্যাক্টেরিয়া, যার বিরুদ্ধে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করে না। এন্টিবায়োটিক এর দীর্ঘমেয়াদী অপব্যবহারের, এটি ফসল।

আপনি ভাবছেন, হাস্যকর কথা বলছি ?

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। সীমিত গবেষণাপত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে যার মধ্যে বহু অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সুপারবাগ রয়েছে। শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির আইসিইউতেই শতকরা ২৫ ভাগ ব্যাকটেরিয়া হলো সুপারবাগ, যা কিনা সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী।

Image Source: israel21c

সম্প্রতি প্রকাশিত দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আইসিইউতে মারা যাওয়া রোগীদের ৮০ শতাংশের মৃত্যুর কারণ হলো সুপারবাগ। মাত্রাতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউর চিকিৎসক ড. সায়েদুর রহমানের মতে, ২০১৮ সালে বিএসএমএমইউর আইসিইউতে ভর্তি হওয়া আনুমানিক ৯০০ রোগীর মধ্যে ৪০০ জনই মারা গেছে অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে।

বাংলাদেশের অলিগে গলিতে ঘুরছে হাজার হাজার হেলথ রিপ্রেজেনন্টিভ। তাদের কাজ– ফার্মেসীতে ঔষধ বিক্রি করা। ফার্মেসীর কাজ আপনার কাছে ঔষধ বিক্রি করা। সেই ঔষধে আপনার কী উপকার বা অপকার হলো, সেই দায়ভার কিন্তু কেউ নেবে না। কোটি কোটি টাকার এন্টিবায়োটিকের ব্যবসা, মুড়ি–মুড়কির মতো কিনে খেতে থাকেন, বাচ্চাকে হরলিকস দিয়ে দুধ খাওয়াতে থাকেন আর সুকান্তের কবিতা পড়তে থাকেন– “এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি, নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”।

বাংলাদেশে একজন ডাক্তার পেটালে আন্দোলন শুরু হয়, একজন ট্রাক ড্রাইভার পেটালে আন্দোলন শুরু হয়, একজন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে আন্দোলন হয়; কিন্তু একশ’জন এন্টিবায়োটিক এবিউজে মারা গেলে কেউ জানতে পারে না। কোনো ডাক্তার তার রোগিকে এই বিষয়ে জানান না, কোনো ফার্মেসির মালিক তার কাস্টোমারদের জানতে দেন না। প্রতিদিন বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষবার গুগলে সানি লিয়নকে খোঁজা হয়, খোঁজা হয়না আমাদের আসন্ন মৃত্যুর প্রতিকার জানতে উপায়গুলো। যে মাথার কোনো কার্যকারিতা নেই, চলুন দেশ ও জাতির উন্নয়নকল্পে আমরা সেই মাথা পদ্মাসেতুর জমাখানায় দিয়ে আসি।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button