এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

কাশ্মীরের কান্না: মোদি মিডিয়া বনাম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

প্রায় একমাস হয়ে এসেছে, সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে দিয়ে কেড়ে নেয়া হয়েছে কাশ্মীরের বিশেষ অধিকার, রাজ্য থেকে কাশ্মীর পরিণত হয়েছে কেন্দ্রিশাসিত এক অঞ্চলে, সেখান থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে লাদাখকে। কেন্দ্রীয় সরকারের সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কাশ্মীরে এখন প্রতিদিনই বিক্ষোভ হচ্ছে। সেনা, পুলিশ আর প্যারামিলিটারিতে গিজগিজ করছে উপত্যকা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি নিরাপত্তারক্ষী। তবুও আর্টিকেল-৩৭০ বিলোপের প্রতিবাদে রাস্তায় নামছে কাশ্মীরের জনগন। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে প্রতিনিয়তই সংঘর্ষ হচ্ছে তাদের, ঘটছে আহত-নিহত হবার ঘটনা। অথচ ভারতীয় টিভি চ্যানেলে এসবের কোন উত্তাপই নেই!

কাশ্মীরে ইন্টারনেট পরিসেবা বন্ধ সেই একমাস ধরেই, মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধ করে রাখা হয়েছে বেশিরভাগ অঞ্চলে। শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা এখনও গৃহবন্দী। যেসব কাশ্মীরিরা কাশ্মীরের বাইরে আছেন, তারা যোগাযোগ করতে পারছেন না নিজেদের পরিবারের সঙ্গে। কাশ্মীরের লোকজনকে শুক্রবারে জুম্মার নামাজ আদায় করার জন্যে মসজিদে ঢুকতে হচ্ছে আইডি কার্ড দেখিয়ে। কাশ্মির ভালো নেই, ভূস্বর্গ নামে যে জায়গাটাকে সবাই জানে, সেখানকার মানুষগুলো ভালো নেই। কিন্ত সেই ভালো না থাকার গল্পগুলো মিডিয়াতে উঠে আসছে কতটুকু?

ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলোতে কাশ্মীরের খবর নিতে গেলে অবাকই হতে হবে। হলুদ সাংবাদিকতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে তারা, তাদের মতে, কাশ্মীরের সর্বত্র শুধু শান্তি আর শান্তি, কোথাও কোন দ্বিমত নেই সরকারের সঙ্গে, চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত নাকি খুশিমনেই মেনে নিয়েছে কাশ্মীরের জনগণ! উল্টো কখনও বিক্ষোভের খবর প্রকাশ করলেও, সেখানে আন্দোলনরত কাশ্মীরিদের সরাসরি ‘টেরোরিস্ট’ হিসেবেই আখ্যায়িত করছে টিভি চ্যানেলগুলো। এক এনডিটিভি বাদে বাকী সব টেলিভিশন চ্যানেলই গা ভাসিয়েছে এই স্রোতে, মোদি সরকারের আনুকূল্য পাবার জন্যে নিজেদের পরিণত করেছে গোদি মিডিয়ায়।

তবে বিবিসিকে কিনে নেয়া সম্ভব হয়নি, তারা গোদি মিডিয়ার ভীড়েও নাম লেখায়নি। আল জাজিরা কিংবা রয়টার্সও শুরু থেকেই কাশ্মীর পরিস্থিতি নিয়ে ভেতরের খবরটা জানার চেষ্টা করেছে, কাশ্মীরি জনগণ ৩৭০ ধারা বাতিলের সিদ্ধান্তটাকে কিভাবে গ্রহণ করেছে, তাদের ক্ষোভ, তাদের বঞ্চনাগুলোকে ক্যামেরায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। বিক্ষোভের কেন্দ্রে ঢোকা সম্ভব হয়নি সবসময়, কিন্ত ছবিসহ খবর হাজির করতে পেরেছে তারা, সেখানে উঠে এসেছে, প্রতিবাদী কাশ্মীরি জনগণের ওপর ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর অকথ্য নির্যাতনের ঘটনাগুলো।

