রিডিং রুমলেখালেখি

সার্ফ এক্সেল, মাইক্রোসফট এক্সেল ও একদল মাথামোটা গর্ধভ!

জর্জ বার্নার্ড-শ একবার আমেরিকায় গেলেন। একটা বক্তৃতায় তিনি বললেন, শতকরা পঞ্চাশজন আমেরিকান হচ্ছে মাথামোটা গর্ধব! শুনে অনুষ্ঠানস্থলে শুরু হলো গুঞ্জন, সেটা চিৎকার চেঁচামেচিতে রূপ নিতে যাচ্ছিল, তখনই বার্নার্ড-শ আবার বললেন, ‘আমি আমার বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিলাম। শতকরা পঞ্চাশজন আমেরিকান বুদ্ধিমান!’ এবার সেখানে তালির হুল্লোড় বয়ে গেল, একটু আগেই যারা বার্নার্ড-শ’র মুণ্ডুপাত করছিলেন, তারাই এবার হাসিমুখে তার প্রশংসা শুরু করলেন!

উপরের ঘটনাটা আসলেই ঘটেছিল কিনা, সেটা জানা নেই। তবে মাথামোটা গর্ধব লোকজন তো বিশ্বের সব জায়গাতেই আছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এমন মানুষের সংখ্যাটা তুলনামূলক বেশিই। শতকরা পঞ্চাশ ভাগ না হলেও, সোয়াশো কোটি মানুষের দেশ ভারতে চালুনি দিয়ে ছাঁকলে বিশ-পঁচিশ কোটি গর্ধব পাওয়া যাবেই। এদেরই একটা শ্রেণী হচ্ছে ধর্মীয় কট্টরপন্থীরা। এদের গাধামীর নমুনা দেখলে অবাক হয়েই ভাবি, এরা কি আসলেই মানুষ, নাকি এলিয়েন!

সার্ফ এক্সেল দোল উপলক্ষ্যে ভারতে একটা বিজ্ঞাপণ বানিয়েছে সম্প্রতি, সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধা আর সহমর্মিতার বার্তা দেয়া হয়েছে সেই বিজ্ঞাপণে। ভিডিওতে দেখা যায়, দোলের রঙ খেলার উৎসবের সময়ে ছোট্ট একটা মেয়ে তার বন্ধুদের চ্যালেঞ্জ জানায় তার গায়ে রঙ ঢালার জন্যে। এক পর্যায়ে বন্ধুদের সব রঙই শেষ হয়ে গেলে বাচ্চা মেয়েটার তার এক মুসলিম বন্ধুকে বলে, আয়, ওদের সব রঙ শেষ! তখন বোঝা যায়, নিজের গায়ে সবটা রঙ মেখে নেয়ার ব্যাপারটা আসলে পরিকল্পিত ছিল, মুসলিম ছেলেটা যাতে পরিস্কার পাঞ্জাবী পরে নামাজে যেতে পারে, সেজন্যেই মেয়েটা এই কাজ করেছিল।

কি চমৎকার একটা ভাবনা! অথচ এই বিজ্ঞাপণটা নিয়েই ভারতে উগ্রপন্থী ধর্মান্ধদের চুলকানি শুরু হয়ে গেছে। এই বিজ্ঞাপণে নাকি শুধুই নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে, এরকম ঘোষণা দিয়ে সার্ফ এক্সেলকে বয়কটের আহবান জানানো হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে! ফেসবুক আর হোয়াটসএপে সার্ফ এক্সেলের মুণ্ডুপাত করা হচ্ছে, গালিগালাজের তো অন্ত নেই কোন!

কয়েকদিন আগে সার্ফ এক্সেল এই বিজ্ঞাপনের ভিডিওটি প্রকাশ করার পর থেকেই অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে, এর মাধ্যমে নাকি কথিত ‘লাভ জিহাদ’ বা হিন্দু মেয়ের সঙ্গে মুসলিম ছেলের প্রেমে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। কি অদ্ভুত বখাট্য যুক্তি! কেউ কেউ আবার হিজাব পরিহিত মুসলিম নারীর সঙ্গে হিন্দু পুরুষের রঙ খেলার ছবি পোস্ট করে দাবী করছে, এটাই নাকি বিজ্ঞাপণের আসল ধরণ হওয়া উচিত ছিল। বিজ্ঞাপণটার মূল মেসেজটা না বুঝেই যে যার মতো অর্থ বানিয়ে নিচ্ছে!

বয়কটের ডাক তো দেয়া হয়েছেই, মাথামোটার দল আরও কি করেছে জানেন? গুগল প্লে-স্টোরে মাইক্রোসফট এক্সেলের রিভিউতে গিয়ে সেখানে ওয়ান স্টার রেটিং দিয়ে আসছে! ভাবছেন, সার্ফ এক্সেলের সঙ্গে মাইক্রোসফট এক্সেলের কি সম্পর্ক, তাই না? দুটোর নামেই এক্সেল আছে, গর্ধবদের জন্যে এরচেয়ে বেশি সম্পর্কের দরকারও নেই!

এদের জ্ঞানের পরিধি দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। মাইক্রোসফট এক্সেলের রিভিউ সেকশনে গিয়ে একজন লিখেছে, ‘সার্ফ এক্সেলের সঙ্গে অংশীদার হওয়ার আগ পর্যন্ত এবং ধর্মবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগ পর্যন্ত আমি অ্যাপটি পছন্দ করতাম। এখন আমি যখন আমি ওয়ার্ড এক্সেলে কোনো কাজ করতে যাই, তখনই হিন্দুবিরোধী প্রচারণা সম্পর্কে মাথায় আসে। এই কাজ করার জন্য তোমাদের প্রতি ধিক্কার জানাই।’

আরেক গাধা লিখেছে, ‘সার্ফ এক্সেলের বিজ্ঞাপনের কারণে আমি অ্যাপটিকে এক স্টার দিচ্ছি।’ কয়েকজন লিখেছে, ‘এটা একটা বাজে অ্যাপ, এটা দিয়ে ঠিক মতো কাপড় পরিস্কার হয় না!’

তবে সবাই যে না জেনে রেটিং দিচ্ছে তা কিন্ত নয়। অনেকে জেনে বুঝেই মাইক্রোসফট এক্সেলকে এক রেটিং দিয়ে যাচ্ছে প্লে-স্টোরে। রোহিত সিং নামে এক ভারতীয় ব্যবহারকারী হিন্দি ভাষায় লিখেছে, ‘আমি জানি তুমি সার্ফ এক্সেল না। তবুও আমি অ্যাপটিকে এক স্টার দিচ্ছি কারণ এক্সেল শব্দটির প্রতি আমার ঘৃণা জন্মেছে!’

সাম্প্রদায়িকতা অদ্ভুত একটা জিনিস। মানুষের মাথার ভেতর থেকে মগজটা বের করে নিয়ে সেখানে গোবর আর আবর্জনা ঢুকিয়ে দিতে জুড়ি নেই সাম্প্রদায়িকতার। গোবরের পরিমাণ কত বেশি হলে সার্ফ এক্সেল আর মাইক্রোসফট এক্সেলকে এক করে ফেলা যায়, সেটা তো সহজেই অনুমেয়!

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button