অনুপ্রেরণার গল্পগুচ্ছতারুণ্য

তাহসানের কাছ থেকে হবু উদ্যোক্তারা যা শিখতে পারেন!

সঙ্গীতশিল্পী তাহসান, নাকি অভিনেতা তাহসান, কার কাছ থেকে কী শেখা যায়? যারা উদ্যোক্তা কিংবা কোন পণ্যের ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করছেন, তারা তাহসানের কাছ থেকে দারুণ কিছু বিষয় সম্পর্কে শিখতে পারেন।

“কাস্টমার কে তা জানা!”

তাহসানের নাটক কিংবা গানের দর্শক “কে” সেটা তাহসান গান কিংবা নাটকে অভিনয়ের আগেই জেনে নেন। হবু উদ্যোক্তা যারা আমরা তারা কোন আইডিয়া কিংবা পণ্য নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করি, তখন খুব কম ক্ষেত্রেই আমাদের কাস্টমার কে, তা আমরা জানতে চাই না। ভালোবাসা দিবসের নাটক কিংবা ঈদের বিশেষ নাটকে তাহসান অভিনয় করেন, তার নাটকের বেশিরভাগ দর্শকই কিন্তু ইউটিউব কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় যুক্ত। তাহসানের নাটক/গানের ব্র্যান্ডিং প্ল্যাটর্ফম হিসেবে ফেসবুক দিয়েই কিন্তু সেই দর্শকদের চিনে নেন। আমরা যখন কোন প্রোডাক্ট ডিজাইন করি, তখন আইডিয়া কত নিখুঁত কিংবা কতটা উদ্ভাবনী হবে তার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহক কে হবেন তা নিয়েও মাথা ঘামানো উচিত।

“সোশ্যাল মিডিয়ার হাইপ বোঝা”

দর্শক টিভিতে নাটক দেখুক না দেখুক তাহসানের ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম খেয়াল করলে দেখবেন সে কতটা নাটক/গানের জন্য সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে। টেলিভিশন কিংবা পত্রিকায় বিজ্ঞাপনের চেয়েও তাহসানের নাটক-গানকে সোশ্যাল মিডিয়াই তরুণ দর্শকদের কাছে পৌছে দেয়। আমরা যখন কোন স্টার্টআপের প্রাথমিক পর্যায়ে দৌড়াদুড়ি করি তখন সোশ্যাল মিডিয়াতে লাইক বাড়ানোর দিকেই ব্যস্ত থাকি। তাহসান কোন নাটক প্রচারের আগে সেই নাটকের প্রোমো-বিজ্ঞাপন দিয়ে কিন্তু দর্শকদের মধ্যে আগ্রহ জাগায়। আমাদের কোন স্টার্টআপ তৈরির শুরুর দিকে লাইক না বাড়িয়ে “কনটেন্ট মার্কেটিং” সম্পর্কে জেনে মাঠে নামলে দ্রুত সামনে আগানো যায় কিন্তু।

”নেটওয়ার্কিং পাওয়ার তৈরি করা”

তাহসানের ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে তাহসান যে সব সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত তার নিয়মিত ছবি আর নিউজ কিন্তু শেয়ার করা হয়। এতে তাহসানের হেটার্স থাকলেও কিন্তু ইতিবাচক একটা ভাবমূর্তি তৈরি হয়। আপনার স্টার্টআপ কিংবা আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য যত ধরণের সামাজিক কার্যক্রমে যুক্ত আপনি তা ইতিবাচক উপায়ে শেয়ার করুন। রেপুটেশন মার্কেটিং নামে কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অনলাইন কোর্স করেছিলাম আমি, এখন হ্যাশট্যাগ দিয়ে কিন্তু পণ্যের লয়াল কাস্টমারের সংখ্যা গণনা করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়াকে নেটওয়ার্কিং টুল হিসেবে ব্যবহার করুন।

“নেক্সট প্ল্যান কি হবে তা আগেই ঠিক করে রাখুন”

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে আসছে মাসে কোন দিকে দর্শকরা যেতে পারে তা পূর্বানুমান করা যায়। তাহসান কিন্তু এই ফেব্রুয়ারিতে ভালোবাসার নাটকে ব্যস্ত থাকবেন সেটা গেল ঈদের পরেই বোঝা গেছে। ফেব্রুয়ারির পরে আগামী কয়েক মাসে তাহসানকে শুধু গানেই দেখবেন, আর এর পরে আগামী ঈদের নাটকে দেখবেন। স্টার্টআপের প্রথম ধাপ পার হওয়ার পরে আমরা টের পাই না পরের স্টেপ কি হবে, সোশ্যাল মিডিয়াতে কাস্টমারদের মতামত কিংবা ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করে নেক্সট প্ল্যান সেট করুন।

