ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মশা নিয়ে মশকরা: আলহামদুলিল্লাহ ফর এভরিথিং!

জাতি হিসেবে আমরা বড়ই রসিক। দিনে দুইবেলা ঠাট্টা-মশকরা না করলে আমাদের পেটের ভাত হজম হয় না। তবে এসব রসিকতা করার অধিকার কেবল ক্ষমতাবানদেরই আছে, আমজনতার নেই। আমজনতা কেবল দর্শক হিসেবে দেখে যাবে, আর বলবে, আলহামদুলিল্লাহ ফর এভরিথিং! সিরিয়াস কোন ইস্যু সামনে এলে সেটা নিয়ে একটু কৌতুক করাটাকে এখন আমাদের মন্ত্রী-মেয়রেরা নিজেদের দায়িত্বের একটা অংশ হিসেবে ভাবেন। কাজের কাজ তো কিছু করতে পারছেন না, একটু ভাঁড়ামি করে, হাসির পাত্র সেজে জনগণকে একটু বিনোদন যদি দেয়া যায়, এই আশায় তারা কত কষ্টই জা করেন!

এই যে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে ঢাকা শহরটা শ্মশ্মানের মতো হয়ে যাচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই, আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে কত মানুষ, পরিবারগুলোতে নেমে আসছে শোকের ছায়া। আমরা যারা মোটামুটি সুস্থ আছি, পত্রিকায় খবরগুলো শুনে মানসিকভাবে সুস্থ আর থাকতে পারছি কই?

পেটের সন্তানকে পেটে নিয়েই মারা যাচ্ছেন আট মাসের গর্ভবতী মা, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ছেলের লাশ কবরে শুইয়ে দিয়ে শোকটাও পালন করতে পারছেন না বাবা, কারণ মেয়েও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, তার ঠাঁই হয়েছে হাসপাতালের আইসিইউতে! মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকা ছোট্ট মেয়েটা জানেও না, নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, আপন বড় ভাইকে সে আর কোনদিন দেখতে পাবে না।

ডেঙ্গু

এই সত্যিকারের গল্পগুলো আমাদের হৃদয় ভেঙে দেয়, আমাদের চোখের কোণে পানি জমে। সেটা মুছে আমরা নিজেদের বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হই, হাসপাতালে ছুটি, সিভিসি আর এনএসওয়ান টেস্টের রেজাল্ট আনতে দৌড়াই। ফেসবুকে রক্তের পোস্ট শেয়ার করি, গ্রুপ মিলে গেলে নিজেরাও ছুটে যাই সাধ্যমতো। আর আমাদের এই কষ্ট লাঘব করার জন্যে, আমাদের একটু বিনোদন দেয়ার জন্যে মন্ত্রী-মেয়রেরা মাইক্রোফোন সামনে পেলেই কত না মুখরোচক কথাবার্তা বলে যান!

গতকাল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘যে দেশ যত বেশি উন্নত হচ্ছে, সে দেশে তত বেশি রোগ-বালাইয়ের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেঙ্গু এলিট শ্রেণির একটি মশা। এই মশা সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক, কলকাতা শহরে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ উন্নত দেশ হতে যাচ্ছে। তাই এখন এ দেশে ডেঙ্গু এসেছে। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যত ঘটবে, ততই নানা রোগের আক্রমণ ঘটবে। দেশ যত উন্নত হবে, মানুষের সমস্যাও তত বাড়বে।’

