অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

নো ওয়ান কিলড তাবরেজ আনসারী!

তাবরেজ আনসারীর জানা হয়নি, কোন অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। হয়তো তাবরাজের অপরাধ ছিল সংখ্যালঘু হওয়া। হয়তো তার অপরাধ ছিল হিন্দুপ্রধান একটা দেশে মুসলমান হিসেবে জন্ম নেয়াটা। তাবরেজ অপরাধ করেছিলেন ঈদের ছুটিতে বাড়ি এসে, কিংবা বন্ধুর সাথে বেড়াতে গিয়ে। ‘নো-ওয়ান কিলড জেসিকা’ সিনেমাটা তাবরেজ হয়তো দেখেননি, এখন তাকে নিয়েই যে ‘নো-ওয়ান কিলড তাবরেজ’ নামের একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলা যাবে, সেটা তাবরেজে জানার কথা নয়।

পুনেতে দিনমজুরের কাজ করতেন তাবরেজ আনসারী। দরিদ্র‍্য পরিবারে জন্ম, পড়ালেখা তাই বেশিদূর করতে পারেননি, নামতে হয়েছে জীবন সংগ্রামে। বাবাকে হারিয়েছিলেন খুব ছোট বয়সে, চুরির অভিযোগ তুলে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল তাবরেজের বাবাকে। তাবরবজ জানতেন না, বাবার পরিণতি বরণ করতে হবে তাকেও, বাবার মতো তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটাও ধামাচাপা দেয়া হবে নিপুণভাবে।

গত রোজার ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিলেন তাবরেজ। বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন ঝাড়খণ্ডে। সেখানে মোটরসাইকেল চুরির অপবাদ দিয়ে তাদের আটক করে হিন্দুত্ববাদী একটা সংগঠনের কর্মীরা। তার মুসলিম পরিচয় পেয়ে আরও ক্ষেপে ওঠে তারা। বৈদ্যুতিক পোলের সঙ্গে বেঁধে বেধড়ক পেটানো হয় তাবরেজ এবং তার বন্ধুকে। শুধু পিটিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি তারা, তাবরেজকে বাধ্য করা হয় ‘জয় শ্রীরাম’ এবং ‘জয় হনুমান’ স্লোগান দিতে।

সেই খুঁটির সাথে বেঁধে রেখে তাবরেজকে প্রায় আট-নয় ঘন্টা নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। অজ্ঞান অবস্থায় মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে তাকে তুলে দেয়া হয় পুলিশের হাতে। পুলিশও তাকে হাসপাতালে না নিয়ে জেলহাজতে ফেলে রাখে। খবর পেয়ে তাবরেজের পরিবারের সদস্যেরা থানায় ছুটে গেলেও তাদের তাবরেজের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হয়নি। পরদিন তার শারিরীক অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয়ে গেলে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে, সেখানেই তিনদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হার মানে তাবরেজ। বাইশে জুন মারা যান তিনি।

এ পর্যন্ত কারো কোন বিকার ছিল না। ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ইন্টারনেটে একটা ভিডিও ভাইরাল হবার পরে। তাবরেজকে মারধরের ভিডিওটা ধারণ করেছিল কেউ, সেটাই প্রকাশিত হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, আহত তাবরেজের মুখ থেকে রক্ত ঝরছে, আর একদল লোক তাকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেয়ার আদেশ দিচ্ছে। অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পাবার আশায় তাবরেজ দুর্বল গলায় ‘জয় শ্রীরাম’ বলেছে, তাতে অত্যাচার কমেনি হায়েনাদের উল্লাস বেড়েছে শুধু।

ভিডিওটা প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই নিন্দার ঝড় ওঠে চারপাশে। ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, সেটারই একটা জ্বলন্ত নিদর্শন হিসেবে হাজির হয়েছে এই ভিডিও। গোরক্ষার নামে, হিন্দুধর্ম রক্ষার নামে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে দলবেঁধে কাউকে আক্রমণ করে মেরে ফেলাটা ভারতে এখন সবচেয়ে সহজ কাজগুলোর একটি। বাধ্য হয়েই ঝাড়খণ্ড পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ঘটনার সাথে জড়িত কয়েকজনকে আটক করেছিল তখন।

মৃত্যুর প্রায় আড়াইমাস পর এসে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হিসেবে পুলিশ জানাচ্ছে, পিটুনি নয়, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল তাবরেজের! অথচ ভিডিওতে পরিস্কার দেখা যাচ্ছিলো, তাবরেজের মাথা ফেটে রক্ত পড়ছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, মৃতদেহের মাথার ডানপাশে গভীর ক্ষত ছিল। আর পুলিশের দাবী, তারা দু’বার পোস-মর্টেম করেছে, দুবারই একই ফলাফল এসেছে! এখন অভিযুক্তদের ছেড়ে দেয়া ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।

বিভিন্ন সংস্থা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে বারবার এই ঘটনায় সিবিআই তদন্তের দাবী জানানো হলেও তাতে পাত্তা দেয়নি নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার, তারা ভরসা রেখেছে ঝাড়খণ্ড পুলিশের ওপরেই। ঝাড়খণ্ড পুলিশ যে চিত্রনাট্য অনুযায়ী নিষ্ঠার সঙ্গে অপরাধীদের বাঁচানোর কাজটা করেছে, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে এখন।

তাবরেজের হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে না, তাবরেজরা কখনও বিচার পায় না। সংখ্যালঘু হয়ে জন্ম নেয়াটা একটা অপরাধ, কখনও কখনও এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় নিজের জীবন দিয়ে। তাবরেজ আনসারী যেমন করেছেন। পুলিশের এফআইআরে তাবরেজের পরিচয় লেখা থাকবে গণপিটুনির শিকার হয়ে হৃদরোগে মারা যাওয়া এক মোটরসাইকেল চোর হিসেবে। কোথাও লেখা থাকবে না, তাবরেজের হত্যাকাণ্ড ছিল সংখ্যালঘু একটা সম্প্রদায়কে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়ার জন্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মান্ধদের অত্যাচারের বিশাল উপন্যাসের ছোট্ট একটা অনুচ্ছেদ মাত্র…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button