“ইনফ্লুয়েন্সার হউন”

তাহসান কোন পরিচালকের নাটকে অভিনয় করেন, কোন চ্যানেলে তার নাটক প্রচার হয়, সহ-অভিনেতারা কতটুকু জনপ্রিয় তা দিয়েও তাহসানের ইনফ্লুয়েনশিয়াল পাওয়ার সম্পর্কে ধারণা নিতে পারেন। তাহসানের নাটক কি বিটিভিতে প্রচার হতে দেখেছেন? তিশা কিংবা বিদ্যা সিনহা মিম ছাড়া কিন্তু তেমন নাটকে অভিনয় করেন না তিনি। এছাড়াও মিথিলা কিংবা শার্লিন থাকেন কোন কোন নাটকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাহসান তেমন মিলিয়ন ফলোয়ারহীন অভিনেত্রীর সামনে দাঁড়ান না। আমরা যখন স্টার্টআপ বা কোন নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ শুরু করি, সেক্ষেত্রে আমাদের প্রোডাক্টটা কতটুকু ইনফ্লুয়েনশিয়াল হবে তা ঠিক করে নিতে হবে আপনাকেই। বিষয়টা অনেকটা এমন যেন, বাজারে আইফোন আছে, আপনি যদি কোন পণ্য ডিজাইন করেন তা যেন উবার হয়। আইফোনের সঙ্গে নতুন আপনার আইফোন পাল্লা দিতে পারবে না, কিন্তু নতুন পন্য উবার আপনাকে ইনফ্লুয়েনশিয়াল করে তুলবে।

“নতুন ক্যাটাগরি তৈরি করুন”

তাহসানের নামে কিন্তু একটা অভিযোগ আছে। সারা বছর নাটকে নাই, বিশেষ দিনগুলোতে ছক্কা মেরে দেন। এটাও কিন্তু একটা নতুন স্টাইলের অভিনয় বলা যায়। (বিষয়টা যদিও নিয়মিত অভিনয়শিল্পীদের জন্য একটু বেদনামধুর!) নতুন স্টার্টআপে আপনার পন্য যদি আগে থেকেই বাজারে থাকে তাহলে ধরা আপনি। নতুন আইফোন কেউ কিনবে না, নতুন ফেসবুক কি কেউ পছন্দ করবে? যারা নতুন ব্র্যান্ড কিভাবে দাঁড়ানো নিয়ে কাজ করেন তারা জানেন নতুন ক্যাটাগরি কত তাড়াতাড়ি মার্কেটে সাড়া ফেলে।

“পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং শিখুন”

প্রায় সব নাটকেই তাহসানের লুক প্রায় একই থাকে বলে অভিযোগ আছে। একই স্টাইলে কথা বলা, একই এক্সপ্রেশন-হেটার্সদের অভিযোগ। একটু অন্যভাবে দেখলে বুঝবেন এটাই কিন্তু তাহসানের পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং। হবু উদ্যোক্তারা ড্রেসআপ নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না। আপনি হয় তো বলবেন, “আমি তো এমনই”, কিংবা “এটাই আমার স্টাইল”। সবার স্টাইল আলাদা এটা ঠিক আছে, কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে স্টাইলের চেয়ে স্মার্টনেসটাই নিজেকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মার্ক জ্যাকারবার্গ শুরুর দিকে কিন্তু বারাক ওবামার সঙ্গে দেখা করার সময় কালো স্যুট আর সাদা শার্ট পড়ে গিয়েছিলেন। সেই আশির দশকে স্টিভ জবস কোট-টাই পড়ে ব্যাংকে প্রেজেন্টেশন দিতে যেতেন। ওয়ারেন বাফেট, বিল গেটস কিংবা নব্বইয়ের পোস্টার বয় ইয়াহুর কিমরা জায়গা মতো ঠিকই ফরম্যাল থাকতেন। তরুণদের টানতেই জায়গা মতো তারা ইনফরমাল লুক নেন।

তাহসানের অনলাইনে যে সিভি পাবেন সেখানে তার ২০০৮ সালের মার্কেটিং নিয়ে রিসার্চ পেপারও পাবেন, পোর্টফলিও যথেস্ট স্ট্রং পাবেন কিন্তু। তাহসান খান লিখে ফেসবুক সার্চ করুন, ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটা ট্যাগ দিয়ে তার নাম পাবেন। এটাও কিন্তু পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং! (আইবিএ বিবিএ সেভেন্থ ব্যাচ, এমবিএ থার্টি নাইন তাহসান পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং সেলেব্রেটিজমে এনগেজ করবেন না তা কি করে হয়?)

“ট্রাইব তৈরি করুন”

সেথ গডিনের ট্রাইব নামের একটা বই আছে। আপনি একটা বিশেষ গোষ্ঠীর সদস্য হবেন, কিংবা সেই দলকে নেতৃত্ব দেবেন-আপনার পণ্য দেদারসে বেচা-কেনা চলবে। তাহসান কিন্তু নানান সময়ে বিভিন্ন পাবলিক স্পিকিং/মটিভেশন সেশনে অংশ নেন, ত্রিশের নিচের ইউটিউবারদের সঙ্গে দারুণ সখ্যতা তার; এছাড়াও সোলায়মান সুখন, এলিটা করিম কিংবা সাকিব আল হাসান-মোস্তাফিজদের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্ম শেয়ার করেন। এসব কাজে কিন্তু কিন্তু তার একটা ফলোয়ার গ্রুপ তৈরি হয়, যারা তাকে অনুসরণ করবেই। তাহসান গ্রামীন-ইউনিক্লো’র ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়েছিলেন, গ্রামীন-ইউনিক্লোর পোষাক মান তেমন ভালো না হলেও তাহসানের কল্যানেই কিন্তু কিছুটা পরিচিতি পেয়েছিল গ্রামীন-ইউনিক্লো। কিছু করতে চাইলে কোন একটা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হউন শুরু থেকে। বিপদে আপদে সেই নেটওয়ার্ক-ট্রাইবকে সামনে পাবেনই।

“হোয়াই”

সাইমন সিনেকের স্টার্ট উইথ হোয়াই বই থেকে জেনেছি, “পিপল ডোন্ট বাই হোয়াট ইউ সেল, পিপল বাই হোয়াই ইউ সেল”। দারুণ টেকনোলজির জন্য কাস্টমাররা আইফোন কেনে না। অ্যাপল কখনও বলে না তারা সেরা। চেঞ্জিং স্ট্যাটাস কো, থিমই অ্যাপলের, স্ট্যাটাস-কো ভাঙার জন্য আইফোন-আইপ্যাড-আইটিউন্স। সেই কাস্টমার যারা স্ট্যাটাস কো বদলাতে চান তারাই আইফোন কেনেন। আইফোনের হোয়াই কানেকটিং দ্য ডটস, এই হোয়াই’টাই কেনেন কাস্টমাররা। তাহসানের কর্পোরেট লুক, মাপা লাইফ-স্টাইল, স্মার্ট ফ্যামিল অ্যাপিয়ারেন্স, স্যোশাল লাইফ-তার দর্শকরা পছন্দ করে, অনুসরণ করে। যে কারণে অ্যাপল যা দেয় কাস্টমাররা তাই লুফে নেয়, তাহসানও তার দর্শক-শ্রোতার কাছে সেই ভ্যালু টাই দিচ্ছেন, তাই বিভিন্ন দিবসেই বেশি ডাক পরে তার।

“বই পড়ুন!”

তাহসান কিন্তু বর্তমানে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের শিক্ষক, আগে ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বলা যায় মোটামুটি পড়াশোনার মধ্যেই থাকেন তাহসান। হবু-উদ্যোক্তারা মোটামুটি ফেসবুকে পোস্ট-টোস্ট পড়া ছাড়া কিছুই করেন না, এতে নিজের ডেভলপমেন্ট তেমন হয় না। টপ টেন বুকস ফর অন্ট্রাপ্রেনিয়রস টাইপের যত লিস্টি আছে তার একটা-দুইটা বই পড়ে নিজে এগিয়ে নিতে পারেন সামনে। না পড়লে বেশি দূর আগানো কঠিন কিন্তু।

(এই পোস্টের সব ছবি তাহসান রহমান খানের প্রোফাইল থেকে সংগ্রহ করা)

লেখকের ব্লগ- www.zhkaashaa.com
লেখকের মেইল এড্রেস- unzahid@gmail.com

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button