সিনেমা হলের গলি

যে মানুষটা আমাদের হাসিয়েছেন, তার হাসির খবর আমরা রেখেছি কি?

কমেডির নামে বাংলা নাটক সিনেমাতে যা হয় তাকে এক কথায় ভাঁড়ামি বলা বোধহয় ভুল হবেনা। খুব জাতের কৌতুক অভিনেতা এই মুহুর্তে চোখে পড়েনা। বিশেষত সিনেমাতে তো নয়ই। অথচ, আমাদের দেশে একজন অসাধারণ কৌতুক অভিনেতা আছেন। যিনি আমাদের অসংখ্যবার হাসিয়েছেন বিভিন্ন সিনেমায় কমেডিয়ান রোল প্লে করে। আমাদের হাসানো সেই মানুষটার মুখেরই হাসি আজ নিভু নিভু, ভাল নেই তিনি। শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন হাসপাতালের বিছানায়। থাকতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের আইসিইউতে। শারীরিক অবস্থা ওঠা নামার মধ্যে আছে।

বিক্রমপুর জেলায় এই মানুষটা জন্মেছিলেন ১৯৪৫ সালে। পড়ালেখা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায়। রুপালী পর্দায় আসেন ১৯৭৩ সালে “কার বউ” চলচ্চিত্র দিয়ে। তার আসল নাম আবদুস সামাদ হলেও সিনেমার জন্য টেলি সামাদ নামটি গ্রহণ করেন। নামটি তাকে দেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের ক্যামেরাম্যান মোস্তফা মামুন। এই নামটিই আসলে ইতিহাস হয়ে যায় বাংলাদেশের সিনেমা জগতে বিশেষ করে কমেডিয়ান চরিত্রের হিসেবে।

একটা সময় প্রয়াত জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা দিলদারের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন এই গুণী শিল্পী। কয়েকশত সিনেমায় তাকে দেখা গেছে কমেডিয়ান হিসেবে। আমরা ছোটবেলায় যারা বিটিভিতে সিনেমা দেখতাম, তাদের কাছে বেশ আপন এই মানুষটি। অভিনয়ের “অ” না বুঝলেও খিলখিল করে হাসতাম পর্দায় এই মানুষের কান্ডকারখানা দেখে।

অবশ্য এই কাজ তিনি পর্দার বাইরেও কম করেননি। ছোটবেলায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কৌতুক চর্চার খেলা খেলতেন। আশেপাশের মানুষকে সবসময়ই তিনি কিছু না কিছু বলে হাসানোর চেষ্টা করতেন। বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করেও মানুষকে আনন্দ দিতেন। এরকম একজন মানুষের পক্ষে তাই পর্দায় কমেডিয়ান হিসেবে কাজ করা কঠিন কিছু নয়।

তিনি যখন সিনেমাপাড়ায় এলেন, তখন বেশ আলোচনা হলো। সবাই বলতে লাগলো, অনেকদিন বাদে ঢাকাই সিনেমায় একজন ভাল কৌতুক অভিনেতা পাওয়া গেল। কমেডিয়ান ছাড়া দুই একবার নায়ক হিসেবেও যে অভিনয় করেননি তা নয়, তবে মানুষ তাকে পছন্দ করে ফেলেছিল তার সহজাত কৌতুক অভিনয়ের জন্যেই।

বর্তমান কালের সিনেমা এবং কমেডিয়ান চরিত্রগুলো নিয়ে তার অভিমান। সিনেমায় আজকাল কমেডিয়ান রোলও খুব একটা থাকে না। যা থাকে সেখানে জাতের অভিনয়ের দেখাও খুব একটা পাওয়া যায় না। আজকাল সব কিছুতে তাড়াহুড়ো। অথচ, এমনও সময় গেছে একটা শট পারফেক্ট করতে তিনি নব্বুই বার দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে। টেলি সামাদ মনে প্রাণে একজন শিল্পী। তাই এখনকার সময়ে তিনি খুঁজে ফিরেন শিল্পীস্বত্তাকে। খুব বেশি দেখতে পান না অবশ্য।

তাই অভিমান নিয়েই এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “সবাই এখন টাকার পিছনে ছুটছে। কীসের শিল্প, কীসের আর্ট! ফেসবুকে খোলামেলা ছবি প্রকাশ করে আলোচনায় আসছে, তারকা খ্যাতি, গাড়ি-বাড়ি হাঁকাতে চাচ্ছে! দিন শেষে দেখা যাচ্ছে এরা হারিয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে এত সংকট। পত্রপত্রিকার মারফাত জানছি, এখন এক নায়কনির্ভর আমাদের ইন্ডাস্ট্রি। একজন নায়ক কখনও একটা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে না। তাই আমাদের শিল্পী দরকার।”

বলা হয়, মানুষকে হাসানো নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ৷ এই কাজের শিল্পী টেলি সামাদের প্রতি তাই শর্তহীন একটা ভালবাসা তো আমাদের সবার মধ্যেই আছে, অন্তত যারা আমরা তাকে দেখেছি সিনেমায়, যারা হেসেছি তার হাস্যোজ্জ্বল পরিবেশনায়। আমাদের চারপাশের চেনা বলয়ের অনেকেই আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এমন একটা সময়ে তাই যখন শুনি টেলি সামাদও অসুস্থ, তখন খারাপ লাগে। তার সুস্থতা কামনা করি। দ্রুত আরোগ্য লাভ করুন তিনি এটাই কামনা।

( আজ তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন, সবাইকে হাসানো মানুষটা কান্নার কারণ হলেন আজ…)

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button