সিনেমা হলের গলি

সারভাইভিং ৭১- মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম অ্যানিমেশন মুভি আসছে!

ক্যাপ্টেন আমেরিকা সিভিল ওয়ার, ব্যাটম্যান ভার্সেস সুপারম্যান, ব্ল্যাক প্যান্থার, এভেঞ্জার্স ইনফিনিটি ওয়ার, গার্ডিয়ান অফ দ্যা গ্যালাক্সি- ভলিউম টু…

আপনি যদি সিনেমাপ্রেমী হন, সুপারহিরোদের ভক্ত হন তাহলে নিশ্চিত আপনি এই সিনেমাগুলো দেখে থাকবেন। এই সিনেমাগুলো দেখে আপনি যদি মুগ্ধ হন, ভিজুয়াল দেখে যদি আপনার তব্দা লাগার অবস্থা হয়, তাহলে একজন বাংলাদেশি হিসেবে আপনার গর্ব হবার কথা! কারণ হলিউডে আমাদের একজন আছেন যার অসামান্য মেধাও যুক্ত আছে এই সিনেমাগুলোর পেছনে। তিনি ওয়াহিদ ইবনে রেজা। বিশ্বখ্যাত সনি পিকচার্সে তিনি কাজ করেন। সনি পিকচার্সে থাকার আগে তিনি ছিলেন মেথড স্টুডিওতে। সেই স্টুডিওতে থাকাকালীন সময়ে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ, গার্ডিয়ানস টু এই দুটি অস্কার নমিনেটেড চলচ্চিত্রের পেছনে কাজ করেছেন! এই মানুষটার মেধা যখন দেশের কোনো প্রজেক্টে কাজে লাগবে, কল্পনা করুন একবার সেই প্রজেক্টের কোয়ালিটি কতটা দুর্দান্ত হতে পারে? বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ওয়াহিদ ইবনে রেজার মতো কাউকে কখনো ওউন করতে পারবে কিনা জানি না, তবে ওয়াহিদ ইবনে রেজা বাংলাদেশকে ওউন করে একটা সিনেমা বানাচ্ছেন। প্রজেক্টের অংশ নয়, একটা আস্ত প্রজেক্ট নিয়েই তিনি কাজ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দেশের প্রথম এনিমেশন ফিচার ফিল্ম বানাচ্ছেন তিনি! মানুষটার পিতা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বাবার কাছে যুদ্ধের গল্প শুনার প্রভাব তার মনে দাগ কেটেছে ভীষণভাবে। মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে একটি সিনেমার গল্প মনের মধ্যে লালন করে বেড়াচ্ছেন চার পাঁচ বছর ধরে। চরিত্রগুলোকে যেন চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পান৷ সিনেমা নিয়ে তার স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। স্বপ্ন দেখা অবশ্য তাকেই মানায়, হলিউডের গগণে উজ্জ্বল সিনেমাগুলোর সাথে কাজ করেছেন তিনি, তাই নিজে যা বানাবেন সেখানে তো স্বপ্নের সাথে একটুও কম্প্রোমাইজ করবেন না তিনি নিশ্চিত। সেটাই হয়েছে। এনিমেশন ফিল্ম বানানোর সাহস করা বাংলাদেশের কনটেক্সটে কম ঝক্কির কাজ নয়। একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তিনি সময় নিয়ে এগুচ্ছেন।

২০১৭ সালে প্রথম ঘোষণা দিয়েছিলেন ওয়াহিদ ইবনে রেজা। মুক্তিযুদ্ধের উপর তিনি নির্মাণ করবেন এনিমেশন ফিচার ফিল্ম ‘সারভাইভিং ৭১’। তাকে যারা জানেন, তাদের সীমাহীন আগ্রহ ছিল, সুপারহিরোদের সিনেমায় কাজ করা আমাদের বাংলাদেশি ‘সুপারহিরো’ কেমন করবেন! অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে পরিকল্পনায়। প্রি প্রডাকশনের কাজ চললো অনেকদিন ধরে। একটা টিম দাঁড় করানো হলো। একটা দুর্দান্ত এনিমেশন ছবি বানাতে ভাল একটা টিম দরকার, অনেক ডেডিকেশন দরকার। টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো নিখুঁত না হলে সিনেমা আবেদন হারাতে পারে। তাই অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়েছে ওয়াহিদ ইবনে রেজাকে। সব মিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ ফিচার ফিল্ম নির্মাণ করতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হবে, সেটা তার একার পক্ষে ভারবহন করা কঠিন। তাই ঠিক হলো, প্রথমে একটি টিজার নির্মাণ করবেন দেড় মিনিটের, যে টিজার দেখে লোকে ধারণা পাবে কেমন হবে সিনেমাটি৷ টিজারটি নির্মাণ করার পর ফান্ডরেইজ করার পরিকল্পনা তার।

সেই মাহেন্দ্রক্ষণ অবশেষে এসেছে। আরেকটি স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে ওয়াহিদ ইবনে রেজা মুক্তি দিয়েছেন সারভাইভিং ৭১ সিনেমার টিজারটি! বাস্তব ঘটনা অবলম্বন করেই নির্মিত হচ্ছে সিনেমাটি। ব্যক্তিগতভাবে সিনেমাটা ওয়াহিদ ইবনে রেজার জন্য বেশিই আবেগের, কারণ গল্পটি তিনি পেয়েছেন তার বাবার কাছ থেকে। তিনি এগিয়ে চলোর সাথে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা ঘটনা খুব বেশি বলেননি তিনি, কিন্তু যখনই বলতেন, তখনই প্রচন্ড থ্রিল্ড হতাম। আমার আব্বা যুদ্ধ করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলেন৷ উনিসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে চোখ-হাত বেঁধে ট্রেনে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল৷ একজন একজন করে গুলি করে ট্রেন থেকে ফেলে দেয়া হচ্ছিল৷ যখন উনাকে গুলি করতে যাবে, ঠিক সেই সময় তিনি ট্রেন থেকে লাফ দেন এবং প্রাণে বেঁচে যান৷ এটা অসাধারণ একটা ইতিহাস।”