বিবিসি-র একটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় রাতে অভিযান চালিয়ে তরুণদের ধরে বেদম মার, এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার পন্থা নিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। সেনাদের গুলিতে যারা নিহত হয়েছে, তাদের ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করা হচ্ছে না। প্রশাসন অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বরাবরের মতোই লিখিত ভাবে এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবী করা হয়েছে, বিবিসি-কে বলা হয়েছে, জওয়ানেরা কোনও স্থানীয়কে মারধর করেনি। তেমন কোনও অভিযোগও তাদের কাছে আসেনি। লিখিত বিবৃতিতে বলা বয়েছে, ‘পেশাদার বাহিনী হিসেবে মানবাধিকারকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয় ভারতীয় সেনারা।’

অকথ্য নির্যাতনের শিকার এক কাশ্মীরি তরুণ

কাশ্মীরের দক্ষিণাঞ্চলের এক গ্রামে গিয়েছিলেন বিবিসির সংবাদকর্মীরা, সেখানেই তারা পেয়েছেন সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত একই পরিবারের দুই ভাইকে। তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে সেনাবাহিনী বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযান চালায়। ঘুম থেকে তুলে আটক করে দুর্গম এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। গ্রামের আরও বেশ কয়েকজনকে সেখানে আগেই নেওয়া হয়। ওই দুই সহোদরের একজন বলেন, ‘তারা হঠাৎই আমাদের মারধর শুরু করলেন। তাদের কাছে জানতে চাইলাম, আমাদের দোষ কী? কিন্তু তারা আমাদের কোনো কথাই শোনেননি। তারা আমাদের পেটাতেই থাকলেন।’

‘অসহ্য যন্ত্রণায় চিৎকার করছিলাম আমরা। কান্নার আওয়াজ থামাতে আমাদের মুখে কাদা লেপে দেওয়া হয়। কাপড়চোপড় খুলে রড ও লাঠি দিয়ে আমাকে আর আমার ভাইকে নির্মমভাবে পেটায় তারা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে নির্যাতন। আমি যখন চেতনা হারিয়ে ফেলি, তখন আমাকে জাগিয়ে তুলতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। নির্যাতনের যন্ত্রণা সইতে না পেরে তাদের বলেছিলাম, নির্যাতন না করে একেবারে গুলি করে মেরেই ফেলুন।’

অবরুদ্ধ কাশ্মীরে ফাঁকা পথঘাট

এই নির্যাতনের ঘটনাগুলো সাধারণ কাশ্মীরিদের মনে জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতির জন্ম দিচ্ছে বলেও বিবিসির সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার এক তরুণ কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন- ‘তারা (সেনাবাহিনী) যদি আবারও আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে, তাহলে আমি যেকোনো কিছু করতে পারব। আমি হাতে অস্ত্র তুলে নেব। আমি প্রতিদিন এটা সহ্য করতে পারব না।’

এই নির্যাতনের ঘটনাগুলো ভারতীয় মিডিয়াতে পাওয়া যাবে না, হৃদয়বিদারক এই গল্পগুলো তারা দেশের মানুষকে জানতে দেবে না। সেখানে রামমন্দির নিয়ে আলাপ হবে, হিন্দু-মুসলমানের জাতিগত ভেদাভেদ টেনে আনা হবে, উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের স্ত্রী থেকে নরেন্দ্র মোদির মাশরুমপ্রীতি, সবকিছু নিয়েই আলোচনা হবে- শুধু উঠে আসবে না কাশ্মীরি জনগণের কান্নার খবর। কেউ জানতে চাইবে না, ৭০ লক্ষ মানুষ গত একমাস ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যে মানবেতর জীবন যাপন করছেন, এটা তাদের প্রাপ্য ছিল কিনা।

Featured Image Credit- Reuters

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button