একজন শিক্ষিত লোক, রাষ্ট্রের মন্ত্রীর পদে বসে থাকা একজন ব্যক্তি যদি এটাই মনে করেন যে একটা দেশ উন্নত হওয়ার মানেই হচ্ছে সেই দেশের সমস্যা বেড়ে যাওয়া- তাহলে সেই অলৌকিক উন্নত রাষ্ট্রের দরকার নেই আমাদের। গরীবি হালে আমরা থেকে যাবো, সমস্যা নেই। উন্নত হয়ে মশার কামড়ে মরতে চাই না আমরা। সিঙ্গাপুর-ব্যাংকক-কলকাতায় ডেঙ্গু আছে, আমরা জানি। সেখানে গাড়িচাপা পড়ে বছরে কয়জন মারা যায়? ভবনে আগুন লেগে কয়শো মানুষ মরে এসব শহরে? যানযটে এসব জায়গায় কয় লক্ষ কর্মঘন্টা নষ্ট হয় প্রতিবছরে? মাননীয় মন্ত্রী, একটু জবাব দিয়ে যাবেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো সেই কবেই ডেঙ্গু মশাকে রোহিঙ্গাদের সাথে তুলনা করেছেন। ডেঙ্গু যখন ঢাকা শহরে মহামারীর রূপ নিয়েছে, তখন তিনি পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া গিয়েছেন ছুটি কাটাতে! সাংবাদিকেরা রিপোর্ট করে বেচারার ছুটির বারোটা বাজিয়েছে। সেই রাগ অবশ্য তিনি দেশে এসে ঝেড়েছেন। শুরু থেকেই ডেঙ্গুর ভয়াবহতাকে গুজব বলে অভিহিত করে এসেছেন তিনি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে মনগড়া তথ্য দিয়েছেন।

গতকালও ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দাবী করেছেন, এখানে নাকি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজনও মারা যায়নি! তার সামনে বসা ডাক্তার-নার্সেরাই তখন প্রতিবাদ করে বলেছেন, এই হাসপাতালে মোট এগারোজন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। এরপরেও তিনি অবুঝ শিশুর মতো নিজের বক্তব্যে অটল থেকে বলেছেন, “তারা বলছেন, এই হাসপাতালে ১১ জন মারা গেছেন, কিন্তু কতজন ডেঙ্গুজনিত কারণে মারা গেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি।”

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন তো মাশাল্লাহ, হাসির রাজা হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছেন। কোন কমেডি শো-তে অংশ নিলে নির্ঘাৎ চ্যাম্পিয়ন হতেন তিনি। গতবছর ডেঙ্গু মোকাবেলায় তার প্রতিষ্ঠান কিছুই করতে পারেনি, উল্টো প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মশার ঔষধ কেনার নাম করে কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে, কেনা হয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ।

ডেঙ্গু জ্বর, এডিস মশা, এডিস মশার বাসস্থান

খোকন সাহেব এসবকিছু ঢাকার জন্যে বেতাল কথাবার্তা বলাটাকেই সমাধান হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কখনও তিনি।বলছেন ডেঙ্গু নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, কখনও বলছেন পুরোটাই গুজব, আবার কখনও রণে ভঙ্গ দিয়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা স্বীকার করে নিয়ে ধর্মের আশ্রয় নিচ্ছেন, বলছেন ডেঙ্গু রোধে লম্বা পাঞ্জাবী-পাজামা পরতে! দুনিয়ার সব ভণ্ডরাই বিপদে পড়লে ধার্মিক সাজে, আল্লাহ’র নাম নেয়, ধর্মের ছায়াতলে এসে পাপ।কাটাতে চায়। আমাদের মেয়র মশাইও সেই পুরনো রাস্তাতেই হেঁটেছেন!

সম্রাট আকবরের রাজসভায় বীরবল ছিলেন, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভায় ছিলেন গোপাল ভাঁড়। আমাদের দেশে মেয়র আছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী আছেন, যারা জনগণকে প্রতিমূহুর্তে বিনোদনের যোগান দিয়ে চলেছেন। যে কাজের জন্যে তাদের রাখা হয়েছে, সেটা তারা করতে পারছেন না। তাই হাসিঠাট্টা করে জনগনের মন ভালো রাখাটাকেই তারা ‘জব রেসপন্সিবলিটি’ হিসেবে ভেবে বসে আছেন! এমন বীরবল আর গোপাল ভাঁড়দের নিয়ে জাতির কি উন্নতি সাধন হবে, সেটা আমরা জানিনা। যারা এদের নিয়োগ দিয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই ভালো জানবেন।

Facebook Comments

Tags

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button