ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

আহারে, আহারে!

খন্দকার নজরুল ইসলাম বাবুল। আমাদের জাতীয় কবির নামে নাম থাকা এই ভদ্রলোক বিখ্যাত কেউ না। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নলসোন্দায় জন্মানো এই ভদ্রলোক ছিলেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার মাকড়খোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাবুল সাহেবকে কিছুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না, আজকে তার মৃতদেহ পাওয়া গেছে করতোয়া নদীর গাড়াদহ ব্রিজের রেলিং থেকে ঝুলন্ত অবস্থায়। উনার পকেটে পাওয়া নোটবুকে লেখা ছিল দেনার দায়ে তিনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।

৫৫ বছরের একজন মানুষ সুখে দেনা করেন না। নিশ্চয় পরিবারের মানুষকে খাওয়ানোর জন্য দেনা করতে হয়েছে তাঁকে। হয়তো তার স্কুলের বেতন কোনো কারণে বন্ধ ছিলো, হয়তো উনার ছেলে/মেয়েকে বিয়ে দিতে উনার ধার করতে হয়েছে; হয়তো বা অন্য কিছু। আমরা জানি না, আমরা আসলে জানতেও চাই না। এইরকম কতো বাবুল আছে আমাদের দেশে। এদের স্কুলে বেতন হয় না, গ্রামে গ্রামে টিউশনির টাকা জীবন চলে না। এরা দেনা করেন, দেনা শোধ করতে না পেরে ঝুলে পড়েন গলায় দড়ি দিয়ে।

২১শে ফেব্রুয়ারি আসলেই ভাষা নিয়ে নানা ধরনের ‘কাবযাব’ করা হয়, তবে ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো আমাদের বইমেলা। শত শত লেখক, হাজার হাজার বই; বইয়ের লিস্ট নিয়ে বইমেলার স্টলে স্টলে ঘোরার মতো আনন্দের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। এই ভাষার জন্য, নিজের মাতৃভাষায় কথা বলার জন্য জীবন দেয়া আমরাই ভাষার আম্মুকে আব্বু করে দিচ্ছি। ভাই হয়ে গেছে ‘ব্রো’, দুলাভাই হয়েছে ‘জিজা’ বা ‘জিজু’! তারপরও সমস্যা নেই, অন্তত তো মুখে বলতে পারছি আমরা, বাবুল সাহেবরা কাউকে বলতেও পারেননি। গাড়াদহ ব্রিজ থেকে ঝুলে পড়ার আগে বাবুল সাহেব তাঁর ব্যক্তিগত নোটবুকে বলে গেছেন তাঁর না বলতে পারা কথা। সমাজে যার সবচেয়ে উঁচু স্থানে থাকার কথা সেই শিক্ষক বলে গেছেন তাঁর ছোট হয়ে যাওয়ার কথা, ছোট হয়ে থাকা জীবনকে শেষ করে দেয়ার কথা।

আমার নিজের মা একজন শিক্ষক, জন্মের পর থেকেই আমি দেখছি প্রতিদিন আমার মাকে স্কুলে যেতে। এই কারণেই হয়তো কোনো শিক্ষকের কিছু হলে আমার নিজের গায়ে লাগে। এই দেশে অনেক কম বেতনে চাকরি করা বাবুল সাহেব, আমার মা’র মতো শিক্ষকরা বেঁচে আছেন। অল্প কয়েকটা টাকা মাসিক বেতনে নিজের সমস্ত স্বপ্ন চাপা দিয়ে হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে স্বপ্ন দেখাতে শিখাচ্ছেন, তাঁদের নিজেদের অপূরণীয় স্বপ্নগুলা পূরণ করার তাগিদ ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন বাচ্চাদের মধ্যে অথচ তাঁদের স্বপ্নের কথা, কষ্টের কথা এই ভাষার মাসেও ভাষায় প্রকাশ করতে পারেননি।

আহারে, আহারে!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button