মনের অন্দরমহলরিডিং রুম

একজন ‘ক্রাইসিস ম্যান’- এর গল্প!

সৈয়দ আশরাফ চলে গেলেন ছেষট্টি বছর বয়সে। একজন রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে দলমত নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, তাকে অকালে হারিয়ে ফেলাটা সবাইকে কষ্ট দিচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরকম দৃষ্টান্ত বিরল। সৈয়দ আশরাফ সেই সৌভাগ্যবান ব্যাক্তিদের একজন হয়ে উঠেছিলেন নিজ গুণে, সততা আর আদর্শকে অস্ত্র বানিয়ে। আওয়ামী লীগে এখন সুবিধাবাদী নেতা-কর্মীদের ভীড়, দেশে এখন সবাই আওয়ামী লীগ করে। সেসব অতি লীগারদের ভীড়ে সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষেরা হারিয়ে যান, যারা শুধু মন-প্রাণ নয়, পুরো শরীরটা দিয়েই আওয়ামী লীগ করতেন!

কিছু রক্ত কখনও বেইমানী করতে জানে না, বেইমানী করতে শেখে না। সৈয়দ নজরুল ইসলামের রক্তও তেমনই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিসর্জন দিতে না চাওয়ায় জীবন দিতে হয়েছিল তাকে। সেই বাবার ছেলে হয়ে সৈয়দ আশরাফ কি করে বঙ্গবন্ধুর কন্যার সঙ্গে বেইমানী করবেন? না, সেটা তিনি কখনও করেননি, বরং দারুণ ঝড়-ঝাপটা থেকে বরাবরই আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনাকে, আগলে রেখেছেন আওয়ামী লীগকে। 

তাকে ডাকা যায় ‘ক্রাইসিস ম্যান’ নামে। সাধারণ সময়ে তিনি দৃশ্যমান থাকতেন না। কিন্ত যখনই দলের ওপর হুমকি আসছে, যখন নেত্রীর ওপর বিপদের খড়্গ নামছে, তখন সবার আগে হাজির যিনি হাজির থাকতেন, তিনি সৈয়দ আশরাফ। আওয়ামী লীগের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন মানুষটা। তবে সৈয়দ আশরাফ নিজেকে স্মরণীয় করে রেখেছেন ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের ক্রান্তিলগ্নে দলের হাল ধরে। সংস্কারপন্থীরা তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুই দলেই, ‘মাইনাস টু’ ফর্মূলায় শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া, দুজনকেই রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিল তৎকালীন শাসকেরা, তাদের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগ আর বিএনপির কিছু নেতাও।

তখন প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমানের সঙ্গে মিলে দারুণ দক্ষতায় দল সামলেছিলেন সৈয়দ আশরাফ, নেত্রীকে জেল থেকে মুক্ত করে ছেড়েছিলেন তারা। একদিকে ঘরের শত্রুদের মোকাবেলা করা, অন্যদিকে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া, আবার আন্তর্জাতিক লবিং এবং কূটনৈতিক সমর্থন আদায় করা, সেই সঙ্গে আবার দলের ঝিমিয়ে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা- সবকিছু প্রায় একাই সামলেছেন তিনি! বাবা সৈয়দ নজরুল ইসলাম যেমন আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, সৈয়দ আশরাফও তেমনই নিজের ভূমিকার কারণেই আওয়ামী লীগের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হয়ে থাকবেন সবসময়। 

আরেকটা টালমাটাল সময়ের কথা মনে পড়ে। ২০১৩ সালের পাঁচই মে, বিএনপি তখন ঢাকামুখী লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে, আবার হেফাজতও কর্মসূচী দিয়েছে মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে। পঙ্গপালের মতো কওমী মাদ্রাসার ছাত্র আর হুজুরেরা এসে ঢুকছে ঢাকায়, চালাচ্ছে তাণ্ডব। পুরো দেশই তখন শংকিত, কি হয় না হয়! প্রশাসনিক অবস্থাও খানিকটা নাজুক, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীরাও অপ্রস্তুত অবস্থায়! অনেকেই হেফাজতের সঙ্গে আপোষ করার পক্ষপাতী ছিলেন তখন।

সেই সময়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা সৈয়দ আশরাফ বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে বজ্রকণ্ঠে হেফাজতকে ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন, বলেছিলেন, এরা হচ্ছে একাত্তরের রাজাকার আর তাদের দোসরদের উত্তরসূরী। বাঘের মতো হুংকার ছেড়ে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘এবার তো ঢাকা পর্যন্ত এসেছেন, এর পরে ঢাকায়ও ঢুকতে দেয়া হবে না আর। আপনারা কারা, আপনাদের পরিচয় কি, উদ্দেশ্য কি, এসব আমাদের জানা আছে!’ এমন একজন দৃঢ়চেতা নেতার অভাব আওয়ামী লীগ কি পারবে কখনও পূরণ করতে?

টানা পাঁঁচবারের নির্বাচিত সাংসদ তিনি, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এতগুলো বছর ধরে, ছিলেন আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা, অথচ সম্পদের পাহাড় ছিল না তার! নির্বাচনী হলফনামায় সাংসদেরা যে সম্পদের কথা উল্লেখ করেন, এক টার্ম এমপি থাকার পরে দেখা যায় সেটা ফুলেফেঁপে কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে। অথচ সৈয়দ আশরাফের সম্পদের পরিমাণ কেবল কমেছেই! স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে বাড়ি বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। চাইলেই শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় বানিয়ে ফেলতে পারতেন তিনি, সুইস ব্যাংকে দশ-বিশটা একাউন্ট থাকতো তার। কিন্ত সৈয়দ আশরাফের ধমনীতে যে বইছে জাতীয় চার নেতার একজনের রক্ত! সেই রক্ত তো বেইমানী করতে শেখেনি!

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

প্রথাগত নেতাদের মতো বাচাল স্বভাবের ছিলেন না, কাজের চেয়ে কথা বেশি বলাটা পছন্দ করতেন না কখনোই। দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন, তবুও তার মধ্যে মিডিয়ায় ফুটেজ খাওয়ার লোভ ছিল না কখনও। নিজেই বলতেন, “আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সব বিষয়ে কথা বলবে কেন? সে শুধু নীতি নির্ধারণী বিষয়ে কথা বলবে। আর মিডিয়ার সামনে কথা বলার জন্য তো, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তো আছেনই।”

দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এতগুলো বছর মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি ছিলেন তিনি, অথচ কখনও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করেনি কেউ। সাংসদ হবার শুল্কবিহীন সুবিধায় দামী গাড়ি কেনেননি তিনি, মন্ত্রণালয় থেকে ব্যক্তিগত কাজের জন্যেও কোন গাড়ি বরাদ্দ করেননি কখনও। রাজনৈতিক শিষ্টাচার ব্যাপারটা তার মতো ভালো খুব কম মানুষই বুঝতেন। বিরোধী দলের নেতাদের জিজ্ঞেস করুন, তারাও একবাক্যে মেনে নেবেন, সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষ হয় না!

আওয়ামী লীগের এক সম্মেলনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে সৈয়দ আশরাফ বলেছিলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের সন্তান। আওয়ামী লীগের ঘরেই আমার জন্ম। আওয়ামী লীগ যখন ব্যথা পায়, আমারও কিন্তু হৃদয়ে ব্যথা লাগে। আওয়ামী লীগের এক কর্মী যদি ব্যথা পায়, সেই ব্যথা আমিও পাই। আপনারা এখানে এসেছেন। আপনাদের রক্ত, আমার রক্ত একই। এই রক্তে কোনো পার্থক্য নেই। আওয়ামী লীগ শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; হাজারো শহীদের রক্ত, জাতির পিতার রক্ত, জাতীয় চার নেতার রক্ত, হাজার হাজার নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ। আওয়ামী লীগকে আমি দল ভাবিনি। আওয়ামী লীগ একটা অনুভূতি।’

সৈয়দ আশরাফের কাছে আওয়ামী লীগ শুধু একটা রাজনৈতিক দল ছিল না, ছিল নিজের ঘর, নিজের অস্তিত্ব, নিজের আরেকটা স্বত্ত্বা। এই মানুষটা আওয়ামী লীগকে, শেখ হাসিনাকে যতটা ভালোবাসতেন, ততটা ভালো হয়তো নিজেকেও বাসতেন না। ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করলেই সৈয়দ আশরাফের জন্যে আহাজারি চোখে পড়ছে, তাকে অকালে হারিয়ে ফেলার বেদনায় পুড়ছেন ভিন্ন মতাবলম্বীরাও। এই অর্জনটা খুব ছোট কিছু নয়। এদেশে রাজনীতিবিদেরা হচ্ছেন মানুষের কাছে সবচেয়ে অপছন্দের মানুষ৷ অথচ একজন রাজনীতিবিদ হয়েও সৈয়দ আশরাফ মানুষের কাছে যে ভালোবাসাটা পাচ্ছেন, এটা দয়া বা করুণা নয়, তিনি নিজের কাজের মাধ্যমে, নিজের সততা দিয়ে কিনে নিয়েছেন সেই ভালোবাসাটা।

মাহবুবুল হক শাকিল ভাইরা চলে যান অসময়ে, আনিসুল হক বিদায় বলেন অবেলায়, সৈয়দ আশরাফও না ফেরার ট্রেনে উঠে পড়লেন বড্ড জলদি। আমরা বেঁচে থাকি অপাংক্তেয়দের দুনিয়ায়, যেখানে ভালো মানুষের বড্ড অভাব! একটা কচ্ছপের আয়ু কেন পাঁচশো বছর হবে? একজন হুমায়ূন আহমেদ কেন মাত্র তেষট্টি বছর বাঁচবেন? বুড়ো হাড়ের ভেলকি দেখিয়ে দরবেশ বাবারা দাপট নিয়ে ঘুরে বেড়ান, নরপিশাচ গোলাম আজম আয়ু পায় তিরানব্বই বছরের! অথচ সৈয়দ আশরাফেরা বিদায় নেন ছেষট্টিতে! এই অবিচারের কোন মানে হয়?

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button