খেলা ও ধুলা

আজ রাতে কোন রূপকথা নেই, যা আছে সবটুকুই ‘তামিম-গাঁথা’!

তামিম বলেছিলেন, কুমিল্লা ফাইনালে খেলবে। ফাইনালে উঠলে তিনি কি করবেন সেটা বলেননি। অবশ্য, ভূমিকম্প বা সাইক্লোন তো বলেকয়ে আসে না। আজ মিরপুর তামিমের ব্যাটে যে তাণ্ডবটার সাক্ষী হলো, সেটাকে হারিকেন-সাইক্লোন বা ভূকম্পন, কোনকিছুর সঙ্গেই কি মেলানো যাবে? ঢাকা ডায়নামাইটসের বোলারদের জিজ্ঞেস করুন, উত্তরটা তারাই ভালো দিতে পারবেন!

৬১ বলের ইনিংসে রান করেছেন ১৪১! ১১টা ছক্কা, দশটা চার! ৩১ বলে হাফসেঞ্চুরী, পঞ্চাশতম বলে শতক ছুঁয়েছেন, শেষ এগারো বলে রান তুলেছেন ৩৮! অমানবিক কীর্তিকলাপই না বললে আর কি বলা যায় এটাকে! পোলার্ড-রাসেল থেকে রুবেল বা সাকিব আল হাসান, কাউকেই গোণায় ধরেননি তামিম আজ, দিনটা শুধু নিজের করে নিয়েছেন। আর তামিমের দিনে প্রতিপক্ষের জন্যে তার চেয়ে ভয়ঙ্কর যে কোনকিছু যে হতে পারে না, সেটা আরও একবার দেখেছে মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেট!

চার ওভার শেষে কুমিল্লার স্কোর ছিল এক উইকেটে সতেরো রান। সেখান থেকে বিরুদ্ধ স্রোতে বৈঠা চালানো শুরু করলেন তামিম। একপাশে আনামুল হক বিজয় যখন রানের জন্যে সংগ্রাম করছেন, তামিম তখন স্ট্রোকের ফুলঝুরি ছড়াচ্ছেন উইকেটে। খানিকটা ধীরগতির পিচ, বল একটু দেরীতে আসছিল ব্যাটে। এই উইকেটে রান করা খুব বেশি কঠিণ নয়, কিন্ত তাই বলে ২৩২ স্ট্রাইকরেটে ১৪১ রানের ইনিংস! অবিশ্বাস্য বটে!

দল দুশো পূরণ করতে পারেনি, তাতে তামিমের একারই অবদান ১৪১ রান! ৬১ বল খেলেছেন তামিম, বাকী ব্যাটসম্যানেরা ৫৯ বল খেলে রান করেছেন মাত্র ৪৭! উইকেটে তামিম কতটা প্রভাব বিস্তার করেছেন, সেটা না আর বললেও চলছে! কুমিল্লার ইনিংসে মোট চারের মার ১৩টা, এরমধ্যে ১০টা তামিমের। দলের বারো ছক্কার এগারোটাই হাঁকিয়েছেন তামিম! কুমিল্লার ইনিংস আজ তামিমময় ছিল- এটা বললে ভুল শোনাবে। তামিমের ইনিংসটাই আসলে কুমিল্লার একমাত্র খুঁটি- এরকম বললে বোধহয় একটু ভালো শোনায়!

একেকটা শটে ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস। বিপিএলে এর আগে কোন সেঞ্চুরী ছিল না তামিমের, সেটা যে ফাইনালের মঞ্চে আদায় করে নেবেন তামিম, এরকমটা ক’জনে ভেবেছিলেন সন্দেহ আছে। কেন তাকে দেশসেরা ব্যাটসম্যান বলা হয়, সেটারও প্রমাণ দিলেন আজ, আরও একবার; যদিও প্রমাণ বা দেখিয়ে দেয়া কথাগুলো তামিমের ক্ষেত্রে খাটে না মোটেও। তামিমের তো কিছু দেখানোর নেই, কোনকিছু প্রমাণের বাকী নেই।

একটা পর্যায়ে তামিমের ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি বুঝি ক্রিকেট বলটাকে ফুটবলের সাইজে দেখতে পাচ্ছেন! নইলে একটার পর একটা নিঁখুত শট, এত চমৎকার টাইমিং কিভাবে করে গেলেন! এরকম দিন একজন ব্যাটসম্যানের ক্যারিয়ারে খুব কমই আসে- যা করতে চাচ্ছেন, যেভাবে করতে চাইছেন ঠিক সেভাবে করতে পারছেন! ড্রাইভ-ফ্লিক-পুল, একের পর এক দুর্দান্ত শটের পসরা সাজিয়েছেন তামিম, বাউন্ডারিতেই তো আদায় করে নিয়েছেন একশোর বেশি রান!

বিপিএলের ফাইনালে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের মালিক ক্রিস গেইল, গত আসরেই ঢাকার বিপক্ষে ১৪৬ রানের দানবীয় এক ইনিংস খেলে রংপুরকে শিরোপা জিতিয়েছিলেন এই ক্যারিবীয়। আজ তামিম অল্পের জন্যে পেছনে ফেলতে পারলেন না গেইলকে। তবে যা করেছেন, সেটাই যথেষ্ট হয়ে গেছে কুমিল্লাকে শিরোপা জেতানোর জন্যে।

ফাইনালে কে জিতবে, এমন প্রশ্নের জবাবে গতকালও পাঁচজনের মধ্যে চারজন ঢাকার নাম বলেছিলেন। কিন্ত কুমিল্লায় যে একজন তামিম ইকবাল আছেন, সেটা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন অনেকেই। দুই দলের মধ্যে ব্যবধান গড়ে দিয়েছে ওই এক ‘গেম চেঞ্জিং’ ইনিংসই। সাকিব আল হাসান আর তার ঢাকা ডায়নামাইটস টানা দ্বিতীয়বার ফাইনাল থেকে খালি হাতে ফিরলেন, তামিমের কারণেই।

এবারের বিপিএলে খুব ভালো কিছু করতে পারেননি, অন্তত নামের প্রতি সুবিচার তো নয়ই। ফাইনালের আগে তামিমও এটা নিয়ে কথা বলেছিলেন, জানিয়েছিলেন, পারফরম্যান্স নিয়ে অসন্তোষ আছে তার মধ্যেই। ভেতরে ভেতরে তাতিয়ে ছিলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। কাউকে দেখানোর জন্যে নয়, কোনকিছু প্রমাণের জন্যেও নয়, তামিম তেতে ছিলেন রানের ক্ষুধায়। সেই ক্ষিধেটা তিনি মেটালেন ঢাকার ওপরেই! ক্যারিয়ারে প্রথম বিপিএল শিরোপার স্বাদ তামিম পেলেন এবারই, সেখানে তার অবদানটাই সবচেয়ে বেশি- আজ রাতে কোন রূপকথা নেই, যা আছে, সবটুকুই ‘তামিম-গাঁথা’!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button