রিডিং রুমলেখালেখি

কাউকে পৃথিবীর জন্য যোগ্যতম করার সর্বোত্তম উপায় কী?

জন্মের পরপর শিশুদের গরম কাপড়ে পেঁচিয়ে ফেলা হয়, এরপর মুখে মায়ের স্তনবৃন্ত গুঁজে দেওয়া হয়। ছাগলছানাকে জন্মের পর কেউ গরম কাপড়ে পেঁচায় না। ছানা একা একা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তাকে খুঁজে নিতে হয় মায়ের স্তনবৃন্ত কোথায়। খুঁজতে খুঁজতে সে শিখে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। বাকী তিনটা ছানার সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে গিয়ে স্তনবৃন্তের ভাগটা বুঝে নিতে হবে। এজন্যই ছয় মাসের মাথায় মা ছাগল সরিয়ে নিলেও, শিশু ছাগল শিখে ফেলে কীভাবে একা বেঁচে থাকতে হয়!

পৃথিবীতে আসার পর প্রথম কান্নার দুটো কারণ। আকস্মিক তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং ক্ষুধা। মায়ের জরায়ুতে উষ্ণ পরিবেশ থেকে পৃথিবীর শীতল পরিবেশে এসে বাচ্চা কনফিউজড হয়ে যায়। কাপড়ে পেঁচিয়ে কোনোমতে আমরা প্রথম অভাবটা বাচ্চাকে বুঝতে দেই না। এরপর ক্ষুধা মিটিয়ে দিই। শিশু বড় হতে থাকে। আমরা কারণে-অকারণে বাচ্চার মুখের সামনে চামচ ধরে থাকি। পাকস্থলি ভরার পর বাকীটা বমি করে ফেলে দিলে আমরা আবার জোর করে খাইয়ে দিই। একটা সময় মানবশিশু ভুলে যায়, ক্ষুধায় যন্ত্রণা হয়, পেট ব্যথা করে। পৃথিবীর আদিমতম অনুভূতিটা না বুঝেই অধিকাংশ মানুষ একদিন বড় হয়ে যায়। ক্ষুধার পাশাপাশি তার সমস্ত অভাব আমরা সানন্দে মেটানো শুরু করি। উৎসবে কোন রঙে সাজবে এ নিয়ে মোটামুটি ফ্যামিলিতে মিটিং পর্যন্ত করে ফেলি। সময়ের আগে খাবার চলে যায় মুখের সামনে, ময়লা কাপড় কেউ একজন ধুয়ে আয়রণ করে সাজিয়ে রেখে দেয়। কাপড় ছিড়ে যাবার আগে আরেক সেট নতুন কাপড় চলে আসে। থাকার জন্য তার আলাদা ঘর থাকে। অধিকাংশ মানবশিশু বুঝে উঠতেই পারে না, এতসবের আর্থিক কিংবা শ্রমের মূল্য কতটকু।

এই শিশুরা একটা সময় সামান্যতেই অভিমান করে, সামান্য ব্যথা পেলেই ভেঙ্গে যায় কিংবা কাউকে ভেঙ্গে ফেলে। খেয়াল করবেন- কিছুদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় সুইসাইডের অনেক নিউজ পাচ্ছি। একটা কমন বিষয় দেখুন- সবাই উচ্চবিত্ত কিংবা উচ্চ মধ্যবিত্ত। যাদের কাছে অপ্রাপ্তির মানেই ‘না পেলে এ জীবন রেখে লাভ কী?’ থিউরি। এটা একদিনে গড়ে ওঠেনি। তাদের অভিভাবকরা হয়তো অনেককিছুই দিয়েছেন, শিখিয়েছেন কিন্তু অভাববোধকে স্পর্শ করবার ব্যাপারে ততটা দিতেই পারেননি। কোথাও অপমানিত হলে সেটাকেও মাঝেমাঝে মহানন্দে সেলিব্রেট করতে হয়, সেটা হয়তো তারা জানতোই না। স্বাভাবিকভাবেই এই ধরণের সন্তানদের গুরুত্ব সবসময় সেকেন্ড চয়েসের দিকে। ঘরের খাবার রেখে রেখে কেন চাইনিজের পয়সা পেলাম না, পিত্র-মাতৃ প্রেম বাদ দিয়ে কেন তরুনীর প্রেম পেলাম না, অতি আবশ্যক জামাটি বাদ দিয়ে কেন ঈদের সেরা কালেকশনটি পেলাম না, কেন পিতা-মাতা কিংবা শিক্ষক অপমান করল, সবকিছুর সমাধান হলো নিজেকে ভেঙ্গে ফেলো কিংবা কাউকে ভেঙ্গে দাও!

প্রথম চয়েস কী? তিনবেলা ক্ষুধা লাগা। ক্ষুধাকে নিবৃত করতে, খাদ্য কিনতে কেউ একজন কষ্ট করছে সারাদিন, যে কাপড়টা পরে আছে সেটা কেউ কিনে দিচ্ছে অনেক শ্রমের টাকায় কিংবা যে ঘরে বসে আছে সেই ঘরটা সাঁজিয়ে রাখার জন্য কেউ একজন বিশৃংখল পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াচ্ছে হতদ্বন্দ্ব হয়ে। এতকিছু ঘটে যাচ্ছে আড়ালে, সে বুঝতেই পারল না। কারণ ইনপুটের আগে আউটপুট তাদের সামনে চলে আসে। খাবার প্রস্তুত থাকে ক্ষুধার আগেভাগেই।

কাউকে পৃথিবীর জন্য যোগ্যতম করার সর্বোত্তম উপায় কী? অভিভাবককেই হতে হবে সন্তানের সাইকিয়াট্রিস্ট। প্রথম কোন অভিজ্ঞতাটা দিবেন সন্তানকে? ক্ষুধার যন্ত্রণা। ক্ষুধার আগে কাউকে খাবার দিলে সে খাদ্যের মর্ম বুঝবে না। খাবার ফেলে দিবে কিংবা খাবারে অরুচি দেখাবে। অপেক্ষা করতে হবে সেই মুহুর্তের জন্য যখন সে খাবারের জন্য দুইবার ডাক দিবে। মাঝেমাঝে শুনেও না শোনার ভান কিংবা খাবার দিতে দেরি করার ব্যাপারটা তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। যে সন্তানকে একদিন টাকা নেই তাই আজ চুলায় রান্না হয়নি বলে কৃত্রিম ক্রাইসিস দেখাবেন, দেখবেন তার বদলে যাওয়ার দৃশ্য! সন্তানকে ক্ষুধার অনুভূতি বুঝতে দিন, সে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। পোশাক আর অর্থের সংকট আলোচনা করুন, সে মিতব্যয়িতা শিখে ফেলবে। মাঝেমাঝে তাকে রান্নাঘরে নিন, তিনবেলা রান্না করতে থাকা ঘর্মাক্ত মায়ের হাতের ফোস্কার মূল্য দিতে শিখবে। রিক্সা ছেড়ে একদিন হাঁটিয়ে নিন, সে রিক্সাওয়ালার যন্ত্রণা বুঝে ফেলবে। একদিন বাজারে পাঠান অল্পটাকায় অধিক চাহিদা লিস্ট দিয়ে, এই ছেলে পিতার ঘামের দামের মূল্যটা জেনে ফেলবে। এই পৃথিবীর সবকিছুই আমাদের শিক্ষক। সবকিছুতেই শিক্ষিত করুন সন্তানকে।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button