সিনেমা হলের গলি

একজন রাজকুমারের গল্প

Ho Gaya. You got the film- ফোনলাইনের ওপরপ্রান্ত থেকে কাস্টিং ডিরেক্টর অতুল মঙ্গীয়া’র এই কথাটা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্না শুরু করলো ছোটবেলা থেকে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্ন দেখা ছেলেটা। এতদিনের স্ট্রাগল, কষ্ট আর ত্যাগ যেন এই একটা কথাতেই হারিয়ে গেলো। কান্না থামার আগেই মাকে ফোন করে জানালেন। মমতাময়ী মাও ছেলের কথাটা শুনে কাঁদলেন।

মায়ানগরী মুম্বাই-এ এতদিন ধরে কাটাচ্ছেন এক করুনাময়ী জীবন। কখনো পকেটে টাকা নাই, কখনো বা পেটে খাবার নাই- ক্ষুধার জ্বালা এতটাই বেশি ছিল  ক্ষুধাটা মেটানোর জন্য বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসতে হতো। এতদিনের স্ট্রাগল একদিনেই ছেড়ে দিতে পারেন না বলেই চালিয়ে যাচ্ছিলেন ঐ গন্তব্যহীন সফর।

অসহায় মুসাফিরদের মতো কখনো এই কিনারায় তো ঐ কিনারায়। কিন্তু ঠাই তো নাই। একের পর অডিশন দিয়েই যাচ্ছিলেন। কিন্তু, সবশেষে ফলাফল আসে শুন্য। ছোটোখাটো কোন চরিত্রে কাস্ট করার থেকে বেশি কিছু দিতে রাজী হতেন না কাস্টিং ডিরেক্টররা। তবে দুই একটা সিনেমার অফারও পেয়ে গেছিলেন। কিন্তু, দুর্ভাগ্যবশত কোনোটাই হয়ে উঠতে পারে নি। একটা অর্ধেক শ্যুটিং হওয়ার পর সিনেমাটা স্থগিত হয়ে যায়। তো অন্যটা শ্যুটিং শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ ঘোষিত হয়ে যায়। তাই যাত্রাপথটা যেন আরো দুর্গম হয়ে পড়ছিলো।

ঠিক এমন সময়ে দিবাকর ব্যানার্জি’র মত একজন পরিচালকের সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যেন ছিল “সোনায় সোহাগা”। দিবাকরের প্রথম দুইটা সিনেমাই “সেরা সিনেমা” ক্যাটাগরিতে পেয়েছিলো জাতীয় পুরষ্কার। তাই একটু বেশিই খুশি হয়েছিলো অভিনেতা হতে চাওয়া ঐ ছেলেটা।

– আজ ২০ জুলাই, ২০১৯। অভিনেতা হতে চাওয়া ঐ ছেলেটা আজ “রাজকুমার রাও” নামটা সর্বত্র পরিচিত। পুরো ভারতে সিনেমাপ্রেমী এমন কোনো মানুষ হয়তো নাই যে রাজকুমার রাও’কে চিনে না। আজ তাঁর অভিনয় সকলের কাছেই সমাদৃত। নিজের কাজ, নিষ্ঠা আর পরিশ্রম দিয়ে জয় করেছেন হাজারো হৃদয়।

১৯৮৪ সালের ৩১ অগাস্ট ভারতের রাজধানী দিল্লী’র পার্শ্বীয় এলাকা গুরুগাঁও’তে জন্মগ্রহন করেন রাজ। পিতার পরিচয়সুত্রে উনার নাম রাখা হয় “রাজকুমার যাদব”। পিতা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা, আর মা ছিলেন একজন গৃহিনী। যৌথ পরিবারে বেড়ে উঠা রাজ ছোটোবেলা থেকে সিনেমা দেখতে পছন্দ করতো। পরিবারের কেউই সরাসরি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি’র সাথে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু, পরিবারের সবারই সিনেমার প্রতি আলাদা এক ভালোবাসা ছিলো। প্রত্যেক শুক্র-শনি বার ভিসিয়ার’এ একটানা তিনি-চারট্ব সিনেমা দেখতো তার পরিবার। ছোটবেলায় তৈরি হওয়া ঐ ভালোবাসা একসময় আসক্তিতে জন্ম নেয়।

সিনেমা থেকে বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রতি ভালোবাসা শুরু হয় তার। অভিনেতা হিসেবে নিজের জীবনলক্ষ্য স্থির করে নেন ঐ ছোটবেলাতেই, তাও বলিউড বাদশাহ “শাহরুখ খান” এর থেকে অনুপ্রানিত হয়ে। শাহরুখ খানের বিভিন্ন পোস্টার নিজের রুমে লাগিয়ে রাখতেন, বিভিন্ন কথাও বলতেন। তার মনের একটা বড় অংশ জুড়ে রেখে ছিলেন শাহরুখ। শাহরুখের পাশাপাশি আমির খান, মনোজ বাজপায়ী’ও ছাপ রেখেছিলেন রাজকুমারের মনে।

যতই বয়স বাড়তে থাকে ততই অভিনয়ের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকে। অভিনয়ের প্রতি রাজকুমারের এই ভালোবাসা নিয়েছিলো এক নতুন রুপ, যখন সে কাটাচ্ছিলো তার ছাত্রজীবন। দশম শ্রেণীতে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভিনয় করেন। অভিনয়ের হাতেখড়ি ওখান থেকেই শুরু হয়েছিলো।

“ব্লু বেলস মডেল স্কুল” এ পড়াকালীন সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি মার্শাল আর্টের দিকেও ঝুকেছিলেন। ট্রেনিং নিয়েছিলেন মার্শাল আর্টের। পরবর্তীতে, “আর্টস” বিষয় নিয়ে দিল্লী’র আত্মারাম কলেজ থেকে গ্র‍্যাজুয়েট হন। কলেজে থাকাকালীন সময়ে অংশ নিতে থাকেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। মন খুলে অভিনয় করেন স্টেজ শো’তে। অভিনয়ের তৃষ্ণা মেটাতে যোগদান করেন “শ্রীরাম সেন্টার ফর পারফর্মিং আর্টস” থিয়েটারটাতে। অভিনয়

এরপর ২০০৮ এ অভিনয় দক্ষতাকে আরো নিখুঁত করতে পুনে তে “FTI” এ ভর্তির আবেদন করেন। সৌভাগ্যবশত, উনার ভর্তির আবেদন গ্রহন হয়। এবং ওখান থেকেই শিখেন অভিনয়ের সকল খুটিনাটি। অভিনেতা হিসেবে জীবন শুরু হওয়ার অনেকটা কাছে চলে গেছিলেন ওখান থেকে। কোর্স শেষ হওয়ার পর চলে আসেন মায়ানগরী মুম্বাই’এ।

চোখে একটাই স্বপ্ন। একজন যোগ্য অভিনেতা হয়ে উঠা। আর মনের মধ্যে একটাই আশ্বাস “বহিরাগত একজন হয়েও যদি শাহরুখ স্যার এতবড় একজন তারকা হয়ে উঠতে পারেন তাহলে হয়তো আমারও একটা সুযোগ আছে”। শুরু হয় স্ট্রাগলিং ক্যারিয়ার। একের পর এক অডিশন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেন এক ঝাক স্বপ্ন নিয়ে, যে আজ হয়তো একটা চমৎকার ঘটবে আর তিনি একটা ফিল্ম পেয়ে যাবেন। কিন্তু, ভাগ্যটা ওতটাও ভালো ছিলো না। বিভিন্ন স্টুডিওতে ঘুরতেছেন কাজের আশায়। হয়তোবা একদিন ফিল্মে কাজ পেয়ে যাবেন। নামে “রাজকুমার” হলেও, কাটাচ্ছিলেন এক করুনাময় জীবন।

বলিউডের তরুণ অভিনেতা

প্রথমদিকে সিনেমায় সুযোগ না পাওয়ায় টাকার প্রয়োজনে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে অভিনয় করা শুরু করেন। পেট চালানোর জন্য ওটা উনার কাছে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছিলো। একসময় ক্ষুধা মেটানোর জন্য খাবার নাই, তো অন্যসময় চলার জন্য টাকা নাই। অডিশন দিয়ে দিয়ে বিভিন্ন কাস্টিং ডিরেক্টরদের সাথে গড়ে তুলেন সখ্যতা। যদিও বেশিরভাগ সময় ওরা গুরুত্বপুর্ণ চরিত্র দিতে রাজী হতো না। তবে ছোট চরিত্রগুলো খুশি মনে দিতো। এরই কারণে ২০১০ এ অমিতাভ বচ্চনের সিনেমা “রান” এ কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকে দেখা যায় রুপালী পর্দায়। কিন্তু, রাজ চাইছিলেন বেশি কিছু। একটা গুরুত্বপুর্ণ চরিত্র। দুই-তিনবার তিনি কাছাকাছি চলেও গেছিলেন। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত পোড়া কপালে ফিল্ম আর জুটে নি।

দেড় বছরের ঐ স্ট্রাগলের পর একদিন তিনি জানতে পারেন দিবাকর ব্যানার্জি তার নতুন ফিল্মের জন্য অভিনেতা খুজছেন। যিনি ইতোমধ্যে দুবার পরিচালক হিসেবে “সেরা সিনেমা” ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছেন। তাই রাজকুমার ঐ ফিল্মটা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। প্রথম অডিশনেও তাকে তেমন একটা পছন্দ করেন নি কাস্টিং ডিরেক্টররা। দুই-তিন রাউন্ডের অডিশনের পর তিনি মুভিটা পেয়ে যান।

এই সিনেমা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে আসেন রাজকুমার রাও। একে একে করে যান সিনেমা। কিন্তু, কাজ পেয়ে গেলেও, সফলতাটা যেন আসছিলো না তার কাছে। অবশেষ ২০১২ আসলো, পরিচালক হানসাল মেহতা’র “শাহিদ” এ কেন্দ্রীয় ভুমিকায় অভিনয় করে হাজারো মানুষের ভালোবাসা জয় করেন। এবং পুরো বলিউডকে কাপিয়ে নিজের হাতে নিয়ে নেন “সেরা অভিনেতা” ক্যাটাগরিতে জাতীয় পুরষ্কার। ২০১৩ থেকে একে একে নিজের নাম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠা করে নেন।

রাজকুমার রাও, বলিউড, শহিদ, নিউটন, বরেলি কি বরফি, ট্র্যাপড

কুইন এর পর বলিউডে তিনি তার অনুপ্রেরনা শাহরুখের সাথে দেখা করার সুযোগ পান। সারাজীবন পোস্টারে শাহরুখের সাথে কথা বললেও ঐদিন শাহরুখকে পাশে দেখে নির্বাক হয়ে গেছিলেন।

একইভাবে আলীগড় দিয়ে দর্শকদের মনে আবার ছাপ রাখেন তিনি। কিন্তু, রাজকুমারের ক্যারিয়ারে ২০১৭ আলাদা এক গুরুত্ব রাখে। ঐসময় নিউটন, বারেলি কি বারফি এবং ট্র‍্যাপড দিয়ে দর্শকদের পাশাপাশি সমালোচকদের থেকেও অসাধারণভাবে প্রশংসিত হন।

জীবনে যেমন স্ট্রাগল করেছেন তেমনি, মানুষের থেকেও ভালোবাসা কুড়িয়েছেন।

শাহরুখ খান ঠিকই বলেছিলেন, “Kisi Cheeze ko agar dil se chaho to poori kaynat usse tumse milane ki koshish mein lag jaati hai”

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button