এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ডবিবিধ

সাহসী ও প্রতিবাদী এক ফুটবল ক্লাবের গল্প!

এলবে নদীর পাশের ডকইয়ার্ডের কাছের এক রাস্তা। দুইপাশে অসংখ্য বার ও ডিস্কো, যেগুলার গায়ে আঁকা স্প্রে আর্ট বা গ্রাফিতি। পাংক মিউজিকের শব্দ ভেসে আসছে নানা দিক থেকে, রাস্তার পাশের পতিতারা নানা যৌন উত্তেজক ভঙ্গিতে ডাকছে। সমুদ্রের সৌন্দর্য্য, পতিতাদের আবেদনময়ী ডাক সবকিছু পিছে ফেলে উত্তর জার্মানীর পোর্টসিটি হামবুর্গের বিখ্যাত ‘রেড লাইট স্ট্রিট’ রিপারবান (Reeperbahn) এলাকা ধরে মিনিট দশেক হেঁটে গেলেই একটা স্টেডিয়াম চোখে পড়বে। নাম মিলার্নটর (Millerntor) স্টেডিয়াম।

না, এটা কোনো ক্লাসিকোর গল্প না। সেখানে ক্লাসিকোর জৌলুস নেই। নেই বড় তারকার দল, নেই লন্ডন ডার্বির মতো হাইপ, হাজারটা স্পন্সর, ক্যামেরা। সেখানে ফুটবল আছে, মানুষ আছে, জীবন আছে, জীবনবোধ আছে। আছে প্রথাগত ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর গল্প।

১৯৩০ সালে জার্মান পলিটিক্স এক নতুন অধ্যায়ে ঢোকে। নাজিরা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। তাদের দল National Socialist Workers’ Party of Germany (NSDAP) ১৯৩৩ এ ক্ষমতায় আসে। NSDAPর সরাসরি প্রভাব ছিলো জার্মান ফুটবল এ্যাসোসিয়েশনের (DFB- Deutsche Fussball Bund) উপর, তারা সব জার্মান ক্লাব থেকে ইহুদিদের খেলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সব ক্লাব সেটাতে একমত হলেও (না হয়ে উপায় ছিলো না) একটা ক্লাব সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তারা NSDAP তে জয়েন করেনি। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট উইলহেম কোচ ১৯৩৭ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন, এরপরে তিনি বাধ্য হন সরে দাঁড়াতে এবং শেষ পর্যন্ত ক্লাবটা NSDAP জয়েন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত কোচ ক্লাবের বাইরে ছিলেন, বিশ্বযুদ্ধ শেষে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট পদে ফেরত আসেন এবং আমৃত্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে ছিলেন (২২ বছর)। ক্লাবটার নাম সাংক পাউলি (St Pauli)।

৭০ এবং ৮০’র দশকে ক্যাপিটালিস্ট আর সোশালিস্টদের দ্বন্দ্বের সময় জার্মানিকে বিভক্ত করা হয় দুইভাগে। ইস্ট এবং ওয়েস্ট; যথাক্রমে সোশ্যালিস্ট এবং ক্যাপিটালিস্ট জার্মানিতে। সেই সময়েও সাংক পাউলি ছিলো স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ঐ সময়ের বৃদ্ধ জার্মানি যেখানে ফুটবল খেলাকে সময় নষ্ট মনে করতো, তখন তরুণরা ফুটবলকে নেয় তাদের প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে। শুরু হয় জার্মান ফুটবলে জাতীয়তাবাদের প্রসার। হামবুর্গের সবচেয়ে বড় ক্লাব হামবুর্গার এফসি যখন নিও-নাজি ধারণায় উদ্বুদ্ধ তখন সাংক পাউলি তাদের আগের নীতিতেই অটল থাকে, তাদের পতাকা Totenkopf (ইংরেজিতে Skull) হয়ে ওঠে নিও-লিবারেলিজমের প্রতীক। হামবুর্গ পাংকরকের শহর। আজকের পাংকরকের প্রতীক যে স্কাল, সেই স্কাল এসেছে জার্মানির এই ছোট শহরের এই ছোট ক্লাবের মাধ্যমেই।

মূলত এ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট চিন্তাভাবনায় বিশ্বাসী এই ক্লাবের বিরুদ্ধে কম কিছু হয়নি। ১৯৮৪তে হামবুর্গার এইচভির নিও-নাজি সমর্থকরা হাফেনস্ট্রাসের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়, যেই রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই সাংক পাউলির স্টেডিয়াম। হার্থা বার্লিনের ফ্যানরা মলোটোভ ককটেল দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় হামবুর্গের ট্রেন। নাজি সিম্প্যাথাইজাররা তখন জার্মানিতে আগ্রাসী, বিভিন্ন স্টেডিয়ামে তারা নাজি প্রচারণা করছে; সেই সময়ে নাজিদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো একমাত্র ক্লাব সাংক পাউলি।

জার্মান, নন-জার্মান, সাদা-কালো, খ্রিস্টান-মুসলমান-ইহুদি; যেই হউক না কেন; ফ্যানদের জন্য সাংক পাউলির দরজা সবসময় খোলা। ফ্যানদের জন্য তাদের আছে Fan Laden প্রজেক্ট যেটার আন্ডারে তারা লোকাল ফ্যানদের শিষ্টতা শেখায়, বিদেশী ফ্যানদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও খেলা দেখার অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করে, হোম ম্যাচের টিকেট বিক্রি করে, এ্যাওয়ে ম্যাচে ফ্যানদের যাওয়া-আসার জন্য বাস/ট্রেনের ব্যবস্থা করে। রিসেন্ট টাইমে এরা চালু করছে তাদের বিখ্যাত Gegen Rechts (লিটারেল মিনিং ‘Against Right’) যেটা মূলত এ্যান্টি-নাজি ক্যাম্পেইন। পাউলির ফ্যানরা মারামারি করে না, দল জিতলে ভাংচুর করে না, দল হারলে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের উপর চড়াও হয় না। সাংক পাউলি ফ্যানরা পুরা ইউরোপে বিখ্যাত তাদের এ্যান্টি-হুলিগানিজম, এ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট এবং এ্যান্টি-ভায়োলেন্ট স্ট্যাডপয়েন্টের জন্য।

একটা ফুটবল ক্লাব, সেটা ইউরোপ হউক আর লাতিনের, সেই এলাকার কালচার, কমিউনিটি এবং আইডিওলজিকে ধারণ করে। এই সংজ্ঞা ধরেই সাংক পাউলি ধারণ করে পাংকরক, ডকইয়ার্ড এবং লিবারেলিজমকে। জার্মান ফুটবল কালচারে নৈতিকতা, অহিংসতা ইত্যাদি শিক্ষা দেয়াতে সাংক পাউলির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা অনেকেই জানলেও বিশ্বের সংগীতেও যে তাদের অবদান আছে সেটা অনেকেই জানেন না।

এই ব্যাপারে একটা ছোট্ট ঘটনা জানিয়ে শেষ করি। ১৯৬০-৬২ সালে দুই বছরে ৪৮টা শো চুক্তিতে ইংল্যান্ডের মার্সিসাইড থেকে ৫ ছোকরা আসে সাংক পাউলির রেড লাইট ডিসট্রিক্টে। চুক্তি শেষ করে তারা ইংল্যান্ডে ফিরে যায় এবং তারপর কয়েকটা এ্যালবাম বের করে পুরা বিশ্বসংগীতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এই ছোকরারা বহু বছর পর ইন্টারভিউতে বলেছিলো যে রিপারবানে কাটানো ঐ দুই বছর তাদের ‘ছেলে থেকে পুরুষ’ বানিয়েছে। পাঁচ ছোকরার সেই ব্যান্ডও সারাজীবন সাংক পাউলির সেই নৈতিকতা, অহিংসতার গানই গেয়েছে।

ব্যান্ডটার নাম The Beatles.

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Back to top button