খেলা ও ধুলা

ভাগ্যদেবীর কাছে এটা আপনার পাওনা ছিল স্টোকস…

ইডেন গার্ডেনে তখন আলোর রোশনাই, আতসবাজী ফুটছে, গ্যালারীতে অনেকেই তখনও স্তম্ভিত হয়ে ভাবছে, ব্যাপারটা কি হলো! টেলিভিশনের সামনে বসে ইয়ান বিশপের গমগমে গলার সঙ্গে আমরা আবেগে ভেসে যাচ্ছি, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বিশপ বলে চলেছেন- ‘কার্লোস ব্রাথওয়েট! রিমেম্বার দ্য নেম!’

আপনি তখন বাইশ গজে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়েছেন, চোখেমুখে রাজ্যের অবিশ্বাস। এত আলোর মাঝে থেকেও আপনি যেন অন্ধকারে ঢাকা বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপ, আপনাকে স্বান্তনা দেয়ার ভাষা নেই কারো। গত চার-পাঁচ মিনিটে যা ঘটলো, সেটা আপনার জন্যে ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন, যেটা আসছে বছরগুলোতে প্রতিটা রাতে হানা দেবে আপনার মনে।

ক্রিস জর্ডান এসে কিছু একটা বললেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই আপনার। মরগান এসে পিঠ চাপড়ে দিলেন, আপনি উঠে দাঁড়ালেন তখন। অনেক আশা নিয়ে আপনার হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন অধিনায়ক, ব্রাথওয়েটের তাণ্ডবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছেন আপনি। মনের ভেতরে কি সংকল্প করে রেখেছিলেন, মরগানের হাতে বিশ্বকাপের শিরোপাটা তুলে দিয়েই এই ভরসার প্রতিদান দেবেন?

ওই একটা ওভার, ব্রাথওয়েটের চারটা ছক্কা আপনাকে ট্র‍্যাজেডির নায়ক বানিয়েছিল ইডেনে। আপনি অপেক্ষায় ছিলেন, নায়কের আগে ট্র‍্যাজেডি শব্দটা মুছে ফেলবেন বলে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট আপনাকে সেই সুযোগটা দিলো, আপনি দুহাতে লুফে নিলেন সেটা। ইডেনের দুঃখটা ভুললেন লর্ডসে এসে।

অথচ আপনি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, সেটা তো প্রায় কেউই বিশ্বাস করতো না! আপনি পানশালায় মারামারি করে নিষিদ্ধ হন, ওয়েস্ট ইন্ডিজে রান না পেয়ে ঘুষি মেরে ড্রেসিংরুমের কাঁচ ভেঙে হাত কাটেন। আপনি যে কখনও চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন, সেটাই লোকে মানতে চাইতো না। আপনাকে নতুন বোথাম বলে ঘোষণা দিয়েছিল যে ইংলিশ মিডিয়া, তারাই আদাজল খেয়ে আপনার পেছনে লেগেছিল, ব্যাডবয় খেতাবটা যুক্ত করে দিয়েছিল আপনার নামের সঙ্গে। সেসবকে অবশ্য কখনোই তেমন পাত্তা দেননি আপনি।

দুঃসহ সেই স্মৃতিটা ভুলিয়ে দেয়ার মঞ্চ তৈরি ছিল আপনার জন্যে। সেই মঞ্চে নিজের সেরাটা বের করে আনাই ছিল আপনার কাজ, সেটা কি দারুণভাবেই না করলেন আপনি! নিশ্চিত হারের মুখ থেকে দলকে টেনে তুললেন দারুণ বীরত্বে, ৯৮ বলে ৮৪ রানের ইনিংসটা প্রমাণ দেবে আপনার ধৈর্য্যশক্তির, আপনার হারতে না চাওয়ার অদম্য মানসিকতার।

বুকের ভেতরে আগুনের স্ফুলিঙ্গ লুকিয়ে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে লড়েছেন আপনি, হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ম্যাচটাকে কাছে এনেছেন। শেষ ওভারে ১৪টা রান নিয়ে ম্যাচটা টাই করেছেন। সুপার ওভারেও দলের অর্ধেকের বেশি রান আপনার ব্যাট থেকে তো এলো।

ভাগ্য নাকি সাহসীদের পক্ষে থাকে। গতকাল ভাগ্যদেবী আপনার সঙ্গে ছিলেন স্টোকস, নইলে বোল্ট কেন আপনার ক্যাচটা ধরে বাউন্ডারি লাইনের ওপর পড়ে যাবেন? গাপটিলের থ্রো-টা কেন আপনার গায়ে লেগে চার হয়ে যাবে? সেই দুটো ঘটনা না ঘটলে ম্যাচটা তো টাই হয় না!

সময় সবাইকে সবকিছু কড়ায় গণ্ডায় ফিরিয়ে দেয় স্টোকস। ইডেনের সেই ফাইনালে নায়ক হওয়া ব্রাথওয়েট যেমন এবার স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়েছেন, হয়েছেন ট্র‍্যাজেডির নায়ক। তেমনই খলনায়ক থেকে নিজেকে নায়কের আসনে নিয়ে এসেছেন আপনি।

অনেকগুলো বছর পরে পেছনে ফিরে তাকালে যখন এই ফাইনালে, এই বিশ্বকাপে নিজের পারফরম্যান্সের কথা মনে পড়বে আপনার, তখন ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠবে নিশ্চয়ই। কোটি ইংরেজের ‘ইটস কামিং হোম’ স্বপ্নটা তো পূরণ হয়েছিল আপনার কারণেই! এই সম্মান, এই অর্জনটা আপনার প্রাপ্য ছিল স্টোকস, ইউ ডিজার্ভ দিস…

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button