ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

তারা মিয়া পঙ্গু, আর রাজনীতি অন্ধ!

নগর পুড়লে নাকি দেবালয় এড়ায় না। রাজনীতি যখন অসুস্থ হয় তখন সাধারণ ভিক্ষুকও তাই রেহাই পায় না। এই গল্পটা অবিশ্বাস্য, এই গল্পটা একজন নিরপরাধ, পঙ্গু তারা মিয়ার গল্প। সুনামগঞ্জ নিবাসী তারা মিয়া, যে শারিরীকভাবে পঙ্গু। ডান হাত তার অস্বাভাবিক রকম চিকন। নাড়াতেই কষ্ট হয়। এই হাত দিয়ে তাই কোনো কাজ করতে পারেন না। বাম হাত তো জন্মগতভাবেই বাঁকা। তুলনামূলক লম্বা। ডান হাত দিয়ে সবাই ভাত খেলেও, তারা মিয়ার সেই সুবিধা নেই। কোনোরকম কষ্ট করে বাম হাত দিয়ে ভাত খায় সে। পেশায় একজন ভিক্ষুক। এই পঙ্গু মানুষকে কেউ দাম না দিলেও পুলিশ তাকে বিশেষ ইজ্জত দিয়েছে। পুলিশের চোখে তারা মিয়া পঙ্গু নয়, সুপারম্যান। পুলিশ কল্পনা করে দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখেছে, তারা মিয়া তাদের উপর হামলা করেছে। এমন সুপারম্যানের উপর পুলিশ স্বভাবতই তাই মামলা ঠুকে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৮ ডিসেম্বর। নির্বাচনের দুইদিন আগের ঘটনা। পুলিশের অভিযোগে বলা হয়েছে, সেদিন মল্লিকপুর বাজারে পুলিশের উপর আক্রমণ হয়। পুলিশ ৫২জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করে। মামলার বিবরণীতে রয়েছে, ২৮ ডিসেম্বর বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে অভিযুক্তরা অবৈধভাবে মল্লিকপুর বাজার এলাকায় জড়ো হয়ে “ধানের শীষের” পক্ষে মিছিল বের করে। তারা রাস্তা আটকায় এবং পুলিশের ওপর আক্রমণ করে। এতে অভিযোগকারীসহ ৫জন পুলিশ সদস্য আহত হন।

৫২ জনের একজন পঙ্গু তারা মিয়া। অভিযোগে উল্লেখ তারা মিয়া পুলিশের উপর আক্রমণ করেছে। খালি হাতের মামুলি আক্রমণ না, পঙ্গু তারা মিয়া যে ভাতই খেতে পায়না ঠিকমতো নিজের হাতে, ডান হাত যার একেবারে অকেজো, বাম হাত যার বেঁকে গেছে জন্মের পর থেকে, সেই তারা মিয়া নাকি হকিস্টিক, চাপাতি, লোহার রড দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করেছে।

তারা মিয়াও যেন বেক্কল হয়ে গেছেন। তিনি ডেইলি স্টারের সংবাদদাতাকে বলেন, “আমার হাতের যখন এই অবস্থা তখন আমি কীভাবে পুলিশকে আক্রমণ করতে পারি? একদিকে ডান হাত ব্যবহার করতে পারি না, অন্যদিকে, বাম হাতটাও তেমন কাজ করে না। আমি রাজনীতি করি না। আমি ভিক্ষা করে জীবন চালাই আমার পরিবারের অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”

৪৫ বছর বয়সী পঙ্গু তারা মিয়াকে কেন এই দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে? এই অবদান কার? অসুস্থ রাজনীতির ছোবলে তারা মিয়ার মতো সাধারণ মানুষ বলি হবে কেন? রাজনীতি অন্ধ বলেই তারা মিয়ারাও রেহাই পায় না।

তারা মিয়া রাজনীতিবিদদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হলে তাকে ভিক্ষা করে খাওয়া লাগত না। এই রাজনীতিতে যেমন তারা মিয়ার গুরুত্ব নাই, তেমনি তারা মিয়াও রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে ধানের শীষও বোঝে না, নৌকাও বোঝে না। হয়ত একারণেই তাকে বলি বানানো সহজ। এই ঘটনার পর ধানের শীষের লোকেরাও হয়ত তাকে নিয়ে রাজনীতি করবে। সরকারকে ব্লেম দিবে। কিন্তু, তাতে তারা মিয়ার জীবন বদলাবে না। তারা মিয়া ভিক্ষুকই থেকে যাবে। নৌকার লোকেদের কাছেও তারা মিয়ার অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ না। হলে নিশ্চয়ই তারা মিয়াকে এভাবে ফেঁসে যেতে হতো না। তারা মিয়া হয়ত পঙ্গু, কিন্তু এই রাজনীতি আসলে অন্ধ।

লিমনের ঘটনা মনে পড়ে। ২০১১ সালে ১৬ বছরের কিশোর ছিল সে। র‍্যাবের কথিত বন্দুক যুদ্ধে সে তার পা হারায়। পঙ্গু হয়। এক পা কেটে ফেলা হয়। তবুও সে রেহাই পায়নি। তার নামে দুইটি মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একটি অস্ত্রমামলা, আরেকটি সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগ। র‍্যাব তাদের কল্পনা দিয়ে লিমনকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধবাজ এক কিশোর রুপ্ব দেখে, নিরস্ত্র লিমনকে তার ঐশ্বরিক ক্ষমতা দিয়ে সরকারি কাজে বাধা দিতে দেখে বোধহয় র‍্যাব। সেই বছর সে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি। তার জীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠে। নিরীহ লিমন তার কপালের ফেরে বন্দুক যুদ্ধে পা হারায়। র‍্যাব নিজেদের ভুল ঢাকতে তাকে সন্ত্রাসী বানাতে উঠে পড়ে লাগে। সেই লিমন পরে মামলা থেকে অব্যাহতি পায়, কিন্তু হারায় তার একটা পা। হারায় জীবনের কিছু সোনালী সময়৷

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে যারা এমন অসীম কল্পনা শক্তির অধিকারী হন, তারা এই পেশা থেকে অবসর নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কেন আসেন না? তারা তাদের কল্পনায় যাকে তাকে সুপারম্যান ভেবে যেভাবে ফাঁসিয়ে দেন, এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে কবে? অন্ধ রাজনীতি, কাল্পনিক ক্ষমতার অধিকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় লোক ক্ষমতাহীনকে মানুষকে ‘সুপারম্যান’ বানিয়ে ভিক্টিম করবে আর কতদিন!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button