খেলা ও ধুলা

দুঃখিত তামিম! আপনার সাথে একমত নই

আপনি বলেছেন – “আসলে কমবেশি যাঁরা ক্রিকেট বোঝেন, তাঁরা সবাই অন্তত এটা বুঝতে পারবেন, আমি যে আউটগুলো হয়েছি, সেগুলোতে টেকনিকের কোনো সমস্যা ছিল না। আমি ১২ বছর এই টেকনিক নিয়েই খেলছি। প্রচুর রান করেছি। ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে কেউ তিনবার আউট হয়ে গেলে তাতে টেকনিকের কোনো ব্যাপার থাকে না।”

কিন্তু, আপনার আউটগুলো কিন্তু এই বক্তব্য সমর্থন করে না! বরং আউটের রিপ্লে দেখে মনে হয়েছে আপনি মারাত্মক টেকনিক্যাল সমস্যায় ভুগছেন। অন্তত এবারের ইংল্যান্ডের ভয়াবহ স্লো পিচে আপনার টেকনিক মোটেও খুঁতহীন ছিল না। আমার সামান্য জ্ঞানে এক এক করে আউটগুলোর পর্যালোচনা করছি।

বাংলাদেশ বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা: সৌম্যের সাথের দারুণ সূচনা করলেন। প্রথম ৮ ওভারেই রান হল ৫৮! চেঞ্জে আসা ফেশুয়ায়ো’র প্রথম ওভারটা কি একটু দেখে খেলা যেত না?! রাউন্ড দ্যা উইকেটে শর্ট অব লেন্থের করা বলটি হালকা আউট সুইং করে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে আরামসে লিভ করতে পারতেন। অথচ, তা না করে আপনি শরীরের লাইনের বাইরে থাকা বল জোর খেলতে গেলেন। আপনার ফুটওয়ার্ক, হাই ব্যাক লিফট এবং শরীরের ভারসাম্য যার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।

ফলাফল: কট বিহাইন্ড!

বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড: দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে জয় পাওয়ার পর কিউদের সাথে ম্যাচটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কেননা, এই ম্যাচে দুই পয়েন্ট পাওয়া মানে ছিল সেমি সমীকরণ অনেকটাই আমাদের পক্ষে! ১৩ ওভারে ১ উইকেটের বিনিময়ে ৬০ নিঃসন্দেহে দারুণ সূচনা ছিল। আপনার দায়িত্ব ছিল ছন্দে থাকা সাকিবকে সাপোর্ট দিয়ে ইনিংসে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অথচ, আপনি কী করলেন? আগুন ঝরানো (১৪৪ কিমি গতি’র বল) ফারগুসনের গা বরাবর করা শর্টপিচ বলকে পুল করতে গেলেন! অথচ আপনি ছিলেন ফ্রন্টফুটে, শরীরের ভার পুরোটাই সামনের পায়ের উপর! ওভার দ্যা উইকেটে বল করার কারণে এমনিতেই ওকওয়ার্ড এঙ্গেল ছিল, তার সাথে যুক্ত হল ভয়ঙ্কর গতি এবং পুল করার মত শারীরিক ভারসাম্য ও জায়গার অভাব।
ফলাফল: ব্যাট হাতের মধ্যে ঘুরে গেল, কানায় লেগে সহজ ক্যাচ। বাংলাদেশ ব্যাকফুটে!

বাংলাদেশ বনাম ইংল্যান্ড: ইংল্যান্ডের ছুঁড়ে দেয়া পাহাড়সম রান তাড়া করছে বাংলাদেশ। তারমানে এই নয় যে উইকেট থ্রো করতে হবে। সাকিবের কারণে এবারও দলের শুরুটা মন্দ ছিল না। ১১.৫ ওভারে ১ উইকেটে ৬৩। মার্ক উডের প্রথম ৫ বলে ততক্ষণে ৮ রান হয়ে গেছে। আপনার কি ডাউন দ্যা উইকেট এসে চোখে বন্ধ করে মারতে যাওয়া উচিত হয়েছে?
হ্যাঁ, এই শটে আপনি অতীতে অনেক রান করেছেন, আগ্রাসন দেখিয়েছেন। কিন্তু ১৪০ কিমি গতিতে করা বলে এগিয়ে এসে বল না দেখেই মারতে গেলে হবে কী করে?! আপনি কিন্তু চাইলেই পয়েন্ট/গালি’র উপর দিয়ে বা গ্লাইড করে থার্ড ম্যানের উপর দিয়ে মারতে পারতেন (মাঠ অনেক ছোট ছিল!)। আসলে আপনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন পুলই করবেন!
ফলাফলঃ ব্যাটের কানায় লেগে শর্ট কাভারে দৃষ্টিকটুভাবে আউট এবং আবারও সেট হয়ে আউট হয়ে গেলেন!

বাংলাদেশ বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ: এই এক ম্যাচের ক্ষেত্রে বলতেই হচ্ছে আপনার কিছু করার ছিল না। কটরেলের দুর্দান্ত ফিল্ডিং এর কারণে আপনি রান আউট হয়েছেন।

বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়া: অনেকটা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ম্যাচের মতই পরিস্থিতি। হিমালয়সম রান তাড়া করছে বাংলাদেশ। আবারও ভাল সূচনা, মাত্র ২৪ ওভারেই আমাদের সংগ্রহ ২ উইকেটে ১৪৪। সেকেন্ড স্পেলে স্টার্ক এসেছে, আপনি ৬২ রানে অপরাজিত রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে লেন্থ বলকে থার্ডম্যানে পাঠিয়ে সিঙ্গল নেয়া অস্বাভাবিক নয়। অস্বাভাবিক হল আপনি যে শটটি খেলতে গেলেন। অফ স্ট্যাম্পের বেশ কাছের বলটি যেভাবে খেললেন সেটা না হল স্টিয়ার করা, না কাট, না ড্যাব করা। জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রায় দেড়শ’ কিমি গতির বলকে বাঁকা ব্যাটে খেলতে গেলেন।


ফলাফল: ইনসাইড এজ, বোল্ড! দল ব্যাকফুটে!

বাংলাদেশ বনাম আফগানিস্তান: বাংলাদেশ যদি অপশন দেয়া হত শুধু একটি ম্যাচ জিততে পারবে, তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে প্রায় সবাই আফগানদের বিরুদ্দের ম্যাচটিই বেছে নিত। কারণ, ওদের কাছে হারলে মান-সম্মানের প্রশ্ন চলে আসত। স্লো উইকেটে টসে জিতে ব্যাটিং নিয়েই আমরা মূল কাজটি সেরে রেখেছিলাম। তবে, ভাল সংগ্রহ করাটাও জরুরী ছিল। আপনি এবং সাকিব (হ্যাঁ, আবারও) ভালই এগোচ্ছিলেন। ১৬.৫ ওভারে ১ উইকেটের বিনিময়ে ৮২। এ সময় নবির বলে আপনি যে আউটটি হলেন, তা খুবই দৃষ্টিকটু ছিল।

নবি কিন্তু কখনই বিগ টার্নায় নয়, ওর শক্তিমত্তা হচ্ছে লাইন-লেন্থ এবং ব্যাটসম্যানকে রিড করার ক্ষমতা। ওর বড় অস্ত্র আর্মার। অথচ, উপমহাদেশের অন্যতম একজন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান হয়েও আর্মার বলটি আপনি রিডই করতে পারলেন না! সবচেয়ে বড় কথা হল বলটি আর্মার না হলেও আপনি বিপদে পড়তেন। আপনার ফুটওয়ার্ক, ব্যালান্স এবং হ্যান্ড আই কো-অর্ডিনেশন বলটি ড্রাইভ করার জন্য উপযুক্ত ছিল না। বল একটু টার্ন করলেও নির্ঘাত এজ হয়ে কিপারের হাতে বা স্লিপে ধরা খেতেন!
ফলাফল: বোল্ড!

বাংলাদেশ বনাম ভারত: স্লো পিচে ভারতের বড় স্কোর তাড়া করার জন্য ভাল সূচনা করার দরকার ছিল। আপনারা দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান করেছিলেনও তাই। ৯ ওভারে বিনা উইকেটে ৩৮ শুরু হিসেবে মন্দ নয়। আপনাদের একজনের (বিশেষ করে আপনার) লম্বা ইনিংস খেলা দরকার ছিল। অথচ, আপনি আবারও সেট হয়ে আউট হলেন!

পেসার, মিডিয়াম পেসারের বলে ড্যাব করে থার্ডম্যানে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য চাই ট্রু পিচ। স্লো পিচে এই ধরণের শট খুবই রিস্কি। বিশেষ করে বোলার যদি বুদ্ধি করে পেস ভেরিয়েশন করতে থাকে। আপনি এই শটটা প্রায়শই ফাইনার অঞ্চল দিয়ে পাঠাবার চেষ্টা করেন। যার মানে বেশি লেটে খেলেন এবং ব্যাটের ফেস বেশি ওপেন হয়। অর্থাৎ প্লেইড অন হবার চান্সও বেশি… শামি’র করা বলে ঠিক সেটাই হয়েছেন।
ফলাফল: ইনসাইড এজ, বোল্ড!

বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান: এই ম্যাচে তো আমরা শুরু থেকেই হেরে বসেছিলাম। দেখে মনে হচ্ছিল না কারও খেলায় মন আছে, সবাই যেন তাড়াতাড়ি ম্যাচ শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারলে বাঁচে! আপনিও ব্যতিক্রম ছিলেন না!

শাহিন আফ্রিদি’র যে বলে আউট হয়েছেন সেটায় আপনার ব্যাট এবং প্যাডের মাঝে যে গ্যাপ ছিল তা দিয়ে মার্সিডিজ বেঞ্চ চালানো যেত! এবারের পুরো টুর্নামেন্টেই আপনার ফুটওয়ার্ক ছিল ত্রুটিপূর্ণ। প্রায়শই আপনাকে ফ্রন্ট এবং ব্যাকফুটের মাঝামাঝি আটকে থাকতে দেখা গেছে। স্লোয়ার করা বলটি আড়াআড়ি খেলতে গিয়ে মিস করেছেন।
ফলাফল: বোল্ড!

সুতরাং, আমার দৃষ্টিতে আপনার টেকনিকে ভুল তো ছিলই এবং ”এমন এমন সব আউট হয়েছি, যেগুলো বেশির ভাগ সময় আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না” কথাটিও মানতে পারছি না। কারণ, আপনি বেশিরভাগ আউটই হয়েছেন নিজের দোষে, নিজের ভুলে। শুধু ক্যারিবিয়ানদের বিরুদ্ধে খেলা ম্যাচটি বাদে। ওটা ছিল একান্তই কটরেলের জিনিয়াস মোমেন্ট। কপাল খারাপ থাকলে ব্যাটসম্যান একশ’ বারে একবার এরকম আউট হয়।

তবে সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছি আপনার ”ব্যর্থ টুর্নামেন্টেও রানের গড় ৩০ থাকাটা খারাপ নয়!” কথাটা শুনে। পঞ্চ পাণ্ডবের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তারই একজন যদি এত অল্পতেই আত্মতুষ্টিতে ভোগে তাহলে দর্শক হিসেবে আমরা বড় হব কী করে?! পরবর্তী প্রজন্মের খেলোয়াড়দেরই বা কলিজা বড় হবে কী করে?! খেলায় তো বটেই, কথাতেও আপনাদের কাছে আরও বেশি পেশাদারিত্ব আশা করি।

তিক্ত সত্য হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপে আপনি মোটেও প্রত্যাশা অনুযায়ী ভাল করতে পারেন নি। তবে, সেটা কুসংস্কার, প্রস্তুতির অভাব, ফিটনেস, কন্ডিশন বা যে কারণেই হয়ে থাকুক না কেন – আমি নিশ্চিত আপনি আবারও দারুণভাবে ফিরে আসবেন। দেশের ক্রিকেটকে দেয়ার মত এখনও অনেক কিছুই আপনার স্টকে আছে। শুভকামনা রইল!

লেখক: জুনায়েদ কবির 

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button