সিনেমা হলের গলি

তানজারিন: যে কমলা কাশ্মীরের কথাও বলে

আপনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার কথা অনিবার্যভাবে জেনে থাকবেন। আপনি জেনে থাকবেন যুগ যুগ ধরে ঘনিয়ে আসা ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন দ্বন্দ্ব অথবা বহু বছর ধরে চলা সিরিয়া-ইয়েমেন সংকট। প্রতিবেশীর উদাহরণ টানলে আপনার জন্য সুবিধে হবে বোধকরি- ভারত, পাকিস্তান এবং ভূস্বর্গ কাশ্মীর। দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দুই পারমাণবিক রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধ। এই বিরোধ মাঝে মাঝে যুদ্ধে পরিণত হয়। সম্প্রতি কাশ্মীরের পুলওয়ামায় এক জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ৪২ জন জওয়ান। পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘জইশ-ই-মোহাম্মদ’ এ হামলা চালিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। ভারতজুড়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলছে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সম্ভবত আরেক বার যুদ্ধের প্রস্তুতি। বেশ কয়েকদিন আগে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণরেখায় (লাইন অব কন্ট্রোল) ভারতের বিমানবাহিনী এর জের ধরে হামলা চালায়।

এবার আসা যাক সিনেমার প্রসঙ্গে। সম্প্রতি ‘তানজারিনস’ নামক একখানা সিনেমা দেখা হল। চোখ দিয়ে নয়, যেন হৃদয় দিয়ে দেখা হল। অনুভূতির দরজা উন্মুক্ত করে ছবিখানা দেখলাম। শান্তির শাদা কবুতরের সুদুরে উড়ে যাওয়া দেখতে হল যেন সজল চোখে। তানজারিন মানে এক প্রকার ছোট কমলালেবু। যে কমলা যুদ্ধবিরোধী রং ছড়াতে চায় এবং চিড়ে চ্যাপ্টা জীবনের মাঝে বন্ধুত্বের গল্প শোনায়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তি হবার পরবর্তী কোন এক সময়কার জর্জিয়ান গৃহযুদ্ধ। সময়ের ক্যামেরায় বন্দী করতে চাইলে বলা যায় ১৯৯০ সালের ঘটনা। যুদ্ধের পাকচক্রে চেচেন ভাড়াটে সেনা এবং জর্জিয়ার এক সৈনিক আহত হয়ে আশ্রয় পায় কমলাচাষী এক বৃদ্ধের কুটিরে। দুই পক্ষের দুই সৈনিক পরস্পরকে খুন করতে পাশাপাশি দুই ঘরে ফন্দি আঁটতে থাকে।

দর্শকের কাছে একসময় জর্জিয়ান গৃহযুদ্ধকে বাস্তবিক অর্থে অশীতিপর বৃদ্ধের বেঁচে থাকবার লড়াই বলে মনে হয়। মনের সাথে যুদ্ধ। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়াবার যুদ্ধ। এমনকি প্রতিপক্ষ দুই শিবিরের দা কুমড়ো সম্পর্কের দুই আহত সেনানীর বিপক্ষে মুহুর্মুহু বচন যুদ্ধ। কড়া আতংকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া গ্রাম যে যুদ্ধের সাক্ষ্য দেয়। ছোট ছোট কমলালেবুর নিঃশ্বাসের সাথে হাড়জর্জর বৃদ্ধের বিশ্বাসের বিনির্মিত যুদ্ধের গল্প বলে তানজারিন।

আপনি বলকান যুদ্ধের কথা হয়তো জেনে থাকবেন। এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সার্বিয়ান, ক্রোয়াট, বসনিয়ান, চেচনিয়ান, কসোভান সহ বহু জাতি রয়েছে। প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা জাতিসত্তা। এদের মধ্যে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক পার্থক্যও প্রবল। তেমনই এক জাতি আবখাজিয়ান। এদের দশা ঠিক যেন কাশ্মীরের অধিবাসীর মতো। তারা শান্তিতে নিজের মতো করে থাকতে চায়। তারা যুদ্ধ চায় না, কিন্তু তাদেরকে কেন্দ্র করেই যুদ্ধের দামামা বাজতে থাকে। ইচ্ছেয় হোক অথবা অনিচ্ছায়, তারা গ্রাম ছাড়ে। তারা বিবাদমান দুই পক্ষের যেকোন একটিকে বেছে নেয়। পরিস্থিতি তাদের যুদ্ধবাজ করে তোলে। তবু এর মাঝেই ‘ইভো’র মতো কেউ কেউ উভয় পক্ষের জন্য শান্তির বার্তাবাহক হয়ে ওঠে। কেউ তার কথা শুনুক বা না শুনুক, সে তার কাজ করে যাবেই- এই তার ইস্পাতসম দৃঢ় প্রতীজ্ঞা..

২০১৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি এটি। এস্তোনিয়া ও জর্জিয়ার যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত সিনেমাটির মূল নাম ‘মান্দারিনিদ’। জনরা হল ড্রামা। হিস্টোরিক্যাল ড্রামা। ড্রামা করতে গিয়ে নির্মাতা বিরক্তির উদ্রেক জাগাননি, মেলোড্রামায় রূপান্তর করেননি, যা অনেকেই নিজের অজান্তে করে থাকেন। তিনি যা করেছেন, তা অনবদ্য পরিচালনার প্রমাণ দেয় আর যুগ যুগ ধরে ছানিপড়া নয়নের আলো ফিরিয়ে দেবার স্বাক্ষর রাখে। সেই ছানিপড়া চোখ হতে পারে দর্শক, পরিচালক অথবা যুদ্ধবাজ কোন শোষক শ্রেণীর।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button