টিজারে এই ঘটনাটাই আমরা দেখতে পাই। আর গোটা সিনেমায় দুই বন্ধু আক্কু ও ধ্রুবর চোখ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে দেখানোর চেষ্টা হবে। এই দুই বন্ধু অনেক রোমহষর্ক ঘটনার মধ্যে দিয়েও সারভাইভ করার চেষ্টা করবে এবং যুদ্ধে যোগ দিবে। টিজারেই এত জীবন্ত অনুভূতি তৈরি করেছেন ওয়াহিদ ইবনে রেজা, গোটা গল্পে তিনি কি ম্যাজিক দেখাবেন তা দেখতে তর সইছে না!

এই সিনেমায় যুক্ত বড় বড় নাম। মূল চরিত্রে থাকছেন জয়া আহসান, মেহের আফরোজ শাওন, তানযীর তুহিন, গাউসুল আলম শাওন, সামির আহসান, অনিক খান প্রমুখ। এছাড়াও অতিথি ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে রয়েছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সাদাত হোসাইন ও কাজী পিয়াল। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মাণাধীন এই সিনেমা কি শুধুই ওয়াহিদ ইবনে রেজার সিনেমা? এই সিনেমা আমাদের, বাংলাদেশের। এই মেধাবী মানুষটাকে যেন এই সিনেমা নির্মাণের জন্য ফান্ড পেতে সমস্যায় না পড়তে হয়, সেটাই প্রাণপণ কামনা করছি।

এই সিনেমায় ওয়াহিদ ইবনে রেজাকে ফান্ড রেইজ করতে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত আরো একটা কারণে। ২৫ শে মার্চে যে নির্মম গণহত্যা আমাদের জাতির উপর চালানো হয়েছে, আমরা এখনো তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাইনি। এই কালোরাতের ক্ষত এখন দগদগে! পৃথিবীতে রাতের অন্ধকারে এমন অতর্কিত নৃশংস নারকীয় গণহত্যার ঘটনা খুব কমই আছে। পাকিস্থানি সেনা, শাসকদের এই অত্যাচার, গণহত্যা, নৃশংসতা আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃত না হওয়া আমাদের ক্ষতকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সেই জায়গা থেকে আমার মনে হয়, আন্তর্জাতিক মানের সিনেমা যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত হয় সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে। অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে সেই দিনগুলোর কথা, লোকে জানবে আন্তর্জাতিকভাবে, কি হয়েছিল আমাদের সাথে। আর মুক্তিযুদ্ধের উপর এনিমেশন ফিচার সিনেমার মতো এমন ব্যতিক্রমী কাজ যখন ওয়াহিদ ইবনে রেজার হাত ধরে চলছে, তখন এই সিনেমার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও অনেক বেশি বলে মনে করি।

এই সিনেমায় তিনি দুই বন্ধুর চোখে যে ঘটনা দেখাবেন তা তো স্রেফ সিনেম্যাটিক ফিকশনই না, ইতিহাসও। যেমন তিনি বলেছেন সাক্ষাতকারে, “আমি চেষ্টা করছি, যেসব ঐতিহাসিক চরিত্র আগের কোনো চলচ্চিত্রে দেখানো হয়নি, তাদের কথা তুলে ধরতে৷ যেমন আমার সিনেমার একটা চরিত্রের নাম ধ্রুব আর একটা চরিত্রের নাম আক্কু, তাদের সাথে কবি নির্মলেন্দু গুণের দেখা হলো মার্চের শেষদিকে, জিঞ্জিরা জেনোসাইডের সময়। যেহেতু কবি গুণ জিঞ্জিরা জেনোসাইডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন, তাই তার সাথে দেখা হওয়া অর্থ আমি জিঞ্জিরা জেনোসাইডটা দেখাতে পারছি।”

এই সিনেমার মাধ্যমে জিঞ্জিরার গণহত্যা সহ অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা যে বিশ্ব দেখবে, সেটার একটা গুরুত্ব আছে। এই সিনেমা আমাদের জন্য গর্বের, আবেগের যতটা, ততটাই জরুরীও বটে। আমাদের সৌভাগ্য যে ওয়াহিদ ইবনে রেজা এই সিনেমাটার তার দুর্দান্ত দক্ষতা, ভালবাসা, প্যাশন নিয়ে লেগে আছেন। এমন মানের একটা কাজ যখন একজন নির্মাতা করার সাহস এবং উদ্যোগ নেন, তখন তার পাশে দাঁড়ানো সকলের নৈতিক দায়িত্ব। অনেক এভারেজ মানের কাজ নিয়ে সেলিব্রেশন হয়, ফালতু টপিক নিয়ে আলোচনা হয়, সত্যিকারের প্যাশনেট একটা কাজ কখনোই ভাইরাল হতে দেখি না খুব একটা অনলাইনে। ওয়াহিদ ইবনে রেজার এই সিনেমার কথা ছড়িয়ে দিন, এই টিজারটি ভাইরাল করুন, যেন মানুষটা ফান্ডিংয়ের জন্য কোথাও পিচ করার সময় বলতে পারেন, এই সিনেমাটা শুধু তার একার নয়, কত সহস্র মানুষেরও স্বপ্নের সিনেমা..

  • টিজারটি দেখুন নিচের লিংকে ক্লিক করে-

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button