ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

শিক্ষককে এভাবে লাঞ্ছিত করা তো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মধ্যে পড়ে না…

শিক্ষক তীব্র মনোবেদনা নিয়ে বলছিলেন, “এসব সন্তানতুল্য ছেলেদের হাতে বারবার লাঞ্ছিত হয়ে আমরা যেন মরে গেছি।”

একজন শিক্ষক কতটা মানসিক কষ্ট পেলে এভাবে বলতে পারেন, তা সংবেদনশীল মানুষ মাত্রই বুঝতে পারবেন। পশু হলে আলাদা কথা। কেউ কেউ মানুষরুপী পশু হয়। যেমন পশুরুপে আবির্ভূত হয়েছিল সাতক্ষীরা আশাশুনি সরকারি কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি আশরাফুজ্জামান এবং তার সহযোগীরা। তাদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন কলেজটির অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান।

সাতক্ষীরা

কেন অধ্যক্ষ এভাবে মার খেলেন, আক্রমণের শিকার হলেন?

ঘটনাটি শনিবারের। সেদিন মিজানুর রহমান নিজের অফিসে কাজ করছেন। এসময় একজন ছাত্রলীগ নেতা অধ্যক্ষকে রুমের বাইরে আসতে বলে। মিজানুর রহমান রুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী একটি ছেলেকে মারধর করছে।

জানা গেল, সেই ছেলেটি নাকি বাইরে থেকে এক মেয়েকে এনে কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে অনৈতিক আচরণ করছে। এমনটাই অভিযোগ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের। মেয়েটি ছাত্রলীগ নেতাদের কি মারার দায়িত্বে লাগিয়েছে নাকি স্বপ্রণোদিত হয়েই এমন সমাজকর্ম তারা করছিলেন কে জানে! যেখানে গণপিটুনিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানোর বেশ কটি ঘটনার রেশ এখনো আছে। এসময় এসে সরকার পর্যন্ত বাধ্য হয়েছে এই এনাউন্সমেন্ট দিতে যে, কেউ যেন কোনো অবস্থায় আইন নিজের হাতে না তুলে নেন।

সাতক্ষীরার আশাশুনি সরকারি কলেজের ছাত্রলীগ নেতারা কি একটু বেশিই ‘সমাজসেবক’ নাকি আইন তাদের হাতের মুঠোয় যে কয়েকজন মিলে একজন মারধোর করতে তাদের বিবেকে বাঁধে না! যাহোক, নিঃসন্দেহে ছেলেটি যদি কোনো মেয়েকে উত্যক্ত কিংবা অনৈতিক কোনো আচরণ দ্বারা বিরক্ত করার চেষ্টা করে সেটি ঘৃণ্য কর্ম। এই অপরাধের জন্যে তাকে আইনের হাতে দেয়া যেতে পারে, কিংবা ছেলের বাবা মা ডেকে এনে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

অধ্যক্ষ ঠিক এই কাজটাই করতে চেয়েছেন। তিনি সেই ছেলের অভিভাবককে ফোন করে ডেকে আনেন। একই সময় পুলিশও আসে। পুলিশ মুচলেকা নিয়ে ছেলেটিকে ছেড়ে দেয়৷

শিক্ষককে আক্রমণ করা ছাত্রলীগ নেতা

এতেই অধ্যক্ষের উপর মূলত ক্ষীপ্ত হন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। কেন ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে সেই ছেলেকে তুলে দেয়া হলো না, কেন ছেলেটিকে ছেড়ে দেয়া হলো এই কৈফিয়ত তারা চাইতে আসেন অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানের কাছে। কৈফিয়ত চাইতে এসে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি আশরাফুজ্জামান তাজ ও তার সহযোগী শাওন, আল মামুন ও সাইফুল্লাহসহ ৭-৮ জন ছাত্রলীগ কর্মী মিজানুর রহমানের কক্ষ ভাঙচুর করেন, মিজানুর রহমানের গায়ে হাত তুলেন। তারা রুমের জানালার গ্লাস, চেয়ার টেবিল ভাঙ্গেন, ইট পাটকেল ছুঁড়েন সন্ত্রাসীদের মতো। বিভীষিকার সৃষ্টি হয় সেখানে।

মিজানুর রহমান বিবরণ দেন এভাবে, “তাদের হামলার সময় পরপর তিনবার হামলার শিকার হই আমি। আমাকে চড় কিল-ঘুষি মেরে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। সহকর্মী শিক্ষকরা হামলাকারীদের কবল থেকে আমাকে রক্ষার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। সহকর্মীরাও লাঞ্ছিত হয়েছেন।”

ছাত্রলীগ নেতারা মেরেই খুশি হননি। তারা অধ্যক্ষকে এও হুমকি দিয়ে গেছেন যে, “এখানে চাকরি করতে হলে আমাদের কথা মতো চলতে হবে। না হলে সাইজ করে দেব।”

ছাত্রলীগের মূলনীতি শিক্ষা শান্তি প্রগতি। এই ঘটনায় মূলনীতির সব নীতিই ভূলন্ঠিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা মুজিবের সৈনিক, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী ইত্যাদি পরিচয় নিজেদের দিয়ে থাকেন সচারাচর – কিন্তু তাদেরকে কেউ কি জিজ্ঞেস করে দেখবেন এখানে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ঠিক কোথায় প্রতিফলিত হলো? কি এমন সুকাজ তারা করলেন যে তাদের মুজিবের সৈনিক বলা যাবে? বঙ্গবন্ধুর নাম, ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের নাম এভাবে তো ধ্বংস করছেনই, উপরন্তু শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট করছেন। এই লাইসেন্স তাদের কে দিয়েছে? এই ক্ষমতা কোন জায়গা থেকে আসে তাদের!

পুলিশ ছাত্রলীগ নেতা আশরাফুজ্জামান তাজ ও আল মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, অধ্যক্ষের উপর আক্রমণকারী এসব আদর্শহীন কথিতনেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রেরও কর্তব্য৷ এছাড়া, সাংগঠনিকভাবে এই অপকর্ম যারা করে তাদেরকে জবাবদিহিতা এবং আজীবনের জন্যে সংগঠন থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত। বঙ্গবন্ধু আজ বেঁচে থাকলে নিশ্চিত লজ্জা পেতেন এরকম কথিত নেতা দেখে। বিদ্রুপ করে হয়ত বলতেন, খুব বড় নেতা হয়ে গেছিস দেখছি, শিক্ষককেও ছাড়িস না!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button