মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

প্রতিমা ভাংচুরের খবরে যে দেশে পূজো আসে…

বয়স যখন অনেক কম ছিল, তখন আমাদের কাছে পূজার আমেজ শুরু হতো মন্দিরের চাতালে মূর্তির গায়ে রঙ করার দৃশ্য দেখে। দূর্গাপূজার অন্তত একমাস আগে থেকেই শুরু হতো প্রস্তুতি, বাসার বারান্দা থেকেই দেখা যেতো, কারিগরেরা ঘন্টার পর ঘন্টা একনাগাড়ে বসে খোদাই করে চলেছেন হাত-পা-মাথা, তৈরি হচ্ছে পুরো শরীরটা। মন্দিরের দেয়ালে পূজোর শুভেচ্ছা জানিয়ে ছবি আঁকা হতো, কাঁচা রঙের গন্ধটা কেমন যেন নেশা ধরাতো। মুসলমান হয়েও ঈদের চেয়ে পূজার জন্যে বেশি অপেক্ষা ছিল, কারণ আতশবাজী কেনার সুযোগ শুধু দূর্গাপূজা আর লক্ষ্মীপূজোতেই মিলতো।

এখন পূজোর আগমনী সঙ্গীত বদলে গেছে। ঢাকের শব্দে বা কাঁচা রঙের গন্ধে এখন পূজো আসে না, দূর্গাপূজার সময় ঘনিয়ে এসেছে, এটা বোঝা যায় মন্দিরে হামলা করে প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পেলে। এইতো, দু’দিন আগেও হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে এক মন্দিরে হামলা হলো, পূজার জন্যে বানানো প্রতিমাগুলো ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হলো। খবরটা চোখে না পড়লে মনেই পড়তো না যে কয়েকদিন বাদেই দূর্গাপূজা শুরু হচ্ছে! ভাংচুরকারীদের ধন্যবাদ, গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতাটা বজায় রাখার জন্যে।

বাংলাদেশই বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবের আগে তাদের উপাসনালয়ে হামলা করা হয়, ভাংচুর চালিয়ে তাদের প্রার্থনার উপকরণ নষ্ট করা হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানেরা নির্যাতনের শিকার হন, এই কথা মাথায় রেখেও বলছি, নামাজের সময় মসজিদে হামলা হয়েছে- এমন কোন ঘটনা ভারতে ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না।

প্রতি বছরই পূজার আগে এমন অজস্র ঘটনা ঘটে, পত্রিকার পাতা খুললেই দেখবেন, অমুক জায়গায় মন্দিরে হামলা, তমুক জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুর- কিন্ত এসব অপরাধে দোষীরা ধরা পড়ে না, কেউ ধরা পড়লেও খুব বেশিদিন তাকে আটকে রাখা যায় না। কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত, তারা চাইলেই মন্দির ভাংতে পারে, প্রতিমা ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে পারে। গাইবান্ধা থেকে রংপুর, কুড়িগ্রাম থেকে গাজীপুর, কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে হবিগঞ্জ- কোথাও এমন কোন উদাহরণ পাবেন না, যেখানে অপরাধীর বিচার হয়েছে।

প্রতি বছরই একই চিত্রনাট্য, কোন পরিবর্তন নেই তাতে। হামলাকারীরা ভাঙচুর করে, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন হয়তো বিচার চেয়ে একটা মানববন্ধন করে, থানা-পুলিশ কিংবা রাজনৈতিক নেতা থেকে সরকারী কর্তা- সবাই বলেন ‘অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে, কোন ছাড় দেয়া হবে না…’ সেই পুরনো গৎবাঁধা বুলি। পরের বছর আবারও প্রতিমা ভাঙচুরের খবর আসে পত্রিকায়, ধ্বংসস্তুপ হয়ে থাকা চাতালের ওপরেই আবার নতুন করে উৎসবের আয়োজন করেন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো, তাদের মা দূর্গাকে তো বরণ করে নিতে হবে। এটাকেই নিয়তি ধরে নিয়েছেন তারা, এই দেশে থাকতে হলে এগুলোর মধ্যে দিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।

ইসলাম কখনও অন্য ধর্মের ওপর জুলুম করার কথা বলেনি, অন্য ধর্মাবলম্বীদের নির্যাতন চালাতে নিষেধ করেছে বারবার। অথচ আমাদের দেশের কিছু নরপিশাচ এই ইসলামের নাম ব্যবহার করেই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের জন্যে উস্কে দেয় একদল মানুষকে। আর হাঁটুতে মগজ নিয়ে ঘোরা সেই উজবুকগুলোও ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা শুনে কোনটা ভালো কোনটা মন্দ সেই বিচার না করে ধর্মরক্ষার জন্যে লাঠি হাতে বেরিয়ে পড়ে। ওয়াজের নামে ঘৃণা ছড়ানোর মহোৎসব বসে গ্রামে-গঞ্জে, হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধরা কত খারাপ সেটার রসালো বর্ণনা দেয়া হয় সেসব ওয়াজে। সাম্প্রদায়িক সম্পৃতি নষ্ট করা এসব বক্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না, অথচ মামলা হয় কোথাকার কোন তাহেরীর বিরুদ্ধে!

মন্দিরের এই হামলাগুলো কেউ অন্য গ্রহ থেকে এসে করে দেয় না, প্রতিমা ভাঙচুরের কাজটাও ইজরাইল-আমেরিকার নয়। এরা আমাদের আশেপাশেই থাকে, তাদের খুঁজে বের করাটাও কঠিণ কোন কাজ না। সমস্যা হচ্ছে, আমরা এদের খুঁজে বের করতে চাই না হয়তো। কি দরকার এত ঝামেলা করে? সংখ্যালঘুদের এত খোঁজ রাখার কি আছে? পাঁচ বছর পরপর ভোটের সময় গিয়ে দু-চারটে ভালোমন্দ কথা বললেই হবে, ভোট দিতে না চাইলে ভয়-ভীতি দেখানো তো আছেই।

আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি, নেতারা হাতে মাইক পেলে আবেগ নিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়বার কথা বলেন, সেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ হবে কিভাবে যখন এদেশে প্রতিবছর মন্দির ভাঙ্গার উৎসব হয়? এই ঘটনাগুলোর বিচার না হলে, উচিত শাস্তি না হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ তৈরি করতে না পারলে শুধু আবেগ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কথা বলাটা বড় ধরণের